অন্যদের রাতে শোয়ার সমস্যাটা জানতে ভারতী পরের দিন দোতলায় উমাদের ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজাল। দরজা খুললেন উমার মা জয়ন্তী। ভারতীকে দেখেই অবাক এবং সাদর আহ্বান, ‘আসুন, ভেতরে আসুন। কতকাল পরে দেখা পেলুম। সেই সাত—আট মাস আগে সিঁড়িতে একবার দেখা হয়েছিল তারপর এই।’
‘আমি তো বছরে তিন—চারবার বেরোই। দেখা হবে কী করে। আপনি তো রোজ টিউশনিতে বেরোন, বেশ আছেন। মাঝে মাঝে কষ্ট করে ক—টা সিঁড়ি ভেঙে ওপরে এলেই তো পারেন।’ বলতে বলতে ভারতী ভিতরে ঢুকে এল। তার হাতে পুলিনের একটা পাঞ্জাবি। সেটা তুলে দেখিয়ে বলল, ‘কী মুশকিলে পড়ে গেছি ভাই, বিকেলে উনি বেরোবেন, লন্ড্রি থেকে কাচিয়ে আনা পাঞ্জাবিটা বার করে দেখি দুটো বোতাম ভাঙা, ছুঁচ সুতোর বাক্স খুলে দেখি একটাও বোতাম নেই। দোকান থেকেও যে এনে দেবে এমন কেউ নেই। উনি বেরিয়েছেন ফেরার ঠিক নেই, আর আমার শ্বশুরকে তো জানেনই।’ বাকিটা আর বলার দরকার মনে করল না ভারতী, জয়ন্তী শুধু হাসল।
‘আপনার দুটো বোতাম দরকার এই তো, বসুন, দেখছি আছে কি না।’
বসার জন্য ভারতী নিজেই ঘরে ঢুকল। এটা কাশীনাথের ঠিক নীচের ঘর। ঘরে খাট তক্তপোশ নেই, শুধু বই খাতায় ভরা একটা টেবল আর স্টিলের দুটো ফোল্ডিং চেয়ার। দেওয়ালে সাঁটা আলনা থেকে ঝুলছে শার্ট—প্যান্ট, পাজামা, লুঙ্গি। পরিপাটি ভাঁজ করা ঘরের একধারে গোটানো তোষক আর বালিশ। ভারতী বুঝে গেল তিন ভাই এখানে রাতে শোয়। বাবা—মা—মেয়ে শোয় পাশের ঘরে। একসঙ্গে? কিন্তু খাটটা তো অতবড়ো নয়! একজন তাহলে মেজেয় শোয়। কে? একটা প্লাস্টিকের বাক্স হাতে নিয়ে জয়ন্তী পাশের ঘর থেকে এলেন।
‘আপনার দুটো বোতামের একটা পেয়েছি আর একটা—’ জয়ন্তী আলনায় ঝোলানো শার্টগুলোর কাছে গিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে বললেন, ‘নাঃ বোতামগুলো বড়ো বড়ো। আচ্ছা বসুন ওনার পাঞ্জাবিটা দেখি।’
‘না না না আপনি অত ব্যস্ত হবেন না।’ বলতে বলতে ভারতী জয়ন্তীকে অনুসরণ করে পাশের ঘরে ঢুকল। দেওয়াল থেকে হ্যাঙ্গার সমেত পাঞ্জাবি তিনি নামিয়ে ফেলেছেন।
‘গলার কাছের বোতামটা কখনো ওনাকে লাগাতে দেখিনি। এখন আপনি নিয়ে যান। কালকেই কিনে এনে আমি লাগিয়ে দেব।’ জয়ন্তী ছোট্ট কাঁচি দিয়ে বোতামের সুতো কাটতে শুরু করলেন। ভারতী আর আপত্তি করল না। একনজরে সে দেখে নিল ঘরটা। উমার বাবা সামান্য চাকরি করেন এক বিলিতি ওষুধ কোম্পানির গোডাউনে। অসচ্ছল পরিবার। ঘরের সবকিছুই বিবর্ণ, পালিশচটা, কিন্তু গুছিয়ে রাখা। খাটের নীচে তাকিয়ে যা দেখবে ভেবেছিল সেটি নেই—শতরঞ্চিতে মোড়া গোটানো তোষক। ভারতীর ভ্রু কুঁচকে উঠল।
‘শুনলাম অনীশের নাকি বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।’ জয়ন্তী বললেন, স্বরে কোনো ঔৎসুক্য নেই।
‘মোটামুটি ঠিক। রোববার মেয়ের বাড়ির লোক আসবে পাকা কথা বলতে।’ ভারতী সংযত গলায় বলল।
অনির বিয়ের জন্য কথা হচ্ছে এ খবর দোতলা পেল কী করে? তারা তিনজন আর অনি ছাড়া আর কারোর তো জানার কথা নয়!
ভারতী ভাবতে শুরু করল। নিজেকে আর শ্বশুরকে শুরুতেই বাদ দিল। উনি হয়তো নীচের দোকানদারদের কাউকে বলে থাকতে পারেন। অনি সকালে বেরিয়ে রাতে ফেরে। এ বাড়ির কারোর সঙ্গে তার দেখা হয় না।
‘অনীশ বিয়ের পর এ বাড়িতেই থাকবে?’ জয়ন্তীর গলায় এবার সামান্য কৌতূহল।
‘এখানে থাকবে না তো যাবে কোথায়?’ ভারতী যথাসম্ভব বিস্মিত হল।
‘বিয়ে মানে তো একজন লোক বাড়া, ওদের জন্য আলাদা ঘরও চাই। তাই বলছিলুম অনীশ এখন অনেক টাকার চাকরি করে, হয়তো বড়ো ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অন্য কোথাও থাকবে।’
‘থাকতে চায় যদি থাকবে, কী আর করা যাবে। যাদের ছেলে আছে ঘর কম তাদেরই এই সমস্যায় পড়তে হবে। আপনাকেও কি পড়তে হচ্ছে না? তিন ছেলে এক মেয়ে আপনারা দু—জন, রাতে শোন কীভাবে?’
ভারতী উত্তরের জন্য তাকিয়ে রইল। প্রশ্নটা কথার পিঠে স্বাভাবিক করতে পেরে সে স্বস্তি পেয়েছে। জয়ন্তীকে বিচলিত দেখাল না।
‘রমু ওর বন্ধুর সঙ্গে পড়াশোনা করে রাতে ওদের বৈঠকখানাতেই শোয়। আর বাচ্চচু আমাদের পাড়ার নবজীবন সংঘের ক্লাব ঘরে শোয়, পাহারার কাজটাও হয়। ও ঘরে উমার বাবা আর তপু। এঘরে আমি আর উমা। তবে ছেলেদের বলে দিয়েছি বড়ো হয়ে বিয়েথা যখন করবে তখন কিন্তু আলাদা হয়ে সংসার পাতবে। এখানে একসঙ্গে থাকা চলবে না।’
.
যা জানার তা জানা হয়ে গেছে। ভারতী উঠে দাঁড়াল, ‘যাই, এখন গিয়ে পাঞ্জাবিতে লাগাই। কালকেই আমি বোতাম দিয়ে যাব।’.
‘একদম নয়। এই সামান্য জিনিস কেউ ফেরত নেয় না ফেরত দেয়ও না। আপনি ফেরত দিলে কিন্তু আমি লজ্জা পাব।’
ভারতী হাসিমুখে ফিরে এল। শোয়ার সমস্যা এরা যেভাবে সমাধান করেছে তাদের পক্ষে সেভাবে সম্ভব নয়। একুশ নম্বর বাড়ির ভাড়াটেরা কী করে সেটা পুলিনকে দিয়ে খোঁজ করাতে হবে। সন্ধ্যাবেলায় সে রান্নাঘরে পুলিনকে ডেকে দোতলায় যা দেখে আর শুনে এসেছে তা জানিয়ে বলল, ‘একুশ নম্বরের চণ্ডীবাবু তো তোমার খুব চেনা, ওকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখো না।’
পুলিন তখনই বেরিয়ে গেল চণ্ডীবাবুকে ধরতে। একটু পরেই অফিস থেকে ফিরল অনীশ। হাতে একটা পলিথিনের ব্যাগ, তাতে দোকানের নাম ছাপা। ভারতী একটু অবাক হয়েই বলল, ‘আজ যে এত তাড়াতাড়ি!’
