কাশীনাথ দু—হাতে দুর্গাশঙ্করের মুঠো ধরে ব্যস্ত হয়ে বলে, ‘আরে আরে এ তো আমার সৌভাগ্য। দুর্গার কন্যা মা লক্ষ্মী আমার ঘরে আসবে আমি তো ভাবতেই পারছি না। আমিই তো উদ্ধার হব।’
পুলিন তখন ভাবল, বাবা এমনভাবে কথা বলা শিখল কবে, পুরোটাই তো অভিনয়! ছেলে একটা দোকান পাবে এটাই তো ওর একমাত্র স্বার্থ এই বিয়েতে রাজি হওয়ার পিছনে।
‘আমি খুব গরিব—।’
দুর্গাশঙ্করকে থামিয়ে কাশীনাথ বলে ওঠে, ‘আহাহাহা, গরিব বড়োলোকের কথা আসছে কেন। আমার কোনো দাবি নেই, যা দেবেন পুলিনকেই দেবেন। আমি শুধু একবারটি মা লক্ষ্মীকে দেখে আসব।’
মেয়ে দেখতে কাশীনাথ গিয়েছিল। চল্লিশ মিনিট ছিল। পুলিন সঙ্গে যায়নি। ফিরে এসে কাশীনাথ বলে, ‘লোকটা ভদ্দরলোক, দোকানটা বিয়ের আগেই লিখে দেবে বলেছে। বুদ্ধিমতী মেয়ে। ক—টা কথা জিজ্ঞেস করলুম, দু—একটা উত্তরে ধোঁকা দিল। সংসার চালাতে এমন মেয়েই দরকার। রংটা ফরসা কিন্তু তোর মায়ের মতো অতটা নয়। বিয়ের দিন ঠিক করে এলুম সামনের ফাল্গুনে।’
বিয়ের দু—সপ্তাহ পর রাতে বিছানায় এটা সেটা গল্প করতে করতে ভারতীকে জিজ্ঞাসা করেছিল পুলিন, ‘বাবা কী বলেছিল তোমাকে দেখতে গিয়ে?’
‘বিশেষ কিছু নয়। প্রথমেই বললেন শাশুড়ি, ননদ, দেওর পাবে না, একা সংসার করতে হবে, পারবে? রান্না জানো? আমি ঘাড় নাড়লুম। তারপর, সিনেমা দ্যাখো? বললুম, না। গান শোনো? বললুম, হ্যাঁ। কী গান? বললুম কীর্তন আর শ্যামাসংগীত। হাসি হাসি মুখ দেখে বুঝলুম আশি নম্বর পেয়ে গেছি। তার পর বললেন, দুর্যোধনের বোনের নাম কী? বললুম দুঃশলা। তার পর, বিকর্ণ কর্ণের কে হন? বললুম কেউ না, দুর্যোধনের ভাই ছিলেন বিকর্ণ। ব্যাস আর কিছু জিজ্ঞাসা করেননি।’
‘তাই বাবা বলেছিল বুদ্ধিমতী মেয়ে! সিনেমা দেখি না, কীর্তন শ্যামাসংগীত শুনি, তুমি কি ভেবেছ বাবা ওসব বিশ্বাস করেছে? মোটেই নয়। অত ভালো মেয়ে সাজতে গেলে কেন?’
‘ওর ঠেঁটো ধুতি—পাঞ্জাবি, কাঁধের উড়ুনি আর খোঁচা খোঁচা চুল দেখে মনে হল সেকেলে লোক। যে উত্তর পেলে খুশি হবেন তাই বলছি।’
‘বাবা কিন্তু ঠিক ধরে ফেলেছে। আমাকে সেদিনই বলেছিল ধোঁকা দিয়ে মিথ্যে উত্তর দিয়েছে, বুদ্ধিমতী মেয়ে। সাবধানে থেকো। পরে কোনোদিন এটা নিয়ে তোমাকে খোঁটা দেবে।’
.
তিরিশ বছর পর সেদিনের সেই রাতের মতো বিছানায় শুয়ে পুলিনের মনে পড়ল ভারতীকে সে বলেছিল পরে কোনোদিন বাবা খোঁটা দেবে। ‘কুচুটে বুদ্ধি’ কথাটা সেই খোঁটাই। আসলে খাট বিক্রি করে দেওয়ার কথাটা তার মুখ থেকেই প্রথমে বেরোয়। ভারতী তাতে সায় দিয়েছিল মাত্র। ওকে কুচুটে বলায় সেও মনে আঘাত পায়।
ভারতী পাশ ফিরে বলল, ‘রাতে শোয়ার সমস্যাটা তো শুধু আমাদের একার নয়, এ পাড়ায় অল্পবিস্তর সব ঘরেই রয়েছে। নীচের উমাদেরই কথা ধরো না! স্বামী—স্ত্রী, তিন ছেলে এক মেয়ে। ওরা রাতে কী করে শোয়? ওই যে সামনের একুশ নম্বর বাড়ি ওখানে একতলা দোতলায় তো চার ঘর ভাড়াটে, চারটে পরিবার থাকে চারটে ঘর নিয়ে। কী করে থাকে?’
‘ওপরের প্রণববাবু, আমাদের পাশের মজুমদাররা এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত। দু—জনেরই একটি করে মেয়ে। বিয়ে হলে শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে। তখন বাবা—মা হাত—পা ছড়িয়ে দুটো ঘরে থাকবে। অনি যদি মেয়ে হত তা হলে আমাদের এমন ঝঞ্ঝাটে পড়তে হত না।’
ক্ষীণ একটা আপশোস পুলিনের গলায় পেয়ে ভারতী বলল, ‘ছেলেরা রোজগার করে বাপ—মাকে খাওয়ায়। মেয়ে রোজগেরে হলেও তাকে তো শ্বশুরবাড়ি যেতে হবে। টাকা তো তখন আর বাপের বাড়িতে দেবে না। অনি যাকে বিয়ে করছে সেও তো চাকরি করে, সে কি মাইনের টাকা বাড়িতে দিয়ে আসবে?’
‘মেয়ে যে শ্বশুরবাড়ি যাবেই এটা ধরে নিচ্ছ কেন? অনেক ছেলে ভাগনে—ভাগনি ভাইপো— ভাইঝিদের মানুষ করার জন্য যেমন আইবুড়ো থেকে যায় আজীবন তেমনি অনেক চাকুরে মেয়েও বিয়ে না করে বাপের সংসার টানে যতদিন না কোনো ভাই কি বোন রোজগার শুরু করছে।’
কৌতূহলে টান হয়ে ভারতী জিজ্ঞেস করল, ‘তার পর সে কী করে?’
হাই তুলে পুলিন বলল, ‘যদি প্রেমিকট্রেমিক থাকে তখন তাকে বিয়ে করে, নয়তো পলিটিক্স করে কিংবা কোনো গুরুর কাছে দীক্ষা নেয়। তোমাকে তো বলেছিলুম ব্রতীনের কথা, বতু বিয়ে করল আটচল্লিশ বছর বয়সে, রেখার বয়স তখন পঁয়তাল্লিশ। বোন নার্সিংয়ের চাকরি পেল, ভাই একটা প্রাইভেট ফার্মে ঢুকল তারপর ওরা রেজিস্ট্রি করল। ব্রতীন আঠারো বছর অপেক্ষা করেছিল। একেই বলে প্রেম।’ পুলিন পাশ ফিরে ভারতীকে একহাতে জড়িয়ে ধরে কথা শেষ করল, ‘তুমি বিয়ের আঠারো মাসের মধ্যেই আমাকে ভুলে গেছিলে।’
ভারতী পুলিনের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে বলল, ‘গেছিলুমই তো।’ পাছার উপরে ব্যস্ত পুলিনের হাতটা আঁকড়ে ধরে আবার বলল, ‘জ্বালাতন করলে আঠারো মিনিটেই ভুলে যাব।’
‘আঠারো মিনিট নয়। আট মিনিটের বেশি লাগবে না, তারপর আমাকে ভুলে যেতে হয় যেয়ো। তোমাকে তখন কী দারুণ দেখাচ্ছিল যখন বাবাকে বললে আপনি তো পারেননি ছেলেকে তৈরি করতে, আমরা পেরেছি। সারা মুখে কি তেজ, চোখ দিয়ে আগুন ঠিকরোচ্ছে, নাকের পাটা ফুলে উঠেছে যেন মা দুগ্গা মহিষাসুর বধ করছে!’
‘এখন মায়ের নাম মুখে এনো না, পাপ হবে।’
