পুলিনের কানে ‘যদি’ শব্দটা খচ করে লাগল। একটা দোকান করার মতো জায়গা সে খুঁজছে। যে জায়গায় ‘ভারতী ওয়াচ’ সেখানে দোকান পাওয়া সে স্বপ্নেও ভাবতে সাহস পায়নি। ভারতীকে তার ভালো লাগে ঠিকই, কিন্তু সেটা হৃদয়ের উপরের স্তর ছুঁয়ে, ভালো লাগাটা কামনার স্তর পর্যন্ত এখনও পৌঁছায়নি। দোকান ঘর এবং ভারতী এই দুয়ের প্রভাবে তার মনের মধ্যে এখন যে এলোমেলো অবস্থা তৈরি হল ‘যদি’ শব্দটা তার ফলে চাপা পড়ে গেল।
‘এ ব্যাপারে আমি আপনাদের কোনো কথা দিতে পারব না, আমার বাবাকে বলুন।’ নম্রস্বরে পুলিন জানায়।
‘তা তো বলবই’, দুর্গাশঙ্কর বলেন, ‘তার আগে তোমার মতটা জানা দরকার। ভারতীকে তোমার কেমন লাগে, পছন্দ হয়?’
মুখ নামিয়ে পুলিন অস্ফুটে বলেছিল, ‘হ্যাঁ।’ আড়চেখে দেখে দু—জনের মুখে স্বস্তির ছায়া পড়ল।
সন্ধ্যায় ছেলের তৈরি ট্রানজিস্টারে খবর শুনছিল কাশীনাথ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল পুলিন। খবর শেষ হতে সে ঘরে ঢুকল। রেডিয়ো বন্ধ করে কাশীনাথ বলল, ‘আওয়াজ বেশ পরিষ্কার আসছে।’
‘বন্ধ করলে কেন। এরপর তো গান হবে, শুনবে না?’
‘ব্যাটারি খরচ হবে।’ এক কথায় কাশীনাথ জানিয়ে দিল গান শোনার থেকে টাকার সাশ্রয়ে তার সুখ বেশি।
ইতস্তত করে পুলিন বলল, ‘দিলীপের বাবা আজ একটা কথা বললেন, দোকানটা আর তিনি রাখবেন না। ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকেই, একদম ভেঙে পড়েছেন, কাজ করার ক্ষমতাও আর নেই। মনে হয় না বেশিদিন বাঁচবেন।’
ছেলের বন্ধুর বাবার বাঁচা—মরা নিয়ে কাশীনাথ সমবেদনা জানাতে একটি কথাও খরচ না করে উৎসুক হয়ে জানতে চাইল, ‘দোকানটা তাহলে কী করবে, বেচে দেবে?’
‘ওটা আমাকে দিয়ে যেতে চান,’ বলেই পুলিন বাবার মুখে কীরকম ভাবান্তর ঘটে দেখার জন্য তাকাল। কাশীনাথ বিমূঢ়। ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে গেল। স্ত্রী মারা যেতে যে ধাক্কা লেগেছিল তার অন্তরে এটা যেন তার থেকেও বেশি। গলার কণ্ঠা দু—তিনবার নড়ে উঠল। বিশ্বাস করতে পারছে না চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের উপর অমন ব্যবসার জায়গায় দোকানটা দিয়ে দেবে ছেলের বন্ধুকে, তাই কখনো হয়!
‘তুই ঠিক বলছিস? লোকটা নিজে তোকে বলেছে?’
‘হ্যাঁ, আমাকে বলেছেন আজ সকালেই।’
‘অমনি অমনি দিয়ে দেবে? কিছু নেবেটেবে না?’
পুলিন চুপ রইল। বলতে অস্বস্তি হচ্ছে, শুনলেই বাবা যদি ‘না’ বলে দেয়!
‘কীরে টাকার অ্যামাউন্টটা কত?’
‘টাকা চাননি।’
‘তবে?’
‘মেয়ের বিয়ে দিতে চান।’
‘তোর সঙ্গে?’
পুলিন মুখ নামিয়ে নিরুত্তর। কাশীনাথ ‘হুমম’ শব্দ করে চিন্তায় ডুবে গেল। পুলিন একটু একটু করে আশার আলো দেখতে থাকল। বাবা এককথায় নাকচ করেনি।
‘খুঁতো মেয়ে?’
‘না।’
‘কানা—খোঁড়া, বোবা—কালা নয়তো?’
‘না।’
‘দেখতে শুনতে কেমন? তোর সঙ্গে আলাপ—সালাপ কত দিনের?’
পুলিন ফাঁপরে পড়ল। ‘আলাপ—সালাপ’ বলতে বাবা কী বোঝাতে চায় সেটা সে আন্দাজ করে হুঁশিয়ার হয়ে গেল। ‘কত দিনের’ শব্দটাই ভয়াবহ। ছেলে কত বছর হল বখেছে বাবা এটাই জেনে নিতে চাইছে।
‘দু—তিনবার দেখেছি। রং ফরসা তবে একটু বেঁটে। মাধ্যমিক পাশ।’
‘কত ফরসা, তোর মায়ের থেকেও?’
কাশীনাথ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ এবং গৌরবর্ণের প্রতি প্রবলভাবে দুর্বল আর সেই কারণেই আটটি পাত্রী নাকচ করে ধবধবে রঙের একটি সুন্দরী গরিব নিরক্ষর মেয়েকে বিয়ে করে ঘরে আনে নিজে খরচ দিয়ে। কাশীনাথের বাবা—মাও ছিলেন কালো। এবার তার বংশ ফরসা রঙের হবে এই আশা নিয়ে স্ত্রীকে গর্ভবতী করে হৃৎপিণ্ড গলার কাছে তুলে এনে অপেক্ষা করছিল কয়েকটা মাস। পুলিন মায়ের রং আর মুখশ্রী পাওয়ায় কাশীনাথ গুহ ভবনের পাঁচটি ফ্ল্যাটের এবং একতলার দোকানের কর্মচারীদের টেবল পেতে ছাদে খাওয়ায় ছেলের অন্নপ্রাশনে। দ্বিতীয় সন্তান অবধারিত বাবার রং পাবে এই বদ্ধমূল ধারণায় সে দ্বিতীয়বার পিতা হয়নি।
‘মায়ের মতো অতটা নয় তবে গৌরবর্ণ।’ পুলিন এই বলে আতঙ্কিত চোখে তাকায়। কাশীনাথ একটি ‘হুমম’ দিয়ে চিন্তাগ্রস্ত হয় পড়ে। কয়েক সেকেন্ড পর সে বলে, ‘বিয়ের পরে না আগে দোকানটা লেখাপড়া করে দেবে?’
‘সেটা তুমিই জিজ্ঞেস করে নিয়ো।’
‘তুই ওনাকে এসে দেখা করতে বল।’
পুলিন রিকশায় করে নিয়ে আসে দুর্গাশঙ্করকে। তিনতলায় উঠতে তিনি দু—বার সিঁড়িতে জিরোন। কাশীনাথ ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে ‘আসুন আসুন’ বলে দুর্গাশঙ্করকে হাত ধরে নিয়ে ঘরের একমাত্র চেয়ারটিতে বসায়। পুলিন অবাক হয়ে গেছিল বাবার অমায়িক আচরণে ও কথায়, এক ঘণ্টা আগে সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল দুর্গাশঙ্করকে নিয়ে আসতে। দেখে গিয়েছিল ময়লা গেঞ্জি আর পাজামা পরা, গালে পাঁচ দিনের দাড়ি, চুলও সেই রকম। এখন একেবারে অন্য চেহারা। ধবধবে পাঞ্জাবি আর পাজামা, কামানো চকচকে গাল, পাট করে আঁচড়ানো চুল, নতুন চেহারার এক কাশীনাথ! হবু বেয়াইয়ের সামনে নিজেকে পরিচ্ছন্ন মার্জিত সজ্জন সদালাপী প্রমাণ করার জন্য ভোল পালটে ফেলেছে এক ঘণ্টার মধ্যেই। পুলিন বুঝল বাবা ইতিমধ্যেই নীচের চুলকাটার সেলুনে গিয়ে দাড়ি কামিয়ে এসেছে, বেড কভারটা বদলে দিয়েছে, বালিশের ওয়াড় ময়লা ছিল, বালিশগুলোই পাশের ঘরে চালান হয়ে গেছে।
‘ছেলের কাছে সব শুনেছেন নিশ্চয়।’ দুর্গাশঙ্কর কথা শুরু করেছিলেন নম্র বিনীত ভাবে। হাত জোড় করে প্রার্থীর মতো বলেন, ‘আমার একমাত্র মেয়েটিকে দয়া করে আপনার পুত্রবধূরূপে গ্রহণ করে আমাকে যদি উদ্ধার করেন এই আশা নিয়েই এসেছি।’
