পুলিন অবাক হয়ে বলেছিল, ‘তাহলে তোমার কো—অপারেটিভের ফ্ল্যাট! সেটার কী হবে?’
‘কী আবার হবে! ফ্ল্যাট হবে না।’ কাশীনাথ নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বলে হেসেছিল। ‘তোর দরকারটা আগে। আমাদের দুটো ঘর তো রয়েছে, বাপবেটার চলে যাবে।’
শুনে গভীর সুখ পেয়েছিল পুলিন। ট্রানজিস্টার বিক্রির খবরটা দিলীপের বাবাকে জানাবার জন্য পরদিনই সে ওদের বাড়ি যায়। প্রায় একমাস পর সে এল। সদর দরজা খুলল ভারতী। ভারী চোখ থমথমে মুখ। অন্যান্যবারের মতো পাতলা হাসি ফুটল না। পুলিনকে ভিতরে আসার জন্য ‘আসুন’ বলল না। ভিতর থেকে ওর মা—র গলা শোনা গেল, ‘কে এলোরে খুকি?’ জবাব দিল পুলিন, ‘আমি কাকিমা।’ ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন দিলীপের মা কিরণ। ময়লা শাড়ি চুল আলুথালু।
পুলিন বলল, ‘দিলীপ বাড়ি আছে?’
কিরণ আঙুল আকাশের দিকে তুলে বলেন, ‘ওখানে আছে।’ এই সময় আঁচলটা দাঁতে চেপে ডুকরে উঠে ভারতী ছুটে ভিতরে চলে যায়।
শোনামাত্র ধক করে ওঠে পুলিনের বুক। ওখানে আছে তার মানে মারা গেছে কি? আশঙ্কার কথাটা মুখ দিয়ে বার করতে না পেরে বলল, ‘ওখানে মানে?’
প্রাণপণে কান্না চেপে কিরণ বললেন, ‘দিলীপ পিকনিক করতে গেছিল পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে জয়নগরে, সেখানে পুকুরে ডুবে মারা গেছে, দশ দিন আগে।’
শুনেই পুলিনের মাথা থেকে সব রক্ত বুকে নেমে এসে জমাট বেঁধে গেল। মাথাটা খালি, দৃষ্টি ঝাপসা, জিভ আড়ষ্ট, কানেও কোনো শব্দ ঢুকছে না। মুখ দিয়ে আর্তনাদের মতো ‘আহহ’ ছাড়া আর কোনো শব্দ বেরোল না।
‘শোনামাত্রই ওনার স্ট্রোক হয়, এখন একটু ভালো।’ কিরণ অসহায় চোখে পুলিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটা ভয়ংকর বিপর্যয় এই পরিবারের উপর নেমে এসেছে সম্পূর্ণ আচমকা। এখন দুটো ট্রানজিস্টার বিক্রির কথা হাসিহাসি মুখে বলা যায় না। সে বিছানায় শোয়া দুর্গাশঙ্করের পাশে গিয়ে তার হাত মুঠোয় ধরে বসে থাকে। দুর্গাশঙ্কর ক্ষীণস্বরে বলে যান, ‘সাঁতার জানত না তবু বন্ধু ডুবে যাচ্ছে দেখে জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। কেন যে অমন বোকামি করতে গেল। পুলিন আমি বড়ো একা হয়ে গেলুম। কত আশা ছিল ওর ওপর। নিজে ডুবল আমাকেও ডুবিয়ে দিয়ে গেল।’ দুর্গাশঙ্করের চোখের জল গড়িয়ে নামল কানের পাশ দিয়ে।
দুর্গাশঙ্কর এর পর কয়েকদিন মাত্র দোকানে গেছেন মেরামতির জন্য নেওয়া ঘড়িগুলো খদ্দেরদের ফেরত দিতে। নতুন একটিও কাজ আর নেননি। কাজ করার ইচ্ছা এবং সামর্থ্য তিনি হারিয়ে ফেলেন, দোকান বন্ধ হয়ে থাকে। তিনি নিজেই একদিন বিছানায় শুয়ে জিজ্ঞাসা করেন পুলিনকে ‘তোমার রেডিয়ো তৈরির ব্যবসার কতদূর? শুরু করেছ?’
পুলিন বলেছিল, ‘করব তো ভেবে রেখেছি, প্রথমে দরকার একটা ঘর। তৈরি করে প্রথমে লোককে দেখাতে হবে জানাতে হবে। কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে অনেক খরচ। মালপত্র কেনা, কারিগর রাখা, দোকান সাজানো এসবের জন্য হাজার পঞ্চাশ টাকা নিয়ে না নামলে শুরু করা যাবে না। বাবা দেবে তিরিশ হাজার, ভাবছি ওই দিয়েই শুরু করব।’
শুনে দুর্গাশঙ্কর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে কী যেন ভেবে নিয়ে বললেন, ‘তুমি কাল সকলের দিকে একবার আসতে পারবে?’
পুলিন পরদিন সকাল দশটায় যায়। দুর্গাশঙ্করের খাটের পাশে দাঁড়িয়ে কিরণ, ভারতীকে দেখতে পেল না সে। ধীর স্বরে থেমে থেমে দুর্গাশঙ্কর বললেন, ‘আমার শরীর খুব ভালো নয় পুলিন, যেকোনো সময় যেকোনো দিন আমার আয়ু শেষ হয়ে যেতে পারে, তার নোটিশ যমরাজ আমায় ধরিয়ে দিয়েছে।’ তিনি স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করলেন। কিরণের মুখে কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। শক্ত মনের মানুষ। ভবিষ্যৎকে মেনে নিয়েছেন, ভেঙে পড়েননি।
পুলিন বিচলিত হল দুর্গাশঙ্করের কথায়। বাঁ—হাতের মুঠোয় ওঁর হাতটা ধরে সে বলল, ‘এসব কথা থাক কাকাবাবু, আপনি এখনও অনেকদিন বাঁচবেন।’
ম্লান হেসে দুর্গাশঙ্কর বলেন, ‘তোমার কাকিমাও তাই বলেছে। কিন্তু আমি তো বুঝি যার একটা স্ট্রোক হয়ে গেছে আর একটা যেকোনো দিন হতে পারে। ভয়ে ভয়ে সারাক্ষণ থাকার মতো কষ্টকর আর কিছু হতে পারে না।’
‘ভয়টাকে ভুলে থাকার চেষ্টা করলেই তো পারেন।’ কথাটা বলে পুলিনের মনে হয়েছিল খুব বোকার মতো বলা হল। ভয় এমন ব্যাপার যত ভুলে থাকার চেষ্টা করা যায় ততই চেপে বসে। এটা সে ছোটোবেলা থেকে জানে। কাশীনাথ শিশু পুলিনের রাস্তায় বেরিয়ে যাওয়া বন্ধ করতে বলেছিল, একতলার সিঁড়ির পাশের ঘরটায় জটে বুড়ি দুপুরে চুপটি করে একটা থলি নিয়ে বসে থাকে। বাচ্চচাদের একা পেলেই খপ করে ধরে থলিতে পুরে নেয়। তার পর মাঝ রাত্তিরে কেটে টুকরো করে কালিয়া রেঁধে খায়, খবরদার দুপুরে নীচে নামবে না। পুলিন এখনও সিঁড়ির পাশের ঘরের সামনে দিয়ে যাবার সময় একবার ঘরটার দিকে তাকায়।
দুর্গাশঙ্কর তারপর বলেন, ‘ভুলে থাকার জন্যই তো বাবা তোমাকে আজ আসতে বললুম। আমার দোকানটা দু—মাস বন্ধ রয়েছে। আর কোনোদিন খুলতে পারব বলে মনে হয় না। এদিকে ভারতীও বেশ বড়ো হয়েছে। ওর বিয়ের কথাও ভাবতে হচ্ছে।’
স্থির দৃষ্টিতে পুলিনের মুখের দিকে তাকিয়ে দুর্গাশঙ্কর। অস্বস্তি বোধ করে সে চোখ সরিয়ে নিতেই দেখল কিরণও তার মুখের দিকে তাকিয়ে। অবশেষে কিরণই কোনো ভণিতা না করে সহজভাবে বললেন, ‘দোকানটা যৌতুক দেব যদি ভারতীকে বিয়ে করো।’
