পুলিন হতভম্বের মতো তাকিয়ে থাকে দুর্গাশঙ্করের দিকে তারপর পাশে দাঁড়ানো মেয়ে ভারতীর দিকে। ছ—বছরে ভগবতীলালের উন্নতির কারণ জানতে তারপর সে এধার—ওধার তাকায়। দুর্গাশঙ্করই তাকে উদ্ধার করে বলেন, ‘পরিশ্রম। যেটা বাঙালিরা একদমই করে না, সেই পরিশ্রম। লজ্জা ঘেন্না ত্যাগ করে মুটের মতো ভগবতী খেটেছে দিনে আঠারো ঘণ্টা। আজ দেখো সে কোথায় উঠে গেছে। অবশ দেশওয়ালি ভাইরাও নানাভাবে ওকে সাহায্য করেছে।’
পুলিন নীচু গলায় তখন বলেছিল, ‘দিলীপও খুব খাটে, ও ঠিক উন্নতি করবে।’
‘নিশ্চয় করবে। ও কি আমার মতো বসে বসে শুধু ঘড়িই সারাবে? নামি বড়ো বড়ো কোম্পানির ঘড়ি বিক্রির এজেন্সি নিয়ে শো রুম খুলবে। আমার দোকানের পোজিশানটা দেখেছ? তুমি বাবা চাকরির দিকে যেয়ো না। ট্রানজিস্টার পাশে রেখে নাপিত দাড়ি কামাচ্ছে দেখেছি, মুচি জুতো সারাচ্ছে তাও দেখেছি, শুনেছি চাষি খেতে হাল দিচ্ছে আলের ওপর রাখা ট্রানজিস্টারের গান শুনতে শুনতে। জিনিসটার বাজার বিরাট। দেখতে সুন্দর এমন খোলের মধ্যে ভরে, কমদামে যদি মফস্সলের দিকে ভালো সেলসম্যান দিয়ে বিক্রি করতে পার তাহলে নিশ্চয় ব্যবসা দাঁড়াবে। কিন্তু তুমি একা একা মাসে ক—টা ট্রানজিস্টার তৈরি করতে পারবে? তোমাকে তো অনেকগুলো লোক রাখতে হবে, তাদের মাইনে দিতে হবে, একটা ছোটো কারখানা মতন করতে হবে, একটা অফিসও চাই, অনেক টাকার ব্যাপার!’
পুলিন বলেছিল, ‘বাবা ষাট—সত্তর হাজার টাকা দিতে পারবেন বলেছেন।’
দুর্গাশঙ্কর টাকার অঙ্ক শুনে হেসে ফেলে বলেন, ‘লাল সাদা সবুজ নানান রঙের ক্যাবিনেটে ছোটো ছোটো পকেট ট্রানজিস্টার বিক্রি হচ্ছে দেড়শো টাকায়। তুমি বরং তোমার ক্যাপিটালের জোর অনুযায়ী নাপিত মুচি চাষিদের কথা ভেবে কমদামি ট্রানজিস্টার তৈরি করো।’
পুলিন চাঁদনিচক বাজারের এক ট্রানজিস্টার ক্যাবিনেট নির্মাতার কাছ থেকে কাঠের কমদামি ক্যাবিনেট কিনে ঘরে বসেই সাতটি ট্রানজিস্টার তৈরি করে ফেলল বাবার দেওয়া টাকায়। কলকাতা আর বিবিধ ভারতী ছাড়া তাতে অন্য কোনো কেন্দ্র ধরা যায় না। সেগুলোর একটি নিয়ে শ্যামবাজারে এক বড়ো গ্রামোফোন রেকর্ড, টেপরেকর্ডার ও রেডিয়ো বিক্রেতার দোকানে যায় যদি তারা বিক্রির জন্য রাখে। তার ট্রানজিস্টারের চেহারা দেখেই দোকানের মালিক সবিনয়ে জানিয়ে দেন প্রদর্শনের জন্য তারা রাখতে পারবেন না। পরামর্শ দেন বিরাটি কি চাকদায় বরং বিক্রির চেষ্টা করুন। পুলিন কিন্তু দমে যায়নি। সে সত্যি সত্যিই বিরাটিতে গিয়ে এক স্টেশনারি দোকানের মালিককে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বেশি কমিশনের প্রস্তাব দিয়ে রাজি করায়। দশদিন পরে গিয়ে সে স্তম্ভিত হয়ে শুনল যে দুটি ট্রানজিস্টার রেখে গেছল সে দুটিই বিক্রি হয়ে গেছে।
সেদিন পুলিন বাড়ি ফেরে আড়াইশো গ্রাম রাবড়ির ভাঁড় হাতে নিয়ে। কাশীনাথ অবাক হয়ে বলে ‘ব্যাপার কী?’
লাজুক হেসে পুলিন বলেছিল, ‘আজ প্রথম রোজগার করলুম।’
‘আজ আর রুটি নয় লুচি দিয়ে রাবড়ি খাব।’ এই বলে কাশীনাথ টিন থেকে ময়দা বার করে মাখতে শুরু করে। আনন্দ হলে অন্তরে খুশি উপচে পড়লে লুচি খাবার ইচ্ছা তাকে তাড়না করে। স্ত্রী মারা যাবার পর সে রাঁধুনি রেখেছে। সন্ধ্যাবেলায়ই রাতের রান্না করে ঢাকা দিয়ে রেখে সে চলে যায়। তার যাবার পরই পুলিন রাবড়ি নিয়ে আসে তাই কাশীনাথকেই ময়দা মেখে লুচি ভাজতে হয়।
দালানে তখন খাওয়ার টেবল ছিল না। ঘরের টেবলে বসে খেয়েছিল পুলিন, আর কাশীনাথ খাটে দেওয়ালে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে কোলে থালা নিয়ে আলগা অলসভাবে রাবড়ির ঝোল মাখানো লুচি চিবোতে চিবোতে বলেছিল, ‘তাহলে তুই রোজগার করলি। আমি তো ভেবেছিলুম যে টাকাটা তোকে দিয়েছি সেটা আর ফিরে আসবে না, মানুষ যে কত ভুল ভাবে!’
পুলিন কথা না বলে টেবলে ডেকচিতে রাখা লুচি তুলে খেয়ে যেতে থাকে। রাবড়ির সবটাই বাবা খাক এটাই তার মনোগত বাসনা। কাশীনাথ লক্ষ করে পুলিন শুধু লুচি খাচ্ছে। রাবড়ির ভাঁড়টা ছেলের দিকে বাড়িয়ে ধরে সে বলে, ‘খেয়েনে। রাতে এত ভারী জিনিস খেলে আমার অম্বল হবে।’
পুলিন ভাঁড়টা নিয়ে নেয়। কাশীনাথ আঙুল চাটতে চাটতে বলে, ‘একটু বড়ো করে এবার শুরু কর। তোকে যেভাবে খাটতে দেখলুম মনে হচ্ছে দাঁড়িয়ে যাবি। এই দুটো ঘরে তো আর কারখানা হয় না। আরও বড়ো জায়গা চাই, টেবিল চাই, আলমারি চাই, যন্ত্রপাতি চাই, গোটা দুয়েক লোকও রাখতে হবে, তাদের মাইনে দিতে হবে। ইনভেস্ট করতে হয়রে, যাকে বলে লগ্নি। কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে মাল তৈরি করলে বিক্রিও হবে তেমনি করে, ওতে ব্যবসা চলে না। তুই একটু বেশি টাকা ঢাল।’
পুলিন লক্ষ করেছিল কথাগুলো বলার সময় কাশীনাথের চোখদুটো উদ্দীপনায় ঝকঝক করে উঠল চশমার পিছনে, উৎসাহে তেজি গলার স্বর যুবকদের মতো। এ যেন অন্য এক কাশীনাথ। ব্যাজার মুখো খিটখিটে লোকটা ছেলের দুটো ট্রানজিস্টার বিক্রির সাফল্যেই চনমন করে উঠেছে। পুলিনের মনে হয়েছিল বাবা বোধহয় মনে মনে তাকে নিয়ে অনেক কিছু ভাবছে। মৃদস্বরে সে বলেছিল, ‘টাকা ঢালতে বলছ কিন্তু টাকা কোথায়?’
কাশীনাথ বলেছিল ‘সে তোকে ভাবতে হবে না। প্রথমে অল্প টাকা দিয়ে শুরু কর, বাজার বুঝে নে। তুই আনকোরা নতুন আমিও তো এই ব্যবসার কিছু জানি না, বুঝিও না। একত্রিশ বছর ধরে শুধু গার্ডের চাকরিই করেছি আর সংসার চালাবার কথা ভেবেছি। তোরা মায়ের চিকিৎসায় যে ক—টা টাকা জমিয়েছিলুম তাও গেল, উপরন্তু ধারও হল। আস্তে আস্তে সেটা শোধ করলুম। তাই বলছিলুম প্রথমেই বেশি টাকা লাগিয়ে শুরু না করে বরং পরিশ্রম দিয়ে পুষিয়ে নে। তোর তো ঝাড়া হাত—পা। বউ—বাচ্চচা নেই, সংসারও চালাতে হয় না, আমি তোকে হাজার তিরিশ দেব।’
