কাশীনাথ অবাক হয়ে বলে, ‘বউভাতের খরচ, ঘড়ি, আংটি, সোনার বোতাম এগুলো দেবে তো? তোর শ্বশুর তো দিয়েছিল।’
‘বউভাতের খরচ অনি নিজে দেবে, বাড়িভাড়া করে লোক খাওয়াবে। অনি আংটি পরে না, সোনার বোতামও নয়, ওর দু—হাজার টাকা দামের ঘড়ি আছে তাই ওসবের কোনো দরকার নেই বলে দিয়েছে।’
‘বাব্বা, তোর ছেলে তো খুব পয়সা করে ফেলেছে! কিছুই নেবে না যখন তখন কোন দুখ্যে অমন একটা মদ্দকে বিয়ে করা? একটা সুন্দর নরমসরম চেহারার মেয়েকে তো বিয়ে করতে পারে।’
এবার পুলিন যতটা সম্ভব গলাটা শক্ত করে বলল, ‘বাবা, অনির হবু শ্বশুর শাশুড়ি সামনের রোববার আসবে পাকা কথা বলতে, তুমি একটু বুঝে শুনে ভদ্রভাবে কথা বোলো।’
‘তার মানে? আমি কি অভদ্র?’
জবাব না দিয়ে পুলিন ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সেদিন রাতে তাদের দু—জনের মধ্যে শোয়ার সমস্যা নিয়ে আবার কথা হয়েছিল। পুলিন হতাশ হয়ে বলে, ‘শেষ পর্যন্ত ওই ফোল্ডিং খাটের জায়গাটাতেই আমাদের দু—জনকে মেঝেয় শুতে হবে।’
ভারতী বড়ো করে শ্বাস ফেলে বলে, ‘অনেক কিছুই মেনে নিয়েছি এটাও মেনে নিতে হবে। ছেলের বিয়ে দিয়ে যে এমন আতান্তরে পড়তে হবে আগে কি ভেবেছিলুম।’
‘আগে ভাবলে কী করতে শুনি? বিয়ে করতে বারণ করতে?’
‘সেকী! অত স্বার্থপর হব কেন। শুধুমাত্র রাতে শোয়ার জায়গার জন্য অনিকে বঞ্চিত করব, একথা বলতে পারলে কী করে?’
‘কী বললুম আর কী তার মানে করলে! বঞ্চিত করার কথা উঠছে কেন। একটা জোয়ান ছেলের তো এই বয়সেই বউ দরকার তা কি আমি বুঝি না? রাতে অন্য কোথাও শোওয়া, মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য, তেমন একটা ব্যবস্থার কথা ভাবা দরকার। যতদিন না ব্যবস্থা হয় অনি বিয়ে পিছিয়ে দিক।’
উত্তেজিত স্বরে ভারতী বলল, ‘বলছ কী! রোববার ওরা বিয়ের কথা বলতে আসবেন আর এখন বলব বিয়ে পিছিয়ে দিতে, তাও এমন একটা কারণে যা শুনলে লোকে হাসবে আর আমাদের মাথা খারাপ হয়েছে ভাববে।’
‘একটু শান্ত হও, আজ তোমার মাথাটা সত্যিই গরম হয়েছে। বাবাকে যেভাবে বললে তাতে আমার চোখ কপালে উঠে গেছল। এত বছর পর এই প্রথম তোমায় সত্যিকারের রাগতে দেখলুম, অবশ্য রাগারই কথা।’
অনুতপ্ত স্বরে ভারতী বলল, ‘কী যে হয়ে গেল তখন মাথার মধ্যে। ‘কুচুটে বুদ্ধি’ কথাটা শুনেই মাথায় রক্ত উঠে গেল। এমন কথা জীবনে কেউ কখনো আমার সম্পর্কে বলেনি। যত বয়স বাড়ছে বাবা যেন আমাদের ওপর নিষ্ঠুর হয়ে উঠছেন।’
‘বলে ভালোই করেছ। কখনো কেউ প্রতিবাদ করেনি, পালটা জবাব দেয়নি তাই যখন তখন অপমান করে গেছে। আসলে দোকানটা থেকে যদি দু—হাত ভরে টাকা রোজগার করতে পারতুম তাহলে আজ এভাবে অপমান করতে পারত না।’
.
পুলিন যে দোকানটার কথা বলল আসলে সেটি ছিল ভারতীর বাবা দুর্গাশঙ্করের ঘড়ি সারাইয়ের দোকান। একসময় তিনি রোলেক্স ঘড়ি কোম্পানিতে মেকানিক ছিলেন। মেয়ে জন্মাবার পরই দোকান করেন। নাম দেন ‘ভারতী ওয়াচ রিপেয়ারার।’ একমাত্র ছেলে দিলীপকে তিনি কাজ শিখিয়ে তৈরি করেছিলেন দোকানে বসাবার জন্য। দোকানটা ছিল চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউয়ের ওপর চোরবাগানে মহাজাতি সদনের কাছাকাছি, ব্যবসার পক্ষে খুব ভালো জায়গা। ছেলের বন্ধু সরল সাদাসিধে ঠান্ডা স্বভাবের পুলিনকে তিনি খুব পছন্দ করতেন। তৃতীয় বিভাগে মাধ্যমিক পাশ করার পর পরীক্ষার মার্কশিট হাতে নিয়ে কাশীনাথ তার ছেলেকে জানিয়ে দেন ‘অনেক হয়েছে, পয়সা নষ্ট করে আর পড়ে কাজ নেই। এবার হাতের কাজটাজ কিছু শেখ নইলে ভবিষ্যতে দু—মুঠো অন্নও জুটবে না।’
মাথা নীচু করে পুলিন শোনে এবং পরের হপ্তায় হেদুয়ার কাছে রেডিয়ো ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ নামে তিনটি ঘর নিয়ে গড়া কলেজে ভরতি হয়। সেখান ছ—মাস শিক্ষা নেবার পরে নিজের হাতে একটা ট্রানজিস্টার তৈরি করে কাশীনাথকে চমৎকৃত করে দেয়। কাশীনাথই পরামর্শ দেয় ‘তুই এবার ট্রানজিস্টার তৈরি করে বিক্রির ব্যবসা কর। রিটায়ার করছি চারমাস পর। পি এফ গ্র্যাচুইটি, ছুটি বিক্রি আর খানিকটা পেনশন বিক্রি করে হাজার সত্তর—পঁচাত্তর মতো পাব, আমাদর রেলের কয়েকজন মিলে কো—অপারেটিভ করে ফ্ল্যাটবাড়ি বানাবে বেলঘরিয়ায়, জমি কেনা ঠিক হয়ে গেছে। আমাকে বলছে মেম্বার হতে, তিন ঘরের ফ্ল্যাট ষাট থেকে সত্তর হাজার টাকা পড়বে। লোন পাওয়া যাবে। যদি ব্যবসা করতে পারিস তো বল। আগেকার ভালভওলা রেডিয়ো তো লোপাট হয়ে গেছে, এখন তো ট্রানজিস্টারের যুগ। ভালো করে আগে ভেবে দেখ, যদি এটা তৈরির ব্যবসা করতে পারবি মনে করিস তাহলে হ্যাঁ বলবি, আমি তাহলে ওদের বলে দোব মেম্বার হব না। আর যদি পারবি না ভাবিস তাহলেও বলে দিবি, তাহলে কো—অপারেটিভের মেম্বর হয়ে যাব। দেরি করিসনি, একমাসের মধ্যে জানাবি।’
ব্যবসার কিছুই জানে না পুলিন, সে গিয়ে জিজ্ঞাসা করল দুর্গাশঙ্করকে। তিনি প্রবলভাবে বাঙালির ব্যবসায়ে নামায় বিশ্বাসী; নিজে চাকরি ছেড়ে দোকান করেছেন এবং তার কাজের গুণে খদ্দের পেয়েছেন এবং নামও ছড়িয়েছে। চাকরি থেকে যে বেতন পেতেন এখন তা দ্বিগুণ রোজগার করেন। ছেলের বন্ধুকে তিনি উৎসাহ দিয়ে বললেন, ‘এই তো চাই। বাঙালিরা শুধু চাকরি খোঁজে, যেমন তেমন একটা চাকরি পেলেই খুশি। অবাঙালিদের দেখো তো, সামান্য পুঁজি নিয়ে শুরু করে, এইতো ভগবতীলাল ছ—বছর আগেও হাতিবাগান বাজারে বসে কাটাকাপড় বেচত, এখন দ্যাখো ওখানেই ট্রামরাস্তার ওপর কাটপিসের দোকান দিয়েছে। ঝকঝকে কাউন্টার দেওয়ালে কাচের মস্ত বড়ো শোকেস। কী করে উন্নতিটা করল বলো তো?’
