‘বাবা, বিয়ে হলে তো অনিকে আমার ঘরটা ছেড়ে দিতে হবে।’
‘তা তো হবেই, তোর বিয়ের পর তো ও ঘরে আমি তোদের থাকতে দিয়েছিলুম।’
‘তা হলে আমরা কোথায় যাব, মানে আমরা কোথায় থাকব?’
পুলিন জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল, তার মনে হল কাশীনাথ থমকে গিয়ে উত্তর খুঁজছে। খবরের কাগজটা তুলে নিয়ে চোখের সামনে ধরল। পুলিন বুঝল বাবা বিব্রত হয়েছে। রাতে খবরের কাগজ পড়তে পারে না, কাগজটা চোখের সামনে ধরা মানে চিন্তা করছে।
মিনিট দুয়েক পর পুলিন নীচু গলায় বলল, ‘বাবা, বলছিলুম কি আমরা এই ঘরেই রাতে শোব। দিনের বেলায় দরকার হবে না। অনি আর বউ তো কাজে বেরিয়ে যাবে তারপর সারাদিন আমরা ও ঘরে থাকব, শুধু রাতে—।’
পুলিনের কথা শেষ হতে না দিয়ে কাশীনাথ বলে, ‘এ ঘরে জায়গা কোথায় যে তোরা শুবি?’
‘জায়গা হয়ে যাবে যদি তুমি অনির ফোল্ডিং খাটটায় শোও। আর এই খাটটা যদি বার করে দেওয়া যায় তা হলে অনেকটা জায়গা বেরোবে, আমরা মেঝেয় শোব।’
‘খাটটা বার করে কোথায় রাখবি?’
কাশীনাথের উৎসুক স্বর শুনে পুলিন হালকা বোধ করল। সহজ গলায় বলল, ‘বার করে রাখব কেন, খাটটা বিক্রি করে দোব।’ কথাটা বলে পুলিন বাবার মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝল বিরাট ভুল করে ফেলেছে।
‘হারামজাদা!’ যে কটা দাঁত এখনও রয়েছে কাশীনাথ সেগুলো চেপে ধরে বলল ‘বিক্রি করে দোব, বলতে লজ্জা করল না? আমার চাকরির টাকায় এই খাটটা কিনেছি। পেরেছিস তুই একটা কিছু নিজের পয়সায় কিনতে?’
চা নিয়ে এল ভারতী। কাশীনাথের শেষ বাক্যটি তার কানে গেছে। জড়োসড়োভাবে কাপটাকে শ্বশুরের সামনে ধরল।
‘এত দেরি হল কেন? জল চড়িয়ে চা—পাতা কিনতে গেছলে?’
ভারতী চুপ করে রইল। চেঁচাবার জন্য শ্বশুর একটা উত্তর চাইছে, উত্তরটা সে জোগাল না।
‘খাট বিক্রির বুদ্ধিটা কি তোমার মাথা থেকে বেরিয়েছে?’
ভারতী চুপ। কাশীনাথের অনুমানটা অর্ধেক সত্য। পুলিন আর ভারতী দু—জনে মিলে মাথা ঘামিয়ে শোবার জায়গা বার করতে গিয়ে খাটটাকে বিদায় দেওয়াই বাস্তব পন্থা বলে মনে করে গত রাতে নিজেদের মধ্যে কথা বলে।
‘কী, চুপ করে আছ কেন? আমি জানি এসব কুচুটে বুদ্ধি পুলিনের মাথা থেকে বেরোবে না, ও চিরকাল বোকা, চালাক হলে পয়সা রোজগার করতে পারত।’
‘পয়সা রোজগারটাই কি মানুষের জীবনে বড়ো ব্যাপার, বাবা?’ ভারতী মৃদুস্বরে অনিশ্চিতভাবে বলল।
‘নিশ্চয় বড়ো ব্যাপার’, কাশীনাথ ধমকে উঠল। ‘টাকার জোরেই মানুষ বড়ো হয়, খাতির পায়, পুলিনকে কেউ কি সমীহ করে, না পাত্তা দেয়?’
‘না, কেউ দেয় না সমীহও করে না।’ ভারতীর কণ্ঠস্বরে চাপা আগুন। পুলিন প্রায় চমকে উঠে বউয়ের দিকে তাকাল, ধকধক করছে ভারতীর চোখ। ‘আপনাকেই বা ক—জন খাতির করে? উঠতে বসতে ছেলেকে অপমান করেন কেন, কী অপরাধ করেছে সে? একটা ছেলেকে তবু সে তৈরি করেছে, এই পাড়ায় কেউ নেই অনির মতো এত বড়ো চাকরি করে। আপনি তো পারেননি নিজের ছেলেকে তৈরি করতে। আপনার থেকে আপনার ছেলে অনেক মান বাড়িয়েছে এই রায় পরিবারের।’
অনুচ্চচ কঠিন গলা ভারতীর। পুলিন তার বউয়ের এমন কঠোর ভঙ্গি এই প্রথম দেখছে। এই প্রথম একজন বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখাল আর সেটা করল কি না অত্যন্ত নরম শান্ত স্বভাবের ভারতী। শ্বশুরের সামনে যে মাথায় কাপড় না দিয়ে কখনো থাকে না এখন তার ঘোমটা খসে পড়েছে, চোখের কোল চিকচিক করছে জলে।
কাশীনাথও অবাক হয়ে গেছে। পুরু কাচের পিছনে তার চোখের অবিশ্বাসী মণি বিস্ফারিত, হাতে ধরা কাপটা থর থর কেঁপে উঠল। বাবার মুখ দেখে পুলিন বুঝল আঘাত পেয়েছে। বউকে মৃদু ধমকে বলল, ‘যাও এখান থেকে।’
ভারতী ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পুলিন অপরাধীর মতো হাত জোড় করে বলল, ‘ওর কথায় কিছু মনে কেরো না বাবা, আমি ওর হয়ে মাপ চাইছি। ইদানীং খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছে।’
‘কীসের দুশ্চিন্তা! শোয়ার জায়গা নিয়ে?’ চায়ে চুমুক দিয়ে কাশীনাথ বলল।
‘শুধু শোবার জায়গা নয়, ওই মেয়েটিকে তোমার বউমারও ভালো লাগেনি।’
‘তা হলে বিয়ে দিচ্ছিস কেন?’
‘অনি পছন্দ করেছে।’
‘অনি পছন্দ করেছে বলেই তাকে বউ করে ঘরে তুলতে হবে? আমি যদি বউমাকে দেখে পছন্দ না—করতুম তা হলে কি ভারতী এই পরিবারে ঢুকতে পারত?’
‘দিনকাল পালটে গেছে বাবা।’
‘পালটে গেছে যে সেটা তো এক্ষুনি বুঝতে পারলুম। মেয়েটার নাম কী? বাড়িতে আছে কে কে?’
‘নাম বলাকা। আছে বাবা—মা আর দুই বোন এক ভাই। বাবা আসামে চা—বাগানে ছিল বড়োবাবু। রিটায়ার করে টালিগঞ্জে বাড়ি করে রয়েছে। এই বঙ্গেরই লোক, পৈতৃক বাড়ি বর্ধমানের কৈচর বলে একটা গ্রামে। সেখানে খুড়তুতো ভাইয়েরাই জমিজমা ভোগ করছে। ওরা কখনো যায় না। বলাকা চাকরি করে ইস্ট ইন্ডিয়া ব্যাঙ্কের শ্যামনগরের ব্রাঞ্চে। দুই বোনের একজন স্কুলে পড়ায় আর একজন কাজ করে একটা ট্র্যাভেল এজেন্সিতে। ভাই যাদবপুরে বিএ পড়ছে।’
স্ত্রীর কাছ থেকে যতটুকু শুনেছিল পুলিন সেটাই সংক্ষেপে বলে।
মন দিয়ে শুনে কাশীনাথ বলে, ‘চা—বাগানের বড়োবাবু ছিল যখন তখন বেশ দু—পয়সা কামিয়েছে। মেয়েরাও রোজগেরে। মনে হয় অবস্থাপন্ন সচ্ছল, দেবেথোবে ভালোই।’
পুলিন ঢোক গিলে বলে, ‘অনি বলেছে কোনো দাবিদাওয়া নয়। এমনকী কোনোরকম জিনিসপত্তরও চাওয়া চলবে না।’
