‘তা হলে আমরা থাকব শোব কোথায়?’ সমস্যাটা পুলিন আর ভারতীকে মনে মনে সিঁটিয়ে রেখেছিল। সমাধান খুঁজতে অবাস্তব প্রস্তাব নিয়ে দু—জনে কথা বলত। ভারতী বলেছিল, ‘রাতে বারান্দায় শুলে কেমন হয়?’
পুলিন চোখ কপালে তুলে বলে, ‘ওই খোলা বারান্দায়? পাগল হয়েছ? বৃষ্টি এলে তখন কী করবে? শীতকালে ঠান্ডায় তো নিমোনিয়া ধরবে। তা ছাড়া বারান্দাটায় দু—জন শোয়ার মতো জায়গা কোথায়? কাঠের পুতুলের মতো সারারাত চিৎ হয়ে থাকতে হবে,আমার দ্বারা তা হবে না।’
ভারতী কোনো তর্কের মধ্যে আর যায়নি। দু—জনের মাথার মধ্যে অবিরাম শোবার জায়গা নিয়ে খোঁজাখুঁজি চলেছিল দু—মাস ধরে। তারা যে অনীশের বিয়ে হলে অথৈ জলে পড়বে তাই নিয়ে ছেলের মধ্যে কোনো উদবেগ দেখতে না পেয়ে পুলিন ক্ষুব্ধ হয়ে স্ত্রীকে বলে, ‘লক্ষ করেছ আমাদের রাতের থাকা নিয়ে ও একটি কথাও বলছে না। এটা যে কত বড়ো সমস্যা সেটা কি ও বুঝতে পারছে না?’
‘পারবে না কেন!’ ভারতী ক্ষোভের সঙ্গে অভিমান মিশিয়ে বলে, ‘বুদ্ধিমান লেখাপড়া জানা ছেলে বাবা—মায়ের অসুবিধের দিকটা একবারও ভাববে না তাই কি হয়?’
সেই মুহূর্তে পুলিনের মনে বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে হয়েছিল, বাবার এত বছর ধরে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয়?
‘আচ্ছা, বাবাকে অনির ফোল্ডিং খাটটায় শুতে বললে কেমন হয়।’ চিন্তাটা হঠাৎই এসে গেল পুলিনের মাথায়।
ভারতী আঁতকে উঠে বলে, ‘শুনলেই বাবা যা বলবেন তাতে বাড়ি ছেড়ে হয় চলে যেতে হবে নয়তো দু—জনকেই গলায় দড়ি দিতে হবে। তুমি বলে দেখতে পার।’
পুলিন তার যাবতীয় সাহস জড়ো করে বাবার ঘরে আসে, কাশীনাথ তখন প্রতিদিনের মতো দেওয়ালে বালিশ রেখে ঠেস দিয়ে দু—পা ছড়িয়ে টিভি দেখছিল। পুলিন খাটের একধারে বসে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। একটা বাংলা সিরিয়াল দেখানো হচ্ছে। এটা সে এক বছর আগেও চলতে দেখেছিল। বিজ্ঞাপন দেখানোর বিরতি সময়ে পুলিন বলল ‘কত পর্ব চলছে?’
‘পাঁচশো দশ।’ দ্রুত উত্তর দিল কাশীনাথ।
‘ভালো লাগছে দেখতে?’
‘প্রত্যেকটা পর্ব দেখেছি একটাও মিস করিনি। তুই দেখিস না কেন, বউমা এসেও তো দেখতে পারে।’
পুলিনের মনে হল বাবার মেজাজ আজ নরম রয়েছে, নয়তো এমন উদার আহ্বান সচরাচর ঘটে না। সিরিয়াল আবার শুরু হল বিজ্ঞাপন দেখানোর পর। ভারতী তার মধ্যে একবার এসে বলল, ‘বাবা চা খাবেন?’ কাশীনাথ মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল।
সিরিয়াল শেষে পুলিন বলল, ‘বাবা, অনির এবার বিয়ে দোব ঠিক করেছি।’
‘কার সঙ্গে? ওই দোতলার মেয়েটা?’
‘না। অনি নিজেই ঠিক করেছে।’
‘তা হলে তুই বিয়ে দিবি বললি কেন, ও তো নিজেই বিয়ে করছে, যেমন তুই করেছিলি?’
পুলিন চোখ নামিয়ে মাথা নীচু করল। বাবা অসত্য কিছু বলেননি, তবে তফাত একটা আছে। অনি ভাবসাব করে বিয়ে করছে। ভারতীকে সে তিন—চার বার মাত্র চোখে দেখেছিল বিয়ের আগে আর, কথা যা বলেছিল সেটা না—বলারই মতো। যেমন দিলীপ বাড়ি আছে? দরজা থেকে ভারতী বলেছিল, ‘দাদা এইমাত্র বেরোল। কিছু বলতে হবে?’ ‘না থাক। বোলো আমি এসেছিলুম।’ আর একবার পুলিন কড়া নাড়তে ভারতী দরজা খোলে। ‘কাকাবাবু আছেন?’ ‘আছেন। বাবা আহ্নিক করছেন, আপনি বাইরের ঘরে বসুন।’ এই রকমই ছিটেফোঁটার বেশি কথা বন্ধুর বোনের সঙ্গে হয়নি অথচ কাশীনাথ বলে দিল অনির মতো সে নিজেই বিয়ে করেছে।
বাবা খুব ভালোভাবেই জানে তার বিয়েটা ভাবসাবের বিয়ে নয়। ভারতীর বাবা এসে বিয়ের কথা পাড়ে, কাশীনাথ ওদের বাড়ি গিয়ে মেয়ে দেখে সম্মতি দিয়েছিল।
পুলিন এটা নিয়ে কিছু বললেই কাশীনাথের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হবে এবং সে তিরিশ বছর পর এখন কোনো প্রমাণই দাখিল করতে পারবে না যে ভারতীর সঙ্গে বিয়ের আগে তার হৃদয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। এমনকী ভারতীকে বিয়ে করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছাও তার মনে কখনো উঁকি দেয়নি যদিও সামান্য খাটো মাথার, গৌরাঙ্গী মাধ্যমিক পাশ সুন্দর মুখশ্রীর বন্ধুর বোনের প্রতি সে দুর্বলতা দেখাতে পারত।
‘সেদিন একটা মেয়ে এসেছিল। আগে কখনো দেখিনি, ওই মেয়েটাকেই কি অনি বিয়ে করবে বলছে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ আমাকে দেখল, ভাবলুম বলি, কী দেখছ অমন করে, আমি কি জেলেপাড়ার সং?’
পুলিন শিউরে উঠল, ‘ভাগ্যিস বাবা বলেনি। মেয়েটি তা হলে হবু শ্বশুর ঘর সম্পর্কে কী ধারণা করে বসত।
‘তা অনি আর মেয়ে পেল না। অমন ঘোড়ার মতো মুখওলা মেয়েকে পছন্দ করল কী করে?’
পুলিন চুপ করে রইল। কাশীনাথের প্রশ্নটা ভারতীও রাত্রে বিছানায় শুয়ে ক্ষুব্ধ বিস্ময় নিয়ে বলেছিল, ‘মুখটা যেন কেমন, গোল গোল চোখে যেভাবে তাকিয়ে কথা বলছিল মনে হচ্ছে যেন ধমকাচ্ছে, গলার স্বরটাও তেমনি পুরুষ মানুষের মতো।’
‘যাকগে, এ নিয়ে তুমি যেন অনিকে কিছু বলতে যেয়ো না।’ পুলিন বউকে ঠান্ডা গলায় বলেছিল, ‘মানিয়ে নেবার চেষ্টা কোরো। অনি যদি ওকে নিয়েই সুখী হয় তাতে আমাদের কী বলার আছে।’
সেদিন বাবার কথার পিঠে কথানা বলে পুলিন মাথা নামিয়ে থেকে ‘যেমন তুইও করেছিলি’ মিথ্যেটা মেনে নেয়। বাবার সঙ্গে যে কথাটা বলার জন্য সে এসেছে সেটা অনেক জরুরি। পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে আসল কথা থেকে সরে গেলে চলবে না। বাবার মেজাজ আজ নরম রয়েছে।
