ভারতী একদৃষ্টে তাকিয়েছিল ছেলের দিকে। তাদের একমাত্র সন্তান। বুদ্ধিদীপ্ত ঝকঝকে চোখ, সুন্দর নাক কপাল, চুলের একটা গুচ্ছ ফরসা কপালের উপর ছোরার মতো বেঁকে ঝুলে রয়েছে, গলার স্বর জলস্রোতের মতো মসৃণ, উচ্চচারণ স্পষ্ট। প্রায় ছয় ফুট দীর্ঘ, ছিপছিপে। ওর কথা বলা, হাসির শব্দ, তাকানো, হাঁটার ভঙ্গি এই পরিবারের বা এই বাড়ির এমনকী এই পাড়ারও কারোর সঙ্গে মেলে না। ভারতী গর্বিত তার ছেলের জন্য।
অনীশের কথাগুলো মুগ্ধের মতো শুনছিল ভারতী। শুনতে শুনতে তার মনে হয় সত্যিই অন্যায় হবে তাদের পছন্দ অনির উপর চাপিয়ে দিলে। বড়ো হয়েছে, লেখাপড়া শিখেছে। ওর মাপের মেয়ে উমা নয়, ওর সঙ্গে খুব খাপ খাবে না এটা সে বোঝে। তবুও উমাকে তার পছন্দের বড়ো কারণ মেয়েটি এই সংসারের মানসিকতার সঙ্গে মানানসই হবে। সহজভাবে দুধের সঙ্গে দুধ মেশার মতো মিশে যাবে, ছানাকাটা হয়ে যাবে না।
অনীশ স্পষ্টভাবে তার উচ্চচাকাঙ্ক্ষার কথা জানিয়ে দেওয়ায় ভারতী ক্ষুণ্ণ হল না, অভিমানও জমল না তার মন বরং হাঁফ ছেড়েই বাঁচল। অনি বড়ো হতে চায় এবং হওয়ার পথে একধাপ এগিয়েছে। রোজ সকাল আটটায় একটা সাদা অ্যাম্বাসাডর গাড়ি এসে দাঁড়ায় গলি আর বড়ো রাস্তার মোড়ে। অফিসের গাড়ি, তাতে আরও দু—জন থাকে। কোট—টাই পরা অনি ছোটো চামড়ার ব্যাগ হাতে গাড়ির পিছনের সিটে বসে। ভারতী বারান্দা থেকে দেখে গলির বা এ—বাড়ি ও—বাড়ি থেকে কেউ অনিকে দেখছে কি না। চাকরি করতে অফিস গাড়ি পাঠিয়ে নিয়ে যায়, এটা তো বড়ো কাজ করারই লক্ষণ, ছেলের বড়ো হওয়ার পথে একটা ঢিলও পড়ে থাকলে ভারতী তা সরিয়ে ফেলে দেবে।
সেই রাতেই অন্ধকার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভারতী গলা নামিয়ে পুলিনকে জানাল, ‘অনিকে বলেছি।’
‘কী বলেছ?’ ভ্যাপসা গরম, হাওয়া নেই। ভিজে গামছায় গা মুছে গামছাটা শরীরে জড়িয়ে পুলিন টুলে বসেছিল।
‘উমার কথা।’
‘নিশ্চয় রাজি হয়নি।’
ভারতী অবাক হয়ে বলল, ‘তুমি জানলে কী করে?’
পুলিন বাবার অন্ধকার ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অনি কি ঘুমিয়ে পড়েছে?’
‘তাড়াতাড়ি না ঘুমোলে সকাল আটটার মধ্যে তৈরি হওয়া যায় না। ওর জন্যই বাবা আগের মতো বেশি রাত পর্যন্ত টিভি দেখতে পারেন না।’
সাত বছর আগে কাশীনাথ দেড় হাজার টাকায় একটা সাদা—কালো ছোটো টিভি সেট কেনে। সারা গুহভবনে এখন ওই একটিই সাদা—কালো সেট টিকে রয়েছে। পুলিন একবার বলেছিল, ‘বাবা এবার একটা কালার টিভি কেনো।’ শুনেই কাশীনাথ জানতে চায়, ‘দাম কত?’
পুলিন বলেছিল, ‘হাজার বারো—চোদ্দো পড়বে।’ নির্বিকার স্বরে কাশীনাথ জানিয়ে দিয়েছিল ‘তা হলে তুই কিনে দ্যাখ।’
‘অনি কোনোদিনই টিভি দেখা পছন্দ করেনি, দেখলে নাকি বুদ্ধি মোটা হয়ে যায়। কী জানি! আমার তো বেশ ভালোই লাগে।’ কথাটা বলে পুলিন অন্ধকারে ভারতীর মুখ দেখার চেষ্টা করল।
‘কোনটা যে তোমার খারাপ লাগে এখনও তো সেটা জানলুম না।’
‘অনেক কিছুই তো তুমি জান না, এটাও নয় নাই জানলে। অনি যে রাজি হবে না সেটাও তুমি জানতে না। ছেলেটা যে বদলে যাচ্ছে সেটা তুমি একদমই লক্ষ করোনি। করলে উমার সঙ্গে কেন, আমাদের পছন্দের যেকোনো মেয়ের সঙ্গে ওর বিয়ে দেওয়ার চিন্তা তুমি করতে না। গোবর গণেশ মার্কা ছেলে নয়, ভীষণ পরিশ্রমী, এরা নিজের ভালোমন্দ সম্পর্কে টনটনে হয়। মেয়ে পছন্দটা ওকেই করতে দাও। চলো ঘরে যাই।’ পুলিন উঠে দাঁড়াল।
বিছানায় পাশাপাশি শুয়ে প্রায় পাঁচ মিনিট কাটাবার পর ভারতী বলল, ‘ঘুমোলে?’
‘না।’
‘একটা কথা মনে এল।’ ভারতী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল, ‘বিয়ের পর অনির জন্য তো একটা ঘর দরকার হবে।’
‘হবেই তো।’
‘কোন ঘরে থাকবে?’
‘কেন, এই ঘরে!’ দ্রুত উত্তর দিয়েই পুলিনের খেয়াল হল ভারতীর গলার স্বরে কেমন যেন দ্বিধা আর অস্বস্তি ছিল। স্ত্রীর দিকে পাশ ফিরে সে বলল, ‘তোমার তাতে আপত্তি আছে?’
‘আপত্তি কেন হবে, তা হলে আমরা থাকব শোব কোথায়? ঘর তো মোটে দুটো। ও ঘরে রয়েছে বাবা। আমরা ও ঘরে গেলে বাবা যাবেন কোথায়?’
সমস্যাটা এবার বুঝতে পারল পুলিন। শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর ভারতী এই সংসারে আসে। তখন এই ঘরটা তারা দু—জন পায়। সংসারে লোক মাত্র তিনজন। কাশীনাথ স্থানান্তরিত হয়ে চলে আসে দ্বিতীয় ঘরে, একটা ক্যাশবাক্স আর সিঙ্গল খাট, কাঠের আলমারি, টেবল, চেয়ার নিয়ে কাশীনাথ তিরিশ বছর ধরে রয়েছে সেই ঘরে। অনীশ পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত বাবা—মায়ের সঙ্গে শুয়েছে। এক রাত্রে ভারতী টের পায় ছেলে জেগে রয়েছে। পরদিনই সে স্বামীকে বলে ‘তুমি মেঝেয় শোও, অনিকে নিয়ে আমি খাটে শোব। ও বড়ো হচ্ছে, অনেক কিছু বুঝতে শিখেছে।’
ক্লাস এইটে পড়র সময় অনীশ বলল সে দাদুর ঘরে শোবে। কাশীনাথ খুশি হয়ে বলল, ‘দাদুভাই আমার সঙ্গেই খাটে শোবে।’ অনীশ শুধু একরাত সেই সিঙ্গল খাটে দাদুর সঙ্গে শোয়ার পরই বলেছিল ‘আমি কাল থেকে মেঝেয় শোব, দু—জনে ওই খাটে শোয়া যায় না।’
খাটের পাশে আড়াই হাত খালি জায়গা তারপরই কাঠের আলমারি আর টেবল। টেবলটা সরিয়ে ঘরের অন্য কোথাও রাখার জায়গা না—পাওয়ায় সেই আড়াই হাতেই অনি রাতে কয়েকদিন শোয়। সকালে ঘুম থেকে উঠে শতরঞ্চি সমেত তোষক আর বালিশ গুটিয়ে খাটের নীচে ঠেলে দিত। তারপর সে কিনে আনে একটা ফোল্ডিং খাট। বিয়ের আগে পর্যন্ত তাতেই সে শুয়ে এসেছে।
