অনন্ত ফিরে আসার সময় সিঁড়ির কাছে তাকে পাশ কাটিয়ে পথটার দিকে চলে গেল একজন মহিলা। যাবার সময় কৌতূহলে তার দিকে একবার তাকিয়েছিল। ডান গালে আঁচিল, হাতে ছাতা আর ব্যাগ, ছোটোখাটো ফরসা চেহারা। কালো ফ্রেমের চশমা। দ্রুত ছোটো পদক্ষেপ, পরনে কালো সরু পাড় সাদা মিলের শাড়ি। তার মনে হল, ইনিই বোধ হয় ঘরটায় থাকেন। ভাড়াটে? কিন্তু একতলায় দোকান ছাড়া আর তো কোনো ভাড়াটে নেই।
কয়েক মিনিট অপেক্ষা করে অনন্ত ঘরটার কাছে ফিরে এল। আলো পাওয়ার জন্য জানলার পর্দা অল্প সরানো, দরজার পর্দাও। কিন্তু তাতেও ঘরের ভিতরটা আবছা। অনন্ত কিছুই দেখতে পেল না। বাসন নাড়ানোর শব্দ এল।
মহিলা প্লাস্টিকের একটি বালতি হাতে হঠাৎ বেরিয়ে আসতেই অনন্ত এক পা সরে গেল। মহিলা তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কাউকে খুঁজছেন কি?’
‘হ্যাঁ, মানে আমি ভাড়া তুলতে এসেছি, নতুন, আজই প্রথম। আপনি কি টেনান্ট?’
‘টেনান্ট বললে টেনান্ট, নয়তো নয়।’
‘তার মানে!’
‘আপনি একটু দাঁড়ান, আমি জলটা ধরে নি। ছাদের ট্যাঙ্কে মাঝে মাঝে জল থাকে না, খুব অসুবিধায় পড়তে হয়…আপনি বরং ঘরে বসুন।’
‘না না এই তো বেশ আছি। আবার কেন…।’
কথা না বাড়িয়ে উনি কলঘরের দিকে গেলেন। চাবি দিয়ে কলঘরের তালা খুললেন। দরজা ভেজিয়ে দিলেন ভিতরে ঢুকে। অনন্তের মনে হল, এটাও পরিমল চাটুজ্জের আর একটা রোজগারের ব্যবস্থা। লোকটাকে তার দেখার ইচ্ছা হচ্ছে। শুনেছে বাগুইহাটিতে জমি কিনে একতলা বাড়ি তৈরি করেছে।
জলভরা বালতি নিয়ে উনি ফিরতেই অনন্ত জিজ্ঞাসা করল, ‘চাবি কি আপনার কাছেই থাকে?’
‘এটা ডুপ্লিকেট। দোকানের ওদের কাছেও একটা করে আছে।’
পর্দা সরিয়ে উনি ঘরে ঢুকে ভিতর থেকেই বললেন, ‘আপনি ভেতরে এসে বসুন।’
অনন্ত সামান্য দ্বিধা করে ঘরে ঢুকল। ঘরটা বেশ বড়োই। দড়িতে পর্দার কাপড় ঝুলিয়ে ঘরটা দু—ভাগ করা। উনি পর্দার ওধারে গেছেন হয়তো বাইরের কাপড় বদলাতে।
পর্দার এধারে অর্থাৎ দরজার কাছাকাছি খুবই পুরোনো একটি কাঠের গোলাকার টেবল আর দুটি হাতলবিহীন চেয়ার। টেবলে কয়েকটি পুরোনো বাংলা খবরের কাগজ সযত্নে ভাঁজ করে রাখা। শুধুই তারিখ দেওয়া একটা ক্যালেন্ডার দেওয়ালে। ঘরের কোণে এইমাত্র ছেড়ে রাখা জুতোর পাশে হাওয়াই চটি। ছোটো একটা জলচৌকিতে কুঁজো আর কাচের গ্লাস। জানলার কাছে নীচু একটা জালের আলমারি, তার উপরে কেরোসিন স্টোভ। জলের বালতিটা ওখানেই রাখা। আলমারিটাই বোধ হয় ভাঁড়ার এবং রান্নাঘরের কাজ করে। পর্দার ওধারে কী আছে অনন্ত তা জানে না। কিন্তু এধারে এত কম আসবাব এবং সেগুলি এত পরিচ্ছন্ন, গোছানো যে তাই থেকে এর মালিকের মানসিক গঠনটা যেন আঁচ করা যায়…নির্বিরোধী এবং কল্পনাপ্রবণ। অনন্তের মনে হল এই মহিলার সঙ্গে ঘরের চেহারাটার খুবই মিল আছে।
‘বসুন। বলুন কী বলছিলেন?’
একটা চেয়ারে উনি বসলেন অনন্তের মুখোমুখি। পর্দার ওধারে হালকা একটা ধোঁয়ার শিষ লতিয়ে উঠেছে। ধূপ জ্বালিয়েছেন। শাড়ি বদলে একটা সাদা থান পরেছেন। চশমার কাচ কাপড়ে মুছতে মুছতে হাসি মুখে তাকিয়ে। চোখের কোলে কালো ছোপ। বয়স বোধ হয় চল্লিশের এধার ওধারে।
‘আপনি কদ্দিন আছেন!’
‘তিন বছর।’
‘ভাড়া কত?’
‘সস্তাই, চল্লিশ টাকা।’
‘আপনার নাম কিন্তু আমাদের খাতায় নেই।’
সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। ভ্রূ কুঁচকে সন্দিহান গলায় বললেন, ‘নাম নেই…কেন?’
‘কাকে ভাড়া দিতেন?’
‘পরিমলবাবুকে, তিনিই তো মালিকের লোক!’
‘হ্যাঁ। বিল দিতেন?’
‘নিশ্চয়, দাঁড়ান আপনাকে দেখাই।’
উনি উঠে গেলেন। দড়িতে কড়া লাগানো পর্দাটা সরিয়ে ভিতর মহলে যাবার সময় অনন্ত ওঁর দিকে তাকিয়েছিল। তাই সে সরানো পর্দার ফাঁকা জায়গা দিয়ে দেখতে পেল দেওয়ালে প্রায় এক হাত চতুষ্কোণ, সাদা ফ্রেমে বাঁধানো একটা ফোটো। একটি পুরুষের মুখ, গলা ও কাঁধ দেখা যাচ্ছে। ফোটোর নীচে কাঠের ব্র্যাকেট, সেখানে ধূপদানিতে তিন—চারটি জ্বলন্ত ধূপ।
ধীরে ধীরে অনন্তের ঘাড় থেকে শিরদাঁড়া বেয়ে চলন্ত পোকার মতো একটা বিস্ময় নেমে গেল কোমর পর্যন্ত। বাবা! কোনো সন্দেহ নেই। ডান দিকের রগের কাছে কাটা দাগটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ওটা নাকি স্কুলে পড়ার সময় কংগ্রেসের সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মিছিলে পুলিশের লাঠিতে হয়েছে। বাবা এর বেশি তাদের কিছু বলেনি।
এখানে এমন অকস্মাৎ বাবার ছবি দেখতে পেয়ে অনন্ত প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খেল। তার বোধ ও যুক্তির শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার মতো দশায়। টেবলে রাখা আঙুলগুলো থরথর করছে, গলা শুকিয়ে এল। মাথায় একটা চিন্তাও স্থির থাকছে না।
ইনি তা হলে কে? বাবার ছবি এত যত্নে টাঙানো, ধূপ জ্বালানো…কে হন? মনের মধ্যে হঠাৎ ঝলসে উঠল বাবাকে লেখা কে এক মিনুর চিঠিটা।
‘এই যে পাঁচ মাস আগের একটা বিল।’
অনন্ত অসাড় হাতটা বাড়িয়ে বিলটা নিল। হুবহু তার কাছে যে বিল রয়েছে সেই রকমই। এস্টেটের স্ট্যাম্পটা আসলই কিন্তু সইটা কেমন জড়ানো, কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
মিনতি করের নামে বিল। ডাকনাম মিনু হওয়াই সংগত।
‘মিনতি কর আপনার নাম?’
‘হ্যাঁ।’
‘পরিমলবাবুর সই?’
‘বলতে পারব না, উনি লিখেই আনতেন, শুধু তারিখটা বসাতেন ভাড়া নেবার সময়।’
