‘আমারও লাগে। স্বভাবটা খুব নরম, ব্যবহার মিষ্টি, সাজগোজের বাহার নেই। দেখা হলেই জিজ্ঞাসা করে ‘কাকাবাবু কেমন আছেন?’ ভালো আছি বললে কাকিমার কথাও জিজ্ঞেস করে।’
ভারতী বলে, ‘ওদের পরিবারটা অবস্থাপন্ন নয়, কিন্তু অল্পের মধ্যেই কী সুন্দর গুছিয়ে চলে, একটুও বাজে খরচ নেই। ছেলেমেয়েরা যেমন চালচলনে ভদ্র তেমনি খুব পরিশ্রমীও। এই গুণগুলো ওরা পেয়েছে মায়ের কাছ থেকে।’
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ভারতী প্রায় স্বগতোক্তির মতো বলল, ‘উমাকে বউ করে আনতে খুব ইচ্ছে করে, একটা লক্ষ্মীশ্রী আছে ওর মুখে। ওরাও তো বামুন, তুমি কী বলো?’
‘আমি বললেই তো হবে না, অনি কী বলে সেটাই আসল কথা। ছেলে লেখাপড়া শিখেছে। নিজস্ব বোধবুদ্ধি তৈরি হয়েছে, বড়ো সার্কেলে ঘোরাঘুরি করে, অতবড়ো কোম্পানিতে ভালো পোস্টে ঢুকেছে, ভবিষ্যতে আরও ওপরে উঠবে। ওর রুচির সঙ্গে আমাদের রুচি মিলবে এমন তো কোনো কথা নেই। তবে উমা আমাদের সংসারে এলে খুব খুশি হব।’
আমি ভাবছি একবার অনির কাছে কথাটা পাড়ব। আমার কেমন যেন মনে হয় একটা সম্পর্ক ওদের মধ্যে গড়ে উঠেছে। তোমার মনে আছে উচ্চচমাধ্যমিক পরীক্ষার আগে উমা সন্ধেবেলায় অনির কাছে বিজ্ঞান আর অঙ্ক পড়তে আসত, এই ঘরে বসে অনি পড়াত?’
‘মনে আছে।’
‘আমি রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকতুম, তুমি বাবার ঘরে বসে টিভি দেখতে। একদিন কী একটা দরকারে ঘরে গিয়ে দেখি ওরা দু—জন নেই, বইখানা পড়ে রয়েছে।’
‘ওরা কোথায় ছিল?’
‘বারান্দায়, অন্ধকার বারান্দায়, আমার সাড়া পেয়ে তাড়াতাড়ি চোরের মতো দু—জনে ঘরে ঢুকে এল। তখনই আমার মনে হয়েছিল কিছু একটা চলছে, তোমাকে তখন বলিনি।’
‘অনির বয়স কম, উমারও। উঠতি বয়সে ওরকম একটু—আধটু হয়ে থাকে। ও নিয়ে কেউ চিন্তা করে না। একটু বয়স বাড়লেই সব ঠিক হয়ে যায়। তোমার হয়নি?’
‘নাহ।’
‘লজ্জা পাচ্ছ কেন, বলেই ফেলো না।’
‘বললুম তো, কিছু হয়নি।’
‘আমারও হয়নি।’
‘জানি।’
‘জানি মানে? কী করে জানলে প্রেম করিনি? তুমি তো আমাদের পাড়ায় থাকতে না, এখান থেকে আধমাইল দূরে ছিল তোমার বাপের বাড়ি, তা হলে জানলে কী করে?’
উলটোমুখে পাশ ফিরে শুতে শুতে ভারতী বলল, ‘জানার জন্য পাড়ায় থাকতে হবে কেন? এত বছর ঘর করে তা হলে কী বুঝলুম, ওকাজ তোমার দ্বারা সম্ভব নয়।’
এরপর পুলিন ‘তোমার দ্বারা সম্ভব নয়,’ কথাটার অর্থ উদ্ধার করতে ক্রমশ জীবনটাকে পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে কৈশোর পর্যন্ত পৌঁছল এবং অবাক হয়ে গেল এমন একটি মেয়েকেও খুঁজে না পেয়ে যার কাছ থেকে সে সামান্যতম ইঙ্গিত পেয়েছে যাতে হৃদয় ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে নিজের অতীত জরিপ করার ফলটা মনে মনে নিজেকে শুনিয়ে দিল—চেষ্টা করলে কি আর প্রেমে পড়তে পারতুম না। চেষ্টাই করিনি। আসলে আমি ভালো ছেলে ছিলুম।
.
ছেলেকে খাওয়ার টেবলে একা পেয়ে ভারতী জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘উমাকে তোর কেমন লাগে রে অনি?’
হঠাৎ এমন প্রশ্নে যে—কোনো বুদ্ধিমান যুবক মুহূর্তে হুঁশিয়ার হয়ে যায়, বিজনেস ম্যানেজমেন্ট পড়া তুখোড় যুবক, এ দেশে ব্যবসায়ে সদ্য প্রবেশ করা সুইডিশ রং প্রতিষ্ঠান স্টান্ডার্ড পেইন্টসের ট্রেনি মার্কেটিং একজিকিউটিভ অনীশ আলগা ভঙ্গিতে বলল, ‘উমাকে তো ভালোই লাগে। যথেষ্ট সরল যা ওর বয়স মেয়েদের মধ্যে চট করে দেখা যায় না। পড়াতে গিয়ে দেখেছি তো কী পরিশ্রম করে এক—একটা ব্যাপার বোঝার জন্য, সত্যিই এজন্য ওকে শ্রদ্ধা করতে হয়। হায়ার সেকেন্ডারিতে ফার্স্ট ডিভিশন পাবে এটা আশা করিনি।’
শ্রদ্ধা শব্দটি ভারতীকে একটু দমিয়ে দিল। এমন গম্ভীর মনোভাব যার প্রতি তাকে বিয়ে করার মতো হালকা—ভারতীর মনে হয় বিয়ে বা দাম্পত্য জীবনকে গুরুতরভাবে নেওয়ার কোনো মানে হয় না—প্রস্তাব ছেলের কাছে পাড়া যায় কি না সেটাও ভেবে দেখা দরকার। পুলিন বলেছিল ছেলের রুচির সঙ্গে ওর বড়ো চাকরির সঙ্গে আমাদের ইচ্ছে মিলবে এমন কোনো কথা নেই।
অনীশ নিজের থেকেই বলল, ‘হঠাৎ উমাকে কেমন লাগে একথা আচমকা জিজ্ঞাসা করলে কেন, ব্যাপারটা কী? বিয়েটিয়ের কথা ভাবছ নাকি?’
ভারতী অপ্রতিভ হয়, ধরা পড়ে। ঢোঁক গিলে বলে, ‘যদি ভেবেই থাকি তাতে দোষের কী? তুই কি ওর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হোসনি? অনি, আমার চোখ কিন্তু শকুনের মতো।’
চোখ বড়ো করে অনি বলে, ‘শকুনের চোখ থাকে ভাগাড়ের দিকে। তুমি আমাকে ভাগাড় ভাবলে।’ বলে হতাশায় মাথা নাড়ল সে।
‘কথা ঘোরাসনি, তোকে আমি কী ভাবি তা ভালো করেই জানিস। উমাকে আমার, আমাদের খুব পছন্দ। ওকে বউ করে আনলে সংসারটা সুখের হবে।’
হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেল অনীশ। টেবল থেকে উঠে বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে তোয়ালেতে হাত মুখ মুছে বলল, ‘সংসার সুখের হবে তুমি ভাবলে কিন্তু আমার কথাটা তুমি ভাবলে না। হ্যাঁ, উমার সঙ্গে সামান্য ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল তখন আমি কলেজে পড়ি। কিন্তু তারপর আমার বয়স বাড়ল অভিজ্ঞতা বাড়ল, সময়ও বদলে গেল, আমার জগৎ এই ছোট্ট সংসার ছাড়িয়ে বাইরে ছড়াতে লাগল, আমি আরও ওপরে তাকাতে শিখলাম, আমি ঠিক করে ফেললাম নিজেকে আরও বাড়াতে হবে, উন্নতি করতে হবে, প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। এর মধ্যে অন্যায় তো কিছু নেই। আমার অ্যাম্বিশানের মধ্যে উমাকে জায়গা দেওয়া যায় না, মা।’
