কাশীনাথ বলল, ‘ভুল কেন হবে, ফুল তো ভালো জিনিস, দেখলে মন ভালো হয়, গন্ধে ফুরফুর করে মেজাজ, ফুলগুলো বিছানায় ছড়িয়ে দিয়ে শুবি। ভালো ফুলশয্যে হবে।’
রাগে টকটকে হয়ে উঠল পুলিনের ফরসা মুখ। রজনীগন্ধার ছড়াগুলো মুঠোয় ধরে মুচড়ে দালানের কোনায় ছুড়ে ফেলে চেঁচিয়ে ওঠে, ‘মরো মরো, আমি নাচতে নাচতে খই ছড়িয়ে ঘাটে নিয়ে যাব। কাকে কী বলতে হয় সেই জ্ঞানটুকু হারিয়েছ?’
কাশীনাথ গায়ে মাখল না কথাগুলো, বলল, ‘আমি মরলে তোর কি কিছু সুবিধে হবে? তাহলে বল আজই আমি গঙ্গায় গিয়ে ডুবে মরব।’
‘তাই মরো, হাড়ে বাতাস লাগবে।’ বলেই পুলিন নিজের ঘরে ঢুকে যায়।
কাশীনাথ দলাপাকানো ফুল আর কুঁড়িগুলো মেঝে থেকে তুলে নিয়ে নিজের ঘরে এসে খাটে ছড়িয়ে দিয়ে ভারতীকে ডাকল।
‘বউমা আমি কি খুব খারাপ কথা বলেছি? এই বিছানায় শুলে তো ফুলশয্যাই হবে নাকি?’
‘তা হবে; তবে ফুল ছড়ানো বিছানায় শোয়ার একটা বয়স আছে, আপনি আশি পার হয়ে গেছেন, এটা মনে রাখেন না কেন?’ নরম গলায় বলে ভারতী। শ্বশুরকে দেখে সে অন্তর থেকেই কষ্ট পায়, মায়া বোধ করে। পঞ্চাশ বছর আগে ক্যানসারে বউ মারা যায়। ভারতী তার শাশুড়িকে দেখেনি। আটত্রিশ বছর ধরে নিঃসঙ্গ, বিপত্নীক, নির্বান্ধব মানুষটিকে সে বোঝার চেষ্টা করে চলেছে, তবে বুঝে ফেলেছে এমন দাবি করার মতো অবস্থায় এখনও সে আসেনি।
‘আশি বছর হলে কি ফুলের গন্ধ নেওয়া বারণ, ফুলের পাপড়ি গায়ে লাগানো অন্যায়?’ কাশীনাথের চোখ দুটো অসহায়ের মতো দেখাল পুরু কাচের ওধারে।
‘কে বলল বারণ! এখন তো আপনি বেশি করে আরাম করবেন, শখ মেটাবেন! জীবনের বেশিরভাগটাই খাটাখাটুনিতে কাটিয়েছেন, এবার হাত—পা ছড়িয়ে বাকি দিনগুলো কাটাবেন।’
কাশীনাথ অবাক চোখে পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে ছিল, ‘তুমি বলছ আরাম করব, শখ মেটাব, বলছ?’
‘হ্যাঁ বলছি। বলুন কী শখ আছে আপনার?’
‘একবার ধুতি পাঞ্জাবি পরে বড়ো রাস্তা পর্যন্ত হেঁটে যাব, তুমি থাকবে আমার সঙ্গে। পুলিনের বিয়ের সময় করানো তসরের পাঞ্জাবি আর কাঁচি পাড় ধুতি তোমার ঘরের দেরাজে আছে, এনে দেবে?’
ভারতী কাঠের আলমারির নীচের তাকে পুরোনো শাড়ি, ধুতি, প্যান্ট, বাতিল বেডকভার আর বালিশের ওয়াড়ের তলা থেকে বার করল কাশীনাথের তসরের পাঞ্জাবি। রং জ্বলে গেছে, খয়েরি ছোপ পড়েছে, ভাঁজ থেকে কাপড় কেটে গেছে। কাঁচি ধুতিটারও একই অবস্থা। শ্বশুরকে সে দেখিয়ে বলল, ‘বাবা এ দুটো তো ফেলে দিতে হবে। বাসনউলিও এগুলো নেবে না।’
‘তোমরা একটু নজরও রাখনি? বার করে যদি মাঝে মাঝে রোদে দিতে তাহলে এখনও পরার মতো থাকত। শুধু নিজেদের জামাকাপড়ের যত্ন নিলেই কি হয়ে গেল!’ তিক্ত তীক্ষ্ন স্বর ফিরে এল কাশীনাথের গলায়। ভারতী অপরাধীর মতো মুখ নামিয়ে রইল। তার হাত থেকে পাঞ্জাবি আর ধুতিটা নিয়ে কাশীনাথ মেঝেয় ফেলে দু—পা দিয়ে মাড়িয়ে রাগ চাপতে চাপতে বলল, ‘যাও ফেলে দিয়ে এসো, আমার শখ মিটে গেছে।’
এর মাস ছয়েক পর অনীশ যখন মাকে জানাল বলাকার বাবা—মা বিয়ের কথা পাকা করতে আসবে, ভারতী ছেলেকে বারান্দায় ডেকে নিয়ে বলে, ‘আমাদের তো কোনো দাবিদাওয়া নেই, শুধু একটা জিনিস চাইব, তোর দাদুর জন্য তসরের একটা পাঞ্জাবি আর কাঁচিপাড় একটা ধুতি।’
অনীশ শুনেই বলেছিল, ‘ওরা নিজের থেকেই মেয়েকে অনেক কিছু দেবে। সোফা, খাট, স্টিলের আলমারি, ফ্রিজ, ড্রেসিংটেবল, টি—ভিও। কিন্তু এসব রাখার জায়গা কোথায়? বলাকাকে বলেছি কিছু দেবার দরকার নেই। আমাদের যা আছে তাই দিয়েই তোমাকে থাকতে হবে। মা, এটা প্রেস্টিজের ব্যাপার। আমি যে রাতে দাদুর খাটের পাশে ফোল্ডিং খাটে শুই, এটা বলাকা জানে না। বলেছি দাদু মেঝেয় শোয় আমি খাটে শুই। ধুতি, পাঞ্জাবি চাইলে মান থাকবে না। ও দুটো আমিই দাদুকে কিনে দেব।’
কথা রেখেছিল অনীশ। দর্জি আনিয়ে কাশীনাথের মাপ নিয়ে তসরের পাঞ্জাবি বানিয়ে দেয়, কিনে আনে বাক্সেভরা ময়ূরপুচ্ছ ধুতি যার পাড় ছয় ইঞ্চি চওড়া। খুব খুশি হয়েছিল কাশীনাথ। কিন্তু সেগুলো পরে তার আর বড়ো রাস্তা পর্যন্ত হেঁটে যাওয়া হয়নি। তার আগেই সাইকেলের ধাক্কার জের সামলাতে গৃহবন্দি হয়ে পড়ে।
.
দশটা জিলিপি কাগজের ঠোঙায় নিয়ে পুলিন সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় নামছিল দোতলার উমা। সালোয়ার কামিজ পরা, বয়স পঁচিশ, দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ গড়ন, মুখে আলগা একটা লাবণ্য আছে, সাধারণ সায়ান্স গ্র্যাজুয়েট। ওকে শিশু বয়স থেকে দেখে আসছে পুলিন।
‘চললে কোথায়?’
‘কাজে।’
‘আজ ক—টা?’
‘তিনটে।’
‘কোথায় কোথায়?’
‘একটা শোভাবাজারে, একটা সল্টলেকে আর একটা ফুলবাগানে, দুটো অবাঙালি।’ ব্যস্তভাবে উমা নেমে গেল।
উমার কাজ মেয়েদের ফিজিয়োথেরাপি আর মালিশ করা। দিনে তিন—চারটি মহিলাকে মালিশ ও ফিজিয়োথেরাপি করে। বাড়ি গিয়ে একঘণ্টার মালিশে ষাট টাকা, ফিজিয়োথেরাপিতে একশো টাকা। দুটোই সে শিখেছে টাকা খরচ করে। তা ছাড়া সে যুক্ত একটি হেলথ ক্লাবের সঙ্গে। সেখান থেকেও মন্দ আয় হয় না। নানারকমের বাতের আর হাড়ের অসুখ যত বাড়ছে ততই উমার রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। এখন সে মাসে কমকরে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত রোজগার করে। বছর চারেক আগে উমা যখন কলেজছাত্রী, ভারতী তখন এক রাত্রে পাশাপাশি শুয়ে পুলিনকে বলেছিল, ‘উমাকে আমার খুব ভালো লাগে, তোমার কেমন লাগে?’
