‘বাহ, খুব সুন্দর খেতে তো, পেলে কোথা?’ চিবোনোর বদলে ভারতী চকোলেট চোষার মতো করে চুষতে লাগল।
‘বগলার পাশেই মিঠাই রাজা বলে একটা মিষ্টির দোকান হয়েছে বছর পাঁচেক। খুব সাজিয়ে ছিমছাম করে চালাচ্ছে, যেমন বিক্রি তেমনি মিষ্টিরও দাম, ওখানেই দেখলুম চন্দ্রপুলি,লোভ সামলাতে পারলুম না। অনেকদিন খাইনি। দাম বলল এক—একটা চার টাকা। ভাবো একবার, ছোটোবেলায় খেতুম এক আনায় একটা!’ পুলিন চোখ বড়ো করে তাকাল ভারতীর দিকে।
ভারতী বলল, ‘দিনকাল কীভাবে বদলে গেছে দেখেছ! তবে সেই চন্দ্রপুলির থেকে এটা কিন্তু খেতে অনেক ভালো, বেশি দাম দিয়েও খাওয়া যায়।’
‘সেইজন্যই দোকানটার এত বিক্রি, অবশ্য বগলারও বিক্রি আছে।’
এবার ভারতী গলা নামিয়ে বলল, ‘এই চন্দ্রপুলির গপ্পো যেন বাবার কাছে কোরো না, তাহলেই হুকুম হবে এখুনি চারটে নিয়ে আয়, তার মানে ষোলো টাকা।’
‘পাগল হয়েছ। বাবা জানেই না মিঠাইরাজা বলে একটা দোকান এখানে হয়েছে। জানিয়ে আর কাজ নেই।’
কাশীনাথ পাঁচ বছর আগেও হেঁটে পার্কে গিয়েছে, একদিন সাইকেলের ধাক্কা খেয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। দুটি ছেলে তাকে তিনতলায় তুলে দিয়ে বলে যায়, ‘দাদু একা আর রাস্তায় বেরোবেন না, গাড়ি চাপা যাবেন।’ এরপর কাশীনাথ শুধু মাসে একবার পেনশন তুলতে পুলিনকে সঙ্গে নিয়ে ব্যাঙ্কে যায়, গলি থেকে বেরিয়ে বাঁদিকে পঞ্চাশ গজ গেলেই ব্যাঙ্ক, মিঠাইরাজা দোকানটা ডানদিকে, তাই নতুন কোনো দোকান হল বা পুরোনো কোনো দোকান উঠে গেল তা জানে না।
বাবার আবদারের জিলিপি কিনতে পুলিন যখন বগলা মিষ্টান্নের সামনে তখন তার পিছন দিয়ে বলাকা হনহন করে হেঁটে গেল মেট্রো রেলের স্টেশনের দিকে, শ্বশুরকে দেখেও দেখল না। পুলিন কিন্তু দেখতে লাগল পিছন থেকে। বলাকা আগের থেকে একটু ভারী হয়ে গেলেও লম্বা বলে বেঢপ লগে না। বলাকার মা বিয়ের আগে মেয়ের যা বয়স বলেছিল সেই হিসাবমতো সে অনীশের থেকে এক বছরের ছোটো। ওর পাশে অনীশকে কম বয়সিই মনে হয়। পুলিন ভালো করে লক্ষ করল পুত্রবধূকে পিছন থেকে। মুখ বাদে শরীরের বাঁধুনি তাকিয়ে দেখার মতো এবং রাস্তার লোকেরা দেখছেও। মুখটা বাদে কারণ বলাকার চোয়াল কানের কাছ থেকে শুরু হয়ে ক্রমশ ঝুলে চিবুকটা গলার কণ্ঠার সামনে থেমেছে। ফলে গাল দুটি অস্বাভাবিক লম্বা, সেই অনুপাতে কান দুটিও। ঠোঁট দুটি ছোট্টে এবং রং মরচে ধরা লোহার মতো, চোখ দুটি বড়ো এবং গোলাকার। ওকে কদাচিৎ হাসে দেখেছে পুলিন। এক ধরনের শুকনো কাঠিন্য ছড়িয়ে থাকে মুখে, যেজন্য সে ছেলের বউকে যথাসম্ভব এড়িয়ে চলে।
.
বিয়ের আগে প্রথম যেদিন অনীশ বাবা—মায়ের সঙ্গে পরিচয় করাতে আনে, বলাকার আগে ছিল সন্দেশের বাক্স। অনীশ বলেছিল তার বান্ধবী ব্যাঙ্কে কাজ করে, এম এ পাশ, বাক্সটা ভারতীর হাতে দিয়ে বলাকা প্রণাম করে, পুলিনকেও। তাকে শ্বশুরের ঘরে না বসিয়ে ভারতী নিয়ে যায় নিজেদের ঘরে, যেটা এখন বলাকা আর অনীশের শোয়ার ঘর। পুলিন লক্ষ করেছিল মেয়েটি খুঁটিয়ে ঘরের আসবাবপত্র, জানালা, দেওয়াল, খাট, বিছানা, পাখা দেখছে কথাবার্তার ফাঁকে। পুলিন অস্বস্তিবোধ করে ওর সঙ্গে চোখ বোলাচ্ছিল জিনিসপত্রের উপর। বিছানার চাদরের সবুজ নকশা আর জানালার সবুজ পাল্লা রংচটা একই চেহারা নিয়েছে। পেতলের ফুলদানিটা মাটির মতো মনে হচ্ছে। পাপোষের রোম উঠে নারকেলদড়ি বেরিয়ে এসেছে, ইলেকট্রিক জয়েন্ট বক্সের কাঠের ঢাকনা নেই, তালগোল পাকানো তারে ঝুল জমে। একে একে সে ঘরের মধ্যে অনেক খুঁত আর অন্যমনস্ক অবহেলা খুঁজে পেয়ে সংকোচ বোধ করেছিল।
বগলা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের শোকেসের উপর কাঠের বারকোসে রাখা আঢাকা জিলিপিগুলো দেখে সে বিরক্ত স্বরে দোকানের লোকটিকে বলল, ‘ঢেকে রাখতে পার না? রাস্তার ধুলো পড়ছে।’
সেদিন বলাকাকে মেট্রোরেলে তুলে দিয়ে আসার জন্য অনীশ বেরিয়ে যেতেই সে ঠিক এইরকম গলায় ভারতীকে বলেছিল, ‘ফুলদানিটা মেজেঘষে চকচকে করে রাখতে পার না?’
দোকানি তার কথা গায়ে না মেখে বলল, ‘জিলিপি ভেজে আসে আর উড়ে যায়, ধুলো পড়ার টাইমই পায় না, ক—টা দোব?’
‘দশটা।’
সেদিন ভারতী রাত্রে ফুলদানিটা মেজে চকচকে করে বলেছিল, ‘কালই বাজার থেকে ফুলো এনো, রজনীগন্ধা।’
শালপাতায় মুড়ে ছ—টা রজনীগন্ধার ছড় পরদিনই বাজার থেকে পুলিন আনে। কাশীনাথ তখন সবে কলঘর থেকে বেরিয়েছে। চোখে পড়ল রজনীগন্ধার গোছাটা খাওয়ার টেবলে।
‘এটা কীরে?’ পুরু কাচের আড়াল থেকে তার চোখদুটো খোসা ছাড়ানো লিচুর মতো দেখাল।
পুলিন বলল, ‘ফুল, রজনীগন্ধা।’
‘ফুল কী হবে, আমাদের ঘরে তো ঠাকুর দেবতা নেই। আছে তো শুধু রামকৃষ্ণর ছবিটা তাও উঁচুতে টাঙানো, মালা হলে তবু দেওয়া যেত।’
‘পুজোর জন্য না হলে কি ফুল কিনতে নেই?’
‘কেন নেই! মড়ার খাটে বাঁধার জন্য ফুল লাগে। তুই ওগুলো বরং আমার খাটের চারকোণে বেঁধে দে, খাটে শুয়ে মনে হবে তোর কাঁধে চড়ে নিমতলায় যাচ্ছি।’
ভারতী আঁতকে উঠে বলে, ‘এ কি অলুক্ষুণে কথা বলছেন বাবা!’
কাশীনাথ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ‘অলুক্ষুণে কেন? আমি কি কোনোদিন মরব না? পুলিন কি খাটে কাঁধ দিয়ে নিয়ে যাবে না?’
পুলিন ক্ষুব্ধ স্বরে বলল, ‘ফুল কিনে আনাই দেখছি ভুল হয়েছে। এইসব কথা শুনতে হবে জানলে আনতুম না।’
