এই ফ্ল্যাটেই কাশীনাথ বিয়ে করে, ছাদে হোগলার ম্যারাপ বেঁধে লোক খাওয়ায়, এই ফ্ল্যাটেই পুলিন জন্মায়, তার ঠাকুরদা, ঠাকুমা আর মা এখানেই মারা যায়, এখন ফ্ল্যাট ভাড়া আটান্ন বছরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুশো টাকা। তেমনি কাশীনাথের পেনশনও বেড়েছে। আর বেড়েছে তার অধৈর্যতা, তিক্ত কথাবার্তা, চিৎকার, খুঁত ধরা, কর্তৃত্ব ফলানো, অভিমান আর ছেলেমানুষি কাজকর্ম।
একবার হঠাৎ কাশীনাথের ইচ্ছে হল পেঁয়াজি খাবে। ছেলেকে ইচ্ছাটা জানিয়ে বলে, ‘এখুনি কাত্তিকের দোকান থেকে আটটা নিয়ায়।’
‘আটটা!’ পুলিন অবাক হয়ে বলেছিল, ‘এই বয়সে আটটা!’
‘হ্যাঁ আটটা। তোর বয়সে বারোটা খেতুম। যা যা দৌড়ে যা।’
‘সাড়ে এগোরোটা বাজে, এখন সকালের ভাজা ঠান্ডা বাসি হয়ে গেছে, বিকেলে এনে দোব।’
‘ঠিক দিবি তো।’
পুলিন বিকেলে এনে দিয়েছিল। ঠোঙার মুখ ফাঁক করে কাশীনাথ একটা একটা করে গুনে দেখে, দাঁড়িয়ে থাকা ছাপ্পান্ন বছর বয়সি ছেলের হাতে একটা পেঁয়াজি তুলে দিয়ে বলেছিল, ‘যা।’ পঞ্চাশ বছর আগে সে এইভাবেই গুজিয়া তুলে দিত পুলিনের হাতে।
পুলিন ইতস্তত করতেই কাশীনাথ খেঁকিয়ে বলে ওঠে, ‘তেলেভাজা এখন বুঝি আর মুখে রোচে না বাবুর, তবে কি চপ কাটলেট ফিসফ্রাই চাই?’
পেঁয়াজিটা হাতে নিয়ে পুলিন ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।
আজ কাশীনাথের ইচ্ছে হয়েছে জিলিপি খাবার।
বাড়ি থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে বগলা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার। জন্ম থেকেই দোকানটা দেখে আসছে পুলিন। বগলার পাশে বছর পাঁচেক হল আর একটা মিষ্টির দোকান হয়েছে, ‘মিঠাইরাজা।’ নামটা পুলিনকে প্রথমে একটু অবাক করে। যত মিষ্টির দোকান সে এ পর্যন্ত দেখেছে তাতে ‘ভাণ্ডার’ বা ‘অ্যান্ড সন্স’ নামের শেষে জোড়া থাকে। দোকানটাও সাজানো গোছানো ফিটফাট। কাচের কাউন্টার, আলমারি, বসে খাওয়ার জন্য ছোটো ছোটো চারটে টেবল। সফট ড্রিংকস, আইসক্রিম, দই রাখার জন্য দুটো বিরাট রেফ্রিজারেটার, বনবন ঘুরছে পাখা, গোটা ছয়েক টিউব লাইটের আলো কাচে ধাক্কা দিয়ে জেল্লা বাড়িয়েছে। কাজের লোকগুলো পরিচ্ছন্ন জামাকাপড় পরা! স্টিলের ট্রে—তে রাখা বেশিরভাগ মিষ্টিই ছানার এবং রসছাড়া। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে মিষ্টিগুলো দেখতে দেখতে পুলিনের চোখ ঝকঝক করে উঠেছিল চন্দ্রপুলি দেখে।
ছোটোবেলায় বড়ো তিজেল হাঁড়ি মাথায় চন্দ্রপুলিওলাকে তিনতলার বারান্দা থেকে দেখলেই সে চিৎকার করে ডেকে দাঁড় করাত। মা—র কাছ থেকে দু—আনা পয়সা নিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নেমে আসত। নারকোল আর চিনির পাকে তৈরি দুটো চন্দ্রপুলি শালপাতার উপরে রেখে সে উঠে আসত ধীরে ধীরে। মা—র সামনে শালপাতাটা ধরে বলত, ‘তুমি একটা নাও।’ মা প্রথমে না না করে শেষে আধখানা ভেঙে মুখে দিত।
পুলিন অবশেষে দোকানে বসা লোকটিকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘চন্দ্রপুলির দাম কত?’
‘চার টাকা পিস।’
‘একটা চার টাকা!’ অবাক হয়ে পুলিন তাকিয়ে থেকেছিল তার ছোটোবেলার এক আনার চন্দ্রপুলির দিকে।
লোকটি লক্ষ করেছিল পুলিনের মুখের ভাব পরিবর্তন। পরামর্শ দেবার মতো গলায় বলল, ‘ক্ষীরের চন্দ্রপুলি, একটা খেয়ে দেখুন না।’
‘না থাক।’
পুলিন ফিরে এল বাড়ির কোলাপসিবল গেট পর্যন্ত। কয়েক সেকেন্ড ভেবে নিয়ে ফিরে গেল মিঠাই রাজায়। একটা ক্ষীরের চন্দ্রপুলি কিনল। দোকানের লোকটি হেসে বলল, ‘আগেকার চন্দ্রপুলির সঙ্গে এটার কতখানি তফাত বুঝতে পারবেন একটু মুখে দিলেই। যারাই খেয়েছে আবার কিনতে এসেছে। কলকাতা শহরে তিন—চারটে মাত্র দোকানে এমন চন্দ্রপুলি পাবেন।’
সাইজটা ছোটোবেলার চন্দ্রপুলির থেকে লম্বায় প্রায় এক ইঞ্চি বেশি। বাড়ির গেটের কাছে এসে পুলিন একটা কোনা ভেঙে মুখে দিয়ে জিভ আর টাকরায় মাখিয়ে তারিয়ে তারিয়ে যখন খাচ্ছে তখনই বাড়ি থেকে বেরোচ্ছিল চারতলার প্রণববাবু, কলেজে ফিজিক্স পড়ান। তাকে দেখেই পাতলা কাগজে মোড়া চন্দ্রপুলিটা সে পকেটে ঢুকিয়ে নিল।
‘পুলিনবাবু কাল আপনাকে খুব মিস করেছি।’ প্রণববাবু তড়বড় করে বলে যান, ‘ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড আর জুভেন্টাসের খেলা ছিল। ভাবলুম আপনাকে ডেকে আনি। ফুটবল ম্যাচ একা একা দেখে সুখ নেই। তারপর মনে হল রাত সাড়ে এগারোটায় কোনো ভদ্দরলোককে ডেকে এনে খেলা দেখা, যথেষ্ট পাগলামি হয়ে যাবে।’
‘ইসস আমাকে ডাকলেন না?’ পুলিন ক্ষুব্ধ গলায় বলেছিল। যদিও প্রণববাবু কথিত ক্লাব দুটোর নাম সে এই প্রথম শুনল।
‘অত রাতে আপনি আসতেন? মিসেস আপত্তি করতেন না?’
‘আমার মিসেস তেমন নয়।’ তারপর গলা নামিয়ে চোখ টিপে বলল, ‘দু—জনেই ফিফটি পেরিয়ে গেছি, রাতে একজন না থাকলে অন্যজন হাত—পা ছড়িয়ে আরামে শোবার একটা তো সুযোগ পাবে।’
একটা দারুণ ভালো রসিকতা করা হল ভেবে পুলিন একাই হেসে উঠেছিল। কুঁড়ে, মাটো, লোকজনের সঙ্গে কথা বলতে পারে না, এইসব বিশেষণই সে নিজের সম্পর্কে শুনে এসেছে কৈশোর থেকে এবং এখনও শুনতে হয় বিশেষ করে বাবার কাছ থেকে। কিন্তু সে যে কুঁড়ে নয়, বুদ্ধিহীন নয় এবং বাইরের লোকের কাছে সপ্রতিভ এটা বোঝতে সুযোগের জন্য সে ওঁত পেতে থাকে। তার মনে হল প্রণববাবুকে অন্তত বোঝাতে পেরেছে সে মাটো নয়, যথেষ্ট রসিক।
ক্ষীরের চন্দ্রপুলি পকেটে নিয়ে পুলিন তিনতলায় উঠে এসে ভারতীকে চোখের ইশারায় রান্নাঘরে ডেকে এনে চন্দ্রপুলিটা দেখায়। আধখানা ভেঙে নিজে মুখে পুরে বাকিটা ভারতীকে দিয়ে বলে, ‘খাও।’
