‘না না না, ঘণ্টা দুয়েক পরে ওগুলো চিমড়ে সুখতলা হয়ে যাবে, মুখে দিতে পারব না।’
‘পেঁপে দিলুম, পেট ঠান্ডা রাখবে। ডিমের খোসা ছাড়ালুম না।’
‘কুচুনের সন্দেশ এসেছে?’
‘দুটো এনেছে, তোমায় একটা দোব।’
‘না, ওকে বিকেলে একটা দেবেন, বাকিটা ফ্রিজে তুলে রাখুন। কাল ওকে টিফিনের সঙ্গে দেবেন।’
হাতঘড়ি দেখে বলাকা প্রায় লাফিয়ে উঠল। পাতে ভাত আর আধখাওয়া মাছ ফেলে রেখে বেসিনে গিয়ে হাত ধুতে ধুতে বলল, ‘মা আর দু—মিনিট নয়তো ন—টার শান্তিপুরটা পাব না। এটা মিস করলে সেই ন—টা কুড়ির কৃষ্ণনগর। তাহলে ব্যাঙ্কে পৌঁছতে পৌঁছতে, ট্রেন লেট করলে সাড়ে দশটা, আর ম্যানেজারের বিরক্ত মুখ দেখতে হবে।’
স্টিলের টিফিন বক্স বলাকার ব্যাগে ভরে দিয়ে ভারতী অপেক্ষা করল। দালানের অন্য প্রান্তে টাঙিয়ে দেওয়ালে রাখা রামকৃষ্ণ—সারদা—বিবেকানন্দ এবং তাদের পিছনে দাঁড়ানো কালীমাতার একটি বাঁধানো ছবি। বলাকা ছবিটির সামনে আধমিনিট চোখ বন্ধ করে জোড় হাতে দাঁড়াবে। তারপরই শাশুড়ির হাত থেকে এক হাত লম্বা ব্যাগটা প্রায় ছিনিয়ে নিয়েই কাঁধে টাঙাতে টাঙাতে জুতো পায়ে গলিয়ে বেরিয়ে যাবে।
ভারতী তিনতলার সিঁড়ি দিয়ে নামা তার বউমার পায়ের শব্দ দোতলা পর্যন্ত শোনে দরজা বন্ধ করতে এসে।
দালানের লাগোয়া দুটি শোবার ঘর, একটি কাশীনাথের অন্যটি অনীশের, পুলিন ও ভারতীর নিজস্ব কোনো ঘর নেই। দুটি ঘরের মধ্য দিয়ে যাওয়া যায় রাস্তার দিকে তিন হাত চওড়া আট হাত লম্বা বারান্দায়। ভারতী ছেলের ঘরের মধ্য দিয়ে বারান্দায় এল কাশীনাথের ঘর এড়িয়ে। ছেলেমানুষের মতো খাই—খাই বাতিক হয়েছে শ্বশুরের। যেহেতু রান্নাবান্নার দায়িত্বে সে তাই তার উপরই বুড়োর চোটপাট।
গতকালই কাশীনাথ তাকে বলে, ‘পুলিনটা অ্যাতো তেল দেয় কেন অনীশ আর বলাকাকে, ওরা হাজার হাজার টাকা রোজগার করে বলে? এ সংসারে খাবার লোক কি শুধু ওই দুজনই, আমি কি কেউ নই? আমার পেনশনের টাকা কি শুধু আমি একাই খাই, সংসারে দিই না? পুলিন তো শুধু বাজার খরচটা দেয়, তাও কেপ্পনের মতো বাজার করে, বলেছিলুম বড়ি দিয়ে তেঁতুলের অম্বল করতে, করেছিলে? বললে দোকানে বড়ি পাওয়া যায়নি। কলকাতা শহরে কি একটাই বড়ির দোকান? বাপের জন্য কি একটু দরদও নেই ছেলের? কত কষ্ট করে পয়সা খরচ করে বড়ো করলুম ছেলেকে, বুড়ো বয়সে সেই ছেলে আমাকে দেখবে শুনবে এটা তো আশা করবে যেকোনো বাপই, ঠিক কিনা?’
ভারতী মেঝের দিকে তাকিয়ে চুপ করে ছিল। অভিজ্ঞতা থেকে জানে জবাব দিলেই শ্বশুর চিৎকারে ফেটে পড়ে নোংরা কথা বলা শুরু করবে। ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেও বিপদ, চিৎকারটা তাড়া করবে।
আজকের দাবি বড়ির অম্বল নয় জিলিপি। কাশীনাথ পুরুলেন্সের চশমার ছয় ইঞ্চি সামনে কাগজটা ধরে খুঁটিয়ে খবরের কাগজ পড়ে। প্রতিদিনের বাজারদর থেকে সে ক—দিন আগে জেনেছিল ইলিশমাছ শ্যামবাজার, মানিকতলা বাজারে দেড়শো টাকা কিলোয় বিকিয়েছে। সেই রাতেই সকলকে শুনিয়ে গজগজ করল, ‘বাজারে ইলিশ উঠেছে অথচ একদিনও খেতে পেলুম না। কবে একশো টাকায় নামবে তার জন্য বসে থাকো আর তেলাপিয়া খেয়ে যাও।’
পুলিনের মনে পড়ল তখন তার বয়স বছর সাত, বাবা বাজার করে ফিরে থলিটা নামিয়ে বলল, ‘ইলিশ খাব কী, সাড়ে চার টাকা সের, ভাবতে পার?’
পুলিন বলে, ‘খবরের কাগজের দরে আর বাজারের দরে অনেক তফাত। কাল তোমাকে ইলিশ খাওয়াব, দেখি কত খেতে পার।’
ভারতী শুনেই আঁতকে উঠে বলেছিল, ‘কত খেতে পার মানে? এই বয়সে গুচ্ছের ইলিশ খেয়ে হজম করতে পারবেন? তারপর যে কাণ্ড হবে সে তো তোমাকেই পরিষ্কার করতে হবে।’
শুনেই কাশীনাথের চিৎকার, ‘হ্যাঁ পরিষ্কার করতে হবে। যত দিন আমি বাঁচব তত দিন পরিষ্কার করতে হবে, না পারলে এ সংসার থেকে দূর হয়ে যাও।’ এরপর বহুবার বলা কথাটা কাশীনাথ বলে, ‘এ ফ্ল্যাট আমার নামে ভাড়া নেওয়া বেয়াল্লিশ সাল থেকে। এখনও আমিই ভাড়া গুনি। ইলেকট্রিক বিল, ঝিয়ের মাইনে, গ্যাসের দাম দিচ্ছি পেনশনের টাকা থেকে। এটা মনে রাখিস।’
পুলিন মুখ বুজে মাথা নীচু করে শুধু শুনে যায়। কোথাও সরে গিয়ে যে মুখ লুকোবে তেমন একটা জায়গা এই ফ্ল্যাটে নেই।
কাশীনাথ এই ফ্ল্যাট ভাড়া নেয়, যখন জাপানি সেনা হু হু করে এগিয়ে আসছে ভারতের দিকে। রেঙ্গুন দখল করে ফেলেছে। হেঁটে জঙ্গল, পাহাড়, নদী পার হয়ে বহু বাঙালি পরিবার তখন কলকাতায় পৌঁছতে শুরু করেছে। যুদ্ধের প্রস্তুতি দেখছে কলকাতার মানুষ। এ আর পি, সিভিক গার্ড, ব্ল্যাক আউট দেখতে দেখতে আর ধ্বংসের গুজব শুনতে শুনতে মানুষের মনে আতঙ্ক ছড়াল এবার নির্ঘাৎ কলকাতাকে জমিতে মিশিয়ে দেবে জাপানি বোমা। দলে দলে পরিবার প্রাণভয়ে গ্রামের দিকে পালাতে শুরু করল কলকাতার নিজস্ব বা বাসাবাড়ি ছেড়ে। খালি বাড়ি বা ঘর বা ফ্ল্যাট তখন যথেচ্ছ পাওয়া যাচ্ছে। জলের দরে বাড়ি বিক্রি হচ্ছে, নামমাত্র ভাড়ায় ঘর পাওয়া যাচ্ছে। তখন কাশীনাথ বি অ্যান্ড এ রেলওয়েতে মালগাড়ির গার্ডের চাকরিতে। খবর পেল চারতলা ‘গুহ ভবন’ বাড়ির তিনতলায় দু—ঘরের একটা ফ্ল্যাট খালি রয়েছে। গুহ এস্টেটের ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করে সে ভাড়া নেয়। ওরা চেয়েছিল পঞ্চাশ টাকা মাসিক ভাড়া, কাশীনাথ বলেছিল চল্লিশ টাকা, এককথায় ম্যানেজার রাজি হয়ে যায়। পরে সে আফশোস করে, তিরিশ টাকা বললে হত!
