‘নবুর চিকিৎসার সব খরচ দাদা দেবে বলেছে।’ স্মৃতি দ্বিধা জড়িত স্বরে বলল। সে যেন জানেই প্রত্যাখ্যাতা হবে।
‘জুতো মেরে গোরু দান!’ পূর্ণেন্দুর মুখ বিকৃত হয়ে উঠল রাগে, ‘তোমার দাদার স্পর্ধা তো কম নয়!’
মায়া বললেন, ‘বিয়েটা যত তাড়াতাড়ি চুকে যায় ততই ভালো। লোকজন ডেকে নেমন্তন্ন করে নয়, এই ঘরে হবে। বিয়ের পরই বাচ্চচা হবে, শুনলে লোকে কী বলবে, আত্মীয়স্বজনের কাজে মুখ দেখাব কী করে। তুমি বাপু এখন থেকেই ঘরটর দ্যাখো।’
পূর্ণেন্দু বললেন, ‘তোমাদের ওদিকে তোমার দাদার তো খুব দাপট আছে তাকে বলোনা ঘর জোগাড় করে দিতে।’
স্মৃতি অস্ফুটে বলল, ‘তাই বলতে হবে।’
.
সেইদিনই বর্গাপুরে দোতলার বারান্দায় মুখোমুখি দুটো মোড়ায় বসে রবিন্দু আর অমিয় কথা বলছিল। রবিন্দুর ঘটনাটার পর অমিয় কলকাতায় ফেরার সিদ্ধান্ত বাতিল করে রয়ে যায়। মানসিক ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে রবিন্দুর বেশি সময় লাগেনি। শুধু শরীরের উপর ধকলটা তাকে দুর্বল করে রেখেছে।
‘অমিয় আমার ছুটি কিন্তু অনন্ত কালের জন্য নয়। কাল দুপুরেই ফিরব।’
‘আর দুটো দিন থেকে যা।’
‘পরে এসে থেকে যাব। তোর মনে আছে কী, আমাদের বাড়িতে বসে আমাকে বলেছিলি যদি বিয়ে করিস তাহলে নবুর থাকার ব্যবস্থা আমি করে দেব গড়িয়ার নতুন বাড়িতে। নবুকে একটা ঘরে থাকতে দিবি বলেছিলিস। মনে আছে?’
‘আছে।’
‘অফারটা কী এখনও খোলা আছে?’
‘আছে।’
‘যদি থাকার লোকটা বদলে যায় তোর আপত্তি হবে?’
‘সেই বদলি থাকার লোকটা কে, না জেনে কথা দিতে পারব না।’
‘ধর আমি।’
‘হঠাৎ তোর থাকার ঘরের দরকার হল কেন?’
‘আমি বিয়ে করলে নবু থাকবে কোথায়? আমাদের ফ্ল্যাটটা তো দেখেছিস।’
শুনেই অমিয় দমে গেল। রবিন্দুকে বর্গাপুরে আনা তা হলে একেবারেই ব্যর্থ হয়ে গেল। সে শুকনো গলা বলল, ‘বিয়ে কী ঠিক হয়ে গেছে?’
‘আমি হ্যাঁ বললেই হয়ে যাবে।’
‘কবে হ্যাঁ বলবি?’ অমিয় নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বলল।
‘আজই।’
অমিয় হতভম্ভ হয়ে বোকার মতো তাকিয়ে রইল রবিন্দুর মুখের দিকে। ‘আজই! আজ কলকাতা যাবার ট্রেন ধরতে হল তোকে এখনই বেরতে হবে।’ অমিয়র মুখ ব্যাজার হয়ে উঠল।
‘কলকাতায় যাবার দরকার নেই, বর্গাপুরেই বলা যায়।’ রবিন্দু হাই তোলার চেষ্টা করল নির্লিপ্তি দেখাতে।
‘বর্গাপুরে কোন বাড়িতে?’ অমিয় ঝুঁকে পড়ল ভ্রূ কুঁচকে ‘এখানকার সব বাড়িই আমি চিনি। কিন্তু তোর বিয়ে করার মতো মেয়ে তো—’অমিয় কথা শেষ করল না।
‘এই বাড়িটা অমিয় বর্গাপুরের মধ্যেই পড়ে। কাকে হ্যাঁ বলতে হবে, তোকে না দিদিকে? বড়ো করে তো মেয়ে দেখাতে এনেছিস, আমি কিছু জানি না ভেবেছিস? ওরে ব্যাটা একসের চালে চোদ্দোগুণ খই হয়, ঠাকুরের কথা! চাল আমি পেয়ে গেছি। খই মুড়কি চিবোবার মতো আহাম্মক আমি নই। এবার বল তোর গড়িয়ার ঘরটা কী পেতে পারি?’
অমিয়র এবারের হতভম্ব ভাবটা নিমেষে উধাও হল। দু—হাতে রবিন্দুর দুটো কাঁধ ধরে প্রচণ্ডভাবে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল, ‘একটা কিরে দুটো তিনটে ঘর পেতে পারিস। হ্যাঁ—টা আমাকে নয় দিদিকে বলবি, চল।’
দু—হাতে চায়ের দুটো কাপ নিয়ে মোনা সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসছিল। অমিয় লাফাতে লাফাতে চিৎকার করে তার পাশ দিয়ে নেমে গেল।
‘দিদি দিদি, ফাস্ট ক্লাস ফাস্ট পেয়ে ফাইনালে পাশ করেছে…পাঁজি, পাঁজি বার করো।’
একটা কাপ রবিন্দুর হাতে দিয়ে মোনা অবাক স্বরে বলল, ‘বড়োমামা হঠাৎ পাঁজি পাঁজি বলে বাড়ি মাথায় করে তুলল কেন! মাথা তো একটু আগেও ঠিক ছিল, বলল চা খাবো!’
চায়ে চুমুক দিয়ে রবিন্দু বলল, ‘মাথা ওর ঠিকই আছে বরং আমারটাই গোলমেলে হয়ে গেছে। হবে না? যে ভাবে চুলের মুঠি ধরে হ্যাঁচকা টান মেরেছ এখনও ব্যথা করছে।’
অপ্রতিভ স্বরে মোনা বলল, ‘তা না হলে আপনাকে তো তুলতে পারতুম না।’
‘তুলেই তো আমার মাথাটা খারাপ করে দিলে। ওটা এবার থেকে তোমাকে ঠিকঠাক করে রাখার দায়িত্ব নিতে হবে—আত্মজীবনের জন্য, রাজি?’
রবিন্দুর কথাগুলো হৃদয়ঙ্গম করতে মোনার দশ সেকেন্ড সময় লাগল এবং তারপরই হাত থেকে চায়ের কাপটা মেঝেয় পড়ে ভেঙে ছড়িয়ে গেল।
বুড়ো লোকটি
‘হারামজাদা। নিজের জন্য পান কিনতে তো ভুল হয় না, আমি কিছু আনতে বললেই মনে থাকে না!’ কাশীনাথের শীর্ণ অষ্টআশি বছরের কাঠামোটা চিৎকারের দমকে দুমড়ে ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা হল।
পুলিন দ্রুত এগিয়ে এসে বাবার দুটো কাঁধ ধরে খাটে বসাল। ‘এনে দিচ্ছি বাবা জিলিপি এনে দিচ্ছি, তুমি চুপ করে বোসো তো।’ অপ্রতিভ তিক্ত স্বরে কাশীনাথকে শান্ত করিয়ে পুলিন ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দালানে টেবলে ভাত খেতে ব্যস্ত বলাকাকে বলল, ‘বউমা ড্রুকের জেলি পেলুম না, কিষানেরটা এনেছি।’ কথাটা বলে সে বলাকার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল অনুমোদনের আশায়। বলাকা মাছের ঝোল মাখা ভাত চিবোতে চিবোতে একটা কাঁটা দাঁতে ধরে ফেলেছে। সেটা মুখ থেকে টেনে বার করতে করতে বলল, ‘বাবা ছোটো মাছ আনবেন না, কাঁটা বেছে খেতে দেরি হয়ে যায়। আজ তো এমনিতেই দেরি হয়ে গেছে, তার ওপর বাজারও এল দেরি করে।’
পুত্রবধূর বিরক্ত মুখে বলা—কথা এবং বাবার ‘হারামজাদা’, দুটো ধাক্কা পরপর পেয়ে পুলিন পায়ে চটি গলিয়ে বেরিয়ে পড়ল ফ্ল্যাট থেকে। রান্নাঘরে তখন পাউরুটিতে জেলি মাখাতে মাখাতে ভারতী একটু গলা তুলে বলল, ‘বউমা পাউরুটি সেঁকে খেলে অম্বল হবে না, দোব সেঁকে?’
