হাউজিংয়ে দরোয়ান ছুটে গেল খবর দিতে। বোমার শব্দে পূর্ণেন্দু বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে ছিলেন। দরোয়ান বাইরে থেকে চেঁচিয়ে বলল, ‘শিগগির আসুন, আপনার ছোটো ছেলেকে বোমা মেরেছে, গেটের কাছে পড়ে আছেন।’ শুনেই পূর্ণেন্দু অস্ফুটে বলে উঠলেন, ‘বাজে হুমকি দেয়নি।’
রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মোটরগুলির একটির অবাঙালি মালিক তার ড্রাইভারকে তাড়া দিয়ে যখন বলছিলেন, ‘উঠাকে জলদি হসপিটালমে লে যাও।’ তখনই পূর্ণেন্দু ও মায়া ফটকে পৌঁছলেন। সেই গাড়িতে নবেন্দুর সঙ্গে তারা দুজনে উঠলেন। নবেন্দুর আঘাত বড়ো রকমেরই কিন্তু সে জ্ঞান হারায়নি।
‘সত্যি সত্যিই তোকে মারার চেষ্টা করেছে।’ গাড়িতে পূর্ণেন্দু ফিসফিস করে বললেন।
মায়ের কাঁধে মাথা রেখে বসা নবেন্দু বলল, ‘মারার চেষ্টা সত্যি সত্যি করলে এখনও বেঁচে থাকতুম না। এটা ওয়ার্নিং দিল।’
গাড়ি যখন আর জি কর মেডিক্যাল হসপিটালে ঢুকছে। পূর্ণেন্দু তখন বললেন, ‘তা হলে বিয়েটা করেই ফেল। আমাকে ঠিকানাটা দিস গিয়ে কথা বলে আসব।’
পূর্ণেন্দুকে আর স্মৃতিদের বাড়িতে গিয়ে কথা বলতে হল না, পরদিনই দুপুর বারোটা নাগাদ স্মৃতিই এসে হাজির হল আনন্দ নিকেতনে। চোখমুখ শুকনো। কোনো প্রসাধনের চিহ্ন নেই মুখে, চাহনি এলোমেলো। পূর্ণেন্দু তাকে বসালেন খাওয়ার টেবলে। স্মৃতিকে দেখেই তিনি মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিলেন কোনোমতে নিজেকে সংযত রেখে বললেন, ‘তোমার দাদা একটা পলিটিক্যাল মাফিয়া জানি তাই বলে এটা কী করলেন? নবুকে শিক্ষা দিতে গিয়ে তো নিজের বোনের সর্বনাশ করলেন।’
‘সর্বনাশ!’ স্মৃতি প্রায় চমকে উঠল। ‘কী সর্বনাশ হয়েছে নবুর, এমন কেমন আছে? বিশ্বাস করুন আমি আজই সকালে শুনলাম ঘটনাটা। আমি বুঝতে পারিনি দাদা এমন একটা ব্যাপার ঘটাবে। দাদাও বোঝেনি সমরেশদা এতদূর পর্যন্ত যাবে। দাদা ওকে বলেছিল শুধু একটু কোড়কে দিতে, বোমা মারতে বলেনি। নবু এখন কোথায়, কেমন আছে?’
পূর্ণেন্দু তীক্ষ্নদৃষ্টিতে তাকালেন স্মৃতির মুখের দিকে। মেয়েটির মুখে চোখে সত্যিকারের উদবেগ ব্যাকুলতা আতঙ্ক দেখতে পেলেন।
‘ইনজুরি কী খুব মারাত্মক?’ স্মৃতি গলা নামিয়ে বলল।
‘হ্যাঁ।’ পূর্ণেন্দু গম্ভীর হয়ে জানালেন। ‘অপারেশন হয়েছে, গোড়ালির হাড় তিনটুকরো হয়ে গেছে, ওর ফুটবল কেরিয়ার শেষ। এ তুমি কী করলে? নিজের পায়ে তো নিজেই কুড়ুল মারলে।’
মায়া এসে বসলেন টেবলে স্মৃতির বিপরীতে। মুখ নীচু করে নিল স্মৃতি।
পূর্ণেন্দু বলে চললেন, ‘নবুকে এবার পরের দয়ার ওপর জীবন কাটাতে হবে, আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেল। কোথায় কাজ পাবে, কে ওকে কাজ দেবে! লেখাপড়া তো মাধ্যমিক। লাখ লাখ মাধ্যমিক সক্ষম বেকার ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমন ছেলেকে কী বিয়ে করবে? এখনও কী তুমি সেদিনের মতো বলবে, বিয়ে করতে চাই চাই চাই।’ পূর্ণেন্দুর স্বরে প্রচ্ছন্ন ব্যঙ্গ।
স্মৃতির চোয়ালের পেশি শক্ত হয়ে উঠল। মুখ নামিয়ে রেখেই সে বলল, ‘হ্যাঁ এখনও চাই, আরও বেশি করে চাই।’
পূর্ণেন্দু ও মায়া চোখাচোখি করলেন বিস্মিত হয়ে, দুজনের কেউই আশা করেননি এমন উত্তর শোনার জন্য।
‘বিয়ে করে আমার এখানে থাকার জায়গা হবে না। দুটো মাত্র শোবার ঘর আরও একটা ছেলে আছে তারও বিয়ে দিতে হবে।’ গলাটা কর্কশ করে মায়া বললেন।
‘যতদিন না দাদার বিয়ে দিচ্ছেন ততদিন থাকতে দিন তারপর নয় কোথাও চলে যাব।’ ধীরগলায় স্মৃতি বলল।
‘তা নয় যাবে কিন্তু চলবে কী করে, সংসার চালাতে তো রোজগার চাই।’ মায়া বাস্তব দিকটার দিকে আঙুল দেখালেন।
‘কিছু একটা ব্যবস্থা নিশ্চয় হয়ে যাবে, দাদার সঙ্গে কথা বলি আগে। দোষ আমারও যেমন তেমনি দাদারও। কিছু একটা ব্যবস্থা করে দেবে।’ স্মৃতির স্বরে প্রত্যয় নেই কিন্তু হতাশাও নেই। ‘কিছু না হলে আমিই রোজগারের চেষ্টা করব। হিস্ট্রি অনার্স গ্র্যাজুয়েট আমি। নবুর তো একটা পা অক্ষত আছে, তাই দিয়ে যতটা চলাফেরা করা যায় তাই করে রোজগারের চেষ্টা করবে। দোষ তো ওরও খানিকটা আছে।’
‘খানিকটা নয় পুরোটা।’ পূর্ণেন্দু স্বরে আর আগের কাঠিন্য নেই। স্মৃতির আন্তরিকতাপূর্ণ কথা আর অসহায় অবস্থাটা অনুভব করে তার মধ্যে সহানুভূতির প্রলেপ পড়ছে। ‘সব কিছুর মূলে তো সেই। ফুটবল খেলে লাখ লাখ টাকা কামাবার স্বপ্ন দেখতে দেখতে মনের ব্যালান্স হারিয়ে নিজের আর সেই সঙ্গে একটা মেয়ের সর্বনাশ করে বসল।’
‘তুমি শুধু নবুরই দোষ দেখছ, আর একজন কী কচি খুকি?’ মায়া ধারালো গলায় কথাটা বলে স্মৃতির দিকে আগুন ঝরান চোখে তাকিয়ে রইলেন। মাথা নিচু করে স্মৃতি বসে রইল। অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
‘কাল পুলিশ এসেছিল ইনভেস্টিগেট করতে।’ পূর্ণেন্দু নীরবতা ভাঙলেন। মুখ তুলে স্মৃতি জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল। ‘কাউকে সন্দেহ করছি কিনা জানতে চায়। আমি কারুর নাম করিনি, বলেছি দমদমে খেলতে গিয়ে মারপিট করেছিল বোধহয় সেখানকারই কেউ শোধ নিতে একাজ করতে পারে। আমি কোনো কমপ্লেন করতে চাইনি ওরা তাইতে হাঁফ ছেড়ে খুশি হয়েই চলে গেল। কেলেঙ্কারি বাড়িয়ে লাভ কী।’
‘নবু কোন হাসপাতালে আছে?’
‘আর জি কর—এ।’
‘কবে বাড়ি আসবে?’
‘আরও দিন দুয়েক তো থাকবে।’ পূর্ণেন্দু আন্দাজে বললেন।
