রবিন্দু চোখ বুঁজে ডাক্তারের কথা শুনছিল। ওর শেষ কথাটিতে সে চোখ মেলে ঘরের এধার ওধার তাকিয়ে মোনাকে খুঁজে পেল না। মাথার খুলিতে চুলের গোড়ায় ব্যথা করছে। শক্ত মুঠিতে চুল ধরে হ্যাঁচকা দিয়ে তাকে টেনে তুলেছে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখের ভিতর থেকে…বাঁ হাতটা গলায় জড়িয়ে বুকের কাছে তাকে চেপে ধরে ডান হাত তুলে ভাইকে চেঁচিয়ে কী যেন বলল…কী যেন বলল…তখন আর শোনার মতো জ্ঞান তার ছিল না।…ডাক্তার বলল ভাগ্য ভালো…কার ভাগ্য, এদের না আমার? রবিন্দু আবার চোখ বুঁজল, তার ঘুম পাচ্ছে, ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। এখন আর সে কিছুই ভাবতে চায় না।
চারঘণ্টা টানা ঘুমোবার পর রবিন্দুর ঘুম ভাঙল। চোখ খুলে দেখল অমিয় খাটে তার পাশে বসে মুখের দিকে তাকিয়ে। দিদি, সোনা আর মোনা দাঁড়িয়ে, ওদের চোখেমুখে উদবেগ। তাকে চোখ খুলতে দেখে অরুণা দু—হাত কপালে ঠেকিয়ে বিড়বিড় করলেন: ‘মুখ রেখেছ ঠাকুর।’
অমিয় বলল, ‘এখন কেমন বোধ করছিস।’
‘আমার কিছু হয়নি।’ বলে রবিন্দু উঠে বসতে গেল। অমিয় কাঁধে হাত দিয়ে ঠেলে ওকে শুইয়ে দিল।
‘হয়নি বলছিস কী, যে কাণ্ড বাধিয়ে ছিলিস, প্রাণে যে বেঁচেছিস সেটা তোর সাতজন্মের পুণ্যের ফল।’
রবিন্দু ম্লান হাসল। তাকাল মোনার দিকে। মুখ নামিয়ে সে দাঁড়িয়ে রবিন্দু গভীর গাঢ় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ওর মুখের দিকে। মোনা একবার চোখ তুলেই নামিয়ে নিল। রবিন্দুর মনে হল মোনা যেন সতেরো—আঠারো বছরের কিশোরী নয় আজকেই ওর বয়স সাত—আট বছর বেড়ে গেছে।
‘তোকে নিয়ে আসাই আমার ভুল হয়ে গেছে।’ অমিয় ক্ষুব্ধ স্বরে বলল। ‘এমন একটা কাণ্ড বাধাবি জানলে আসতে বলতুম না।’
রবিন্দু হাসবার চেষ্টা করে বলল, ‘কাণ্ডটা না বাধালে আমিও নিজের সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতে পারতুম না। বকাঝকা পরে করবি অমিয়, এখন একটু চা খাওয়া। খুব খিদে পাচ্ছে, দিদি মুড়িটুড়ি আছে?’
‘ডাক্তারবাবু তো শক্ত জিনিস খেতে বারণ করেছেন, তুমি বরং দুধ খাও।’ অরুণা বললেন, ‘মোনা এক গ্লাস দুধ গরম করে আন।’
সোনা বলল, ‘ডাক্তারবাবু বলেছিলেন রবুমামা কেমন থাকেন সেটা ওকে জানিয়ে আসতে।’
‘কী আবার জানানোর আছে, আমি দিব্যি ফিট।’ গায়ের উপর রাখা পাতলা সুতির চাদরটা সরিয়ে রবিন্দু উঠে বসল। ‘একটা রিকোয়েস্ট তোকে, আমার এই কীর্তির কথাটা ঘুণাক্ষরেও যেন আমাদের বাড়িতে না পৌঁছয়।’
‘পৌঁছলে তো আমারই সর্বনাশ। মাসিমা আমার ওপর এমনিতেই চটা তার ওপর আমাদের বাড়িতে এসে তুই ডুবে মরতে বসেছিলি শুনলে জীবনে আর আমার মুখদর্শন করবেন না। লাভের মধ্যে হল কাল আমার কলকাতায় ফিরে যাওয়াটা আর হল না।
‘কেন?’
‘তোকে এখন ফেলে রেখে কী যাওয়া সম্ভব?’
‘খুব সম্ভব। তোর সঙ্গে আমিও যাব।’ রবিন্দু খাট থেকে নেমে মেঝেয় দাঁড়িয়েই টলে গেল। অমিয় তাকে ধরে খাটে শুইয়ে দিয়ে বলল, ‘থাক আর বাহাদুরি দেখাতে হবে না। কলকাতায় গিয়েই গোলদিঘিতে একটা ক্লাবে ভরতি হয়ে সাঁতারটা শিখে নিবি।’
দুধের গ্লাস হাতে মোনা এল। রবিন্দু উঠে বসে গ্লাসটা নিয়ে চুমুক দিতে দিতে লক্ষ করল মোনা ইসারায় সোনাকে ডেকে নিয়ে ঘরের বাইরে গেল। দুধ শেষ করে সে আবার শুয়ে চাদরটা বুক পর্যন্ত টেনে দিল।
‘যাই একবার ডাক্তারের কাছ থেকে ঘুরে আসি।’ অমিয় ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। সোনা ফিরে এল ডানহাতটা পিছন দিকে রেখে। মায়ের দিকে সে সন্তর্পণে তাকিয়ে খাটে বসে রবিন্দুর গায়ে ঢাকা চাদরের মধ্যে ডান হাতটা ঢুকিয়ে দিল। রবিন্দুর হাতের তালু খুঁজে নিয়ে সে একমুঠো নারকোল নাড়ু তালুতে গুঁজে রাখল। রবিন্দু জিজ্ঞাসু কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাতেই সে দরজার দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, ‘দিদি দিল।’
.
দুর্গাপুরে রবিন্দু যখন চাদর মুড়ি দিয়ে একটা একটা করে ছ—টা নারকোল নাড়ু খেয়ে শেষ করছে তখন কলকাতায় আনন্দ নিকেতনের ফটকে একটা ট্যাক্সি এসে থামল। ট্যাক্সি থেকে নামল নবেন্দু। পায়ে এক্স—রে করে ফিরছে। সকালে প্র্যাকটিস ম্যাচে পিছন থেকে করা একটা ট্যাকলিংয়ে তার চোটের জায়গাটায় আবার লাগে। মাঠ থেকে সে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে আসে। বিকেলে পার্ক স্ট্রিটে ক্লাবের ডাক্তারের চেম্বারে যায়। সেখান থেকে এক্স—রে ক্লিনিকে তারপর বাড়িতে।
ফটক থেকে পঞ্চাশ মিটার দূরে দুটো মোটরবাইকে চারজন লোক বসে। রাস্তায় আলো কম, পথচারী পাঁচ—ছ জন মাত্র। রাস্তার ধারে তিন—চারটি মোটর দাঁড়িয়ে। ফটকের সামনেটা নির্জন। নবেন্দু ট্যাক্সি থেকে নেমে মিটার দেখছে। তখন মোটরবাইক স্টার্ট করার শব্দে সে একবার মুখ ঘুরিয়ে তাকাল।
‘কত হয়েছে?’
‘বারো টাকা সত্তর পয়সা।’
নবেন্দু তেরোটা টাকা দিয়ে ‘ঠিক আছে’ বলে বাঁ পা আলতো করে ফেলে ফটকের দিকে এগোল। ট্যাক্সিওয়ালা মিটার ঘুরিয়ে নিয়ে স্টার্ট দিয়ে গাড়ি ছেড়ে দিল আর তখনই মোটরবাইক দুটো এগিয়ে আসতে লাগল। নবেন্দু যখন লোহার ফটকে তখন বাইক দুটো তার কাছে এসে পড়েছে। দুটো বাইকে পিছনে বসা দুজন পরপর দুটো বোমা ছুড়ল নবেন্দুর দিকে। বিকট শব্দে ফেটে ধোঁয়ায় ভরে গেল এলাকাটা। এঞ্জিনের গর্জনতুলে বাইক দুটো মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
হই হই করে দু—পাশের বাড়ির লোক বেরিয়ে এল। আনন্দ নিকেতন থেকে বেরোল জনা তিনেক। ফটকের কাছে পড়ে রয়েছে নবেন্দু। তার দুই পা থেকে ঝরঝর করে রক্ত বেরোচ্ছে, গালে কপালে গর্ত হয়ে রক্ত পড়ছে। একটা বোমা পড়েছে তার পায়ের কাছে অন্যটা ফটকের লোহার রেলিং—এ।
