এক হাতে রবিন্দুকে জড়িয়ে ধরে অন্য হাত তুলে মোনা ভাইকে চেঁচিয়ে বলল, ‘শাড়িটা ছোড়।’
সোনা একটা প্রান্ত ধরে রেখে শাড়িটা ছূড়ল মোনা এক হাতে ধরল। ‘টান এবার।’
সোনা শাড়ি টেনে আনল পাড়ে সেই সঙ্গে মোনা রবিন্দুকে। পাড়টা উঁচু ও খাড়াই। দু বগলের নীচে হাত রেখে উঁচু করে তুলে ধরার চেষ্টা করেও রবিন্দুকে তুলতে পারল না মোনা।
‘সোনা ছুটে বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাস কি না দেখ। আমি ধরে দাঁড়িয়ে আছি।’
সোনা ছুটল এবং আধ মিনিটের মধ্যে হস্তদস্ত হয়ে ছুটে এল বাসু। সে টেনে তুলল রবিন্দুকে। উপুড় করে শুইয়ে কোমরের কাছে বাসু দু—হাতে ধীরে ধীরে চাপ দিতেই রবিন্দুর মুখ থেকে জল বেরিয়ে আসতে লাগল। মোনা জল থেকে উঠে পা ছড়িয়ে বসে হাঁফাচ্ছে। উপুড় হয়ে পড়ে থাকা রবিন্দুর দিকে সে তাকাল। তার চোখে কোনো ভাব নেই, কোনো আগ্রহ নেই। ঘটতে যাওয়া একটা বিশাল বিপর্যয় রোধ করার সাফল্যে সে আন্দোলিত হচ্ছে না। তার চাহনির শূন্যতা জানিয়ে দিচ্ছে মস্তিষ্ক অসাড় অবস্থায় রয়েছে। শাড়িটা তার গায়ের উপর রেখে সোনা বলল, ‘পরে নে।’ মোনা ফ্যাল ফ্যাল করে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
কী যেন একটা হইচই হচ্ছে পুকুরঘাটের দিকে, অরুণা উৎকর্ণ হলেন। একতলায় নিজের ঘরের খাটে কোলে পাশবালিস নিয়ে সামনে ঝুঁকে বসে ছিলেন। সকাল থেকে আক্ষেপ করে যাচ্ছেন, এতদিন পর রবু এল দিদির হাতের রান্না খাওয়ার জন্য আর হাঁপের টানটা কিনা এই সময়ই বাড়ল। দু—চারটে রান্না যে রাঁধবেন তারও জোর শরীরে নেই। রেঁধে না দিতে পারার থেকেও তার দুশ্চিন্তা মোনাকে কী পছন্দ হবে রবুর? অমিয় চিঠিতে জানিয়ে ছিল মোনা সারাদিন যেভাবে থাকে ঠিক সেইভাবেই যেন রবুর সামনে থাকে, বাড়তি কোনোরকম সাজগোজ বা অতিরিক্ত সভ্য ভব্য হবার চেষ্টা যেন না করে। সাজগোজ যে করেনি সেটা তো ঘরে বসে দেখতে পাচ্ছেন কিন্তু ঘরের বাইরে মোনা কী বলছে বা করছে সেটা তো দেখতে পাচ্ছেন না। এই নিয়েই তার আশঙ্কা। বারবার তিনি রাধাগোবিন্দকে স্মরণ করে মিনতি জানিয়েছেন ‘ওর দস্যিপনাটা এই কটা দিনের জন্য থামিয়ে রেখো, রবু যেন ওকে পছন্দ করে।’
হঠাৎ তার কানে এল সোনার ব্যস্ত উত্তেজিত গলা, ‘আমি যাচ্ছি ডাক্তারবাবুকে ডাকতে।’
অরুণা সোজা হয়ে বসলেন। কী ব্যাপার, সোনা কেন ডাক্তার ডাকতে যাচ্ছে? দালানে সাইকেল বারকরার শব্দ পেলেন। গ্রামের ডাক্তারবাবুর চেম্বার আধমাইল দূরে হাটতলায়। সোনা—মোনা দুজনেই সাইকেল চালাতে জানে। মোনা কোথায়? কিছু করে বসেনি তো? খাট থেকে নেমে ঘর থেকে বেরোতেই তিনি দেখলেন বাসু পাঁজাকোলা করে রবিন্দুকে এনে বাইরের রকে শুইয়ে দিল। রবিন্দু অজ্ঞানের মতো নেতিয়ে রয়েছে। সারা শরীর ভিজে সপসপে।
‘কী হয়েছে ওর বাসু?’ অরুণা চিৎকার করে বুকে হাত দিয়ে বসে পড়লেন। থরথর করে কাঁপছেন, একি দৃশ্য। তিনি দেখছেন! রবু কী মারা গেছে? কী হয়েছে ওর?
বাসু বলল, ‘পুকুরে ডুবে গেছলেন। মোনাদিদি ঝাপ্পে পড়ে টেনে তুলল। দিদি না তুললি অ্যাতোক্ষণে—’ চোখদুটো উলটে বাসু আকাশের দিকে তুলল। আর্তনাদ করে উঠলেন অরুণা।
বাসু বলল, ‘এখন আর ভয়ের কিছু নেই। যে জল খেয়েছিল সব বার করি দিচি। এখন শুকনো জামাকাপড় পইরে শুইয়ে দিন।’
‘বাসু ওকে আমার ঘরে তুলে নিয়ে গিয়ে খাটে শুইয়ে দে। কাতুর মা দৌড়ে ওপরের ঘরের থেকে মামাবাবুর ধুতি জামা এনে দে।’ অরুণা ব্যস্ত হয়ে বললেন। জলে ডোবা মানুষের চিকিৎসা কী তিনি জানেন না। কখনো কাউতে জলে ডুবতে দেখেননি। উদবেগে আশঙ্কায় তিনি ভুলে গেছেন মোনার কথা। বারবার তিনি বলে যেতে লাগলেন, ‘কী সর্বনাশ ঘটে যাচ্ছিল! দু—দিনের জন্য বেড়াতে এসে একি বিপদের মধ্যে আমাদের ফেলে দিল। ওর বাবা—মার কাছে মুখ দেখাতুম কী করে। বাড়িতে একটা লোকও নেই, অমিয় কখন ফিরবে তার ঠিক নেই। মোনা গেল কোথায়? অ বাসু, দেখোতো মেয়েটা কোথায়?’
‘মোনা দিদি তো পুকুর পাড়ে বসে।’
বাসুর কথা শেষ হতে—না—হতেই মোনা এসে হাজির। পরনে ভিজে শাড়ি, ভিজে চুল দড়ির মতো পাকিয়ে রয়েছে। দু—চোখে ভয়।
‘বাসুদা, আছে কেমন?’
‘মনে তো হচ্ছে দুর্ভোগ কেটে গেছে। নাও পায়ের দিকটা ধরো, ঘরে নেই যাই।’
বাসু আর মোনা, রবিন্দুকে ধরে অরুণার ঘরে এনে মেঝেয় শুইয়ে রাখল। রবিন্দু চোখ খুলে তাকাল। তার গায়ের গেঞ্জিটা ধরে উপরের দিকে টেনে মোনা বলল, ‘হাত দুটো তুলুন, পারবেন তুলতে?’
জবাব না দিয়ে রবিন্দু উঠে বসতে গেল। পারল না। অসহায়ভাবে মোনার মুখের দিকে তাকিয়ে দু—হাত তুলল আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে। মোনা গেঞ্জিটা মাথা দিয়ে গলিয়ে খুলে নিল। দোতলার বারান্দায় অমিয়র লুঙ্গি ও শার্ট শুকোচ্ছিল দড়িতে। কাতুর মা দৌড়ে দোতলায় উঠে চোখের সামনে তাই দেখে তুলে এনেছে। শার্টটা পরিয়ে দিল মোনা। পাজামার কোমরের দড়িটা খুলে দিয়ে মোনা বলল, ‘লুঙ্গিটা নিজে পরতে পারবেন?’
ঘাড়নেড়ে রবিন্দু বলল, ‘পারব।’
ঘর থেকে সবাই বেরিয়ে যেতে রবিন্দু উঠে বসে পাজামা ছেড়ে লুঙ্গি পরে নিল।
একটু পরেই সোনা ডাক্তারকে সাইকেল রিকশায় বসিয়ে, পিছু পিছু নিজে সাইকেল চালিয়ে এসে হাজির হল। ততক্ষণে রবিন্দু অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠেছে। ডাক্তার নাড়ি দেখলেন, বুক পরীক্ষা করলেন, পেট টিপলেন এবং যেহেতু চিকিৎসা করতে এসেছেন তাই একটা কাগজ চেয়ে নিয়ে দুরকম ক্যাপসুলও একটি টনিকের নাম লিখে দুবেলা একটি করে ক্যাপসুল ও দু—চামচ টনিক খাওয়ার নির্দেশ দিয়ে হেসে বললেন, ‘ভয়ের কিছু নেই। শক্ত খাবার কিছু দেবেন না। গরম দুধ দিতে পারেন, দরকার এখন রেস্ট। ওষুধ খাওয়ার পর ঘুমোবে। শক পেয়েছে, কালকেই ঠিক হয়ে যাবে। বেশি কথা বলবেন না। জল অল্পই পেটে গেছে, মনে তো হয় না লাংয়ে জল গেছে। ভাগ্য ভালো খুব তাড়াতাড়িই জল থেকে তুলে ফেলা গেছে।’
