‘আপনি ছিপ ফেলতে জানেন?’ সময় কাটানোর একটা ভালো উপায় বার করতে পেরে সোনা খুশিতে চোখ ভরিয়ে ফেলল।
‘দি আইডিয়া, গুড, ভেরিগুড।’ রবিন্দু উৎসাহ দেখাতে বাতাসে ঘুঁষি মারল। ‘ছিপ আছে?’
‘দিদির আছে।’
দুজনে ফিরে এল বাড়ির মধ্যে। মোনা রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল।
‘আম খাবেন?’
‘নিশ্চয়। অমিয় বলেছিল খুব হিমসাগর হয়েছে।’
মোনা একটা থালাভরে রবিন্দুর জন্য কাটা আম নিয়ে এল আর একটা আস্ত আম নিজের জন্য। আমের তলায় দিকটায় দাঁত দিয়ে ফুটো করে মোনা চুষতে শুরু করল। ওইভাবে আম খাওয়া রবিন্দু দেখেনি আগে। থালাটা রেখে দিয়ে সে বলল, ‘আমিও ওইভাবে খাব, আম আর আছে?’
ছুটে রান্নাঘরে গিয়ে মোনা একটা বড়ো পাকা আম এনে দিল রবিন্দুকে। ফুটো করে টিপে রস বার করে সে চুষতে লাগল মোনার মুখের দিকে তাকিয়ে। তার মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে একটা কথাই, মেয়েটি জানে না আমি অনেক কিছুই জেনে ফেলেছি। যাবতীয় যত্নআত্তির পিছনে একটা স্বার্থ কাজ করছে। তাকে ঘিরে এই বাড়িতে একটা সুখস্বপ্ন সবাই দেখছে। মোনার চোখেও সে দেখতে পাচ্ছে সুখাবেশ। রবিন্দু বুঝতে পারছে সে একটা বিপজ্জনক জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছে। এরা খুবই ভালো, আন্তরিক। সে অসহায়ভাবে জেনে যাচ্ছে মায়া মমতা তাকে কোণঠাসা করে দিয়ে প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতাটা কেড়ে নেবে।
‘মোনা তোমার ছিপ আছে শুনলাম, দেবে একবার। কখনো মাছ ধরিনি। বর্গাপুর থেকে এবার একটা নূতন অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরব।’
মোনা ভাইকে বলল, ‘পেয়ারা গাছে দেখ তো পিঁপড়ের ডিম পাস কিনা। কী মাছ ধরবেন তিনি না পুঁটি?’
‘তোমাদের পুকুরে ইলিশ নেই?’
‘কেন থাকবে না! আমাদের জানলা দরজা দেখছেন না, সব ধানগাছের তক্তায় তৈরি।’ মুখটিপে মোনা হাসল। রবিন্দু সরলমনে হাসিটা নিতে পারল না। এদের কথাবার্তা সেবাযত্নের মধ্যে অর্থ খুঁজে না পাবার জন্য তাঁকে নিজের সঙ্গে তর্ক করতে হচ্ছে।
পিঁপড়ের ডিম পাওয়া গেল। ছিপ আর খালুই হাতে সোনা পুকুরঘাটে এল, পিছনে রবিন্দু। ঘাটের নারকেল গুঁড়ি শ্যাওলায় পিছল। সোনা বারণ করল যেতে।
‘এখানে না বসে বরং ওদিকে নারকেল গাছটার পাশে বসুন।’ সোনা পরামর্শ দিল।
‘সোনা, পিঁড়িটা নিয়ে যা, মাটি এখনও ভিজে রয়েছে।’ খিড়কির দরজায় দাঁড়িয়ে মোনা চেঁচিয়ে বলল। সোনা দৌড়ে গিয়ে দিদির হাত থেকে পিঁড়িটা নিয়ে এল। রবিন্দু যেখানে পিঁড়ি রাখল সেখানে জমি খাড়াভাবে পাড় থেকে পুকুরে নেমেছে। ঝাঁঝি আর নলখাগড়া পুকুরের ধারটাকে জঙ্গলের মতো করে রেখেছে। জায়গাটা রবিন্দুর পছন্দ হল না, এধার ওধার তাকিয়ে সে ভালো করে বসার মতো কোনো জায়গা দেখতে পেল না। কলাপাতায় মুড়ে ভাতের মতো কয়েকটা লাল পিঁপড়ের ডিম সোনা এনেছে, তার একটা সে বঁড়শিতে গাঁথল।
‘সোনা, মামা চা খাবেন কিনা জিজ্ঞাসা কর।’ খিড়কির দরজা থেকে মোনা আবার চেঁচিয়ে বলল।
রবিন্দু মুখ ফিরিয়ে অ্যাসশ্যাওড়া গাছের ফাঁক দিয়ে তুঁতে রঙের শাড়ি দেখতে পেল। মোনা দাঁড়িয়ে খিড়কির দরজায়। ‘না খাব না।’ রবিন্দু চিৎকার করে জানিয়ে পিঁড়িটা পাড়ের কিনারে টেনে নিয়ে গিয়ে বসল।
ছিপটা ধরে রবিন্দু পিছন থেকে সামনে ঝাঁকাল, বঁড়শি সমেত গিয়ে পড়ল নলখাগড়ার ঝোপের উপর। বিরক্ত হয়ে সে বলল, ‘এতটুকু সুতো দিয়ে কী মাছ ধরা যায়।’
কুণ্ঠিত স্বরে সোনা বলল, ‘একটু সরিয়ে ওই দিকটায় ফেলুন না।’
রবিন্দু কথাটা কানে না তুলে ছিপ হাতে এগিয়ে গেল পাড়ের একদম কিনারে। নরম পিছল মাটি, আঙুল দিয়ে আঁকড়ে সে দাঁড়াল। ছিপে ঝাঁকুনি দিয়ে সুতো ছুঁড়ল, আবার পড়ল নলখাগড়ার ঝোপে এবং বঁড়শি আটকে গেল খাগড়ায়। রবিন্দু সুতোয় জোরে টান দিতেই বঁড়শিটা খাগড়ায় গেঁথে গেল। বঁড়শি ছাড়াতে সুতোটা আলগা করার জন্য সে ঝুঁকল এবং আরও ঝুঁকল তারপরই পায়ের নীচের মাটি আলগা হয়ে পুকুরে ভেঙে পড়ে গেল রবিন্দুকে নিয়ে।
সোনা মজা দেখার মতো করে দেখছিল রবিন্দুর কাণ্ড। ওকে জলে পড়ে যেতে দেখে চিৎকার করে উঠল, ‘দিদি শিগগির আয়…ডুবে যাচ্ছে মামা, ডুবে যাচ্ছে।’
খিড়কির দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল মোনা। সোনার ভীত চিৎকার শুনে সে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটল। রবিন্দু তখন দু—হাত তুলে ডুবছে আর উঠছে। হাঁ করে শ্বাস নিয়ে আর একবার যখন ডুবল মোনা তখন পাড়ে পৌঁছে গেছে। রবিন্দুর দিকে একবার তাকিয়েই সে হ্যাঁচকা দিয়ে পরণের শাড়িটা খুলে একটা প্রান্ত নিজের হাতে ধরে রেখে ছুঁড়ে দিল রবিন্দুকে লক্ষ্য করে।
‘ধরুন ধরুন শাড়ি ধরুন।’ মোনা চিৎকার করল। রবিন্দু তখন কোনো শব্দ শোনার বা শাড়ির কোনো অংশ ধরার মতো অবস্থায় নেই।
জল থেকে শাড়িটা টেনে তুলে ভাইয়ের হাতে ছুঁড়ে দিয়েই মোনা পুকুর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার নিম্নাঙ্গে শুধু সবুজ রঙের সায়া। পাড় থেকে বেশি দূরে নয় কিন্তু জল সেখানে দেড় মানুষ গভীর। দু—তিনটি হাত পাড়ি দিয়ে সে যখন পৌঁছল রবিন্দু তখন নীচের দিকে নেমে চলেছে। মোনাও ডুব দিল। চার—পাঁচ সেকেন্ড পরই সে রবিন্দুকে তুলল চুলের মুঠি ধরে। নেতিয়ে পড়েছে রবিন্দু। এই সময় প্রাণ বাঁচাবার জন্য ডুবন্ত মানুষ হাতের নাগালে যা পায় সেটাই আঁকড়ে ধরে। মোনাকে আঁকড়ে ধরবে সেই ক্ষমতাটাও তখন তার নেই।
