‘আপনার দোকান?’
‘হ্যাঁ।’
সন্দিগ্ধ এবং বিস্মিত চোখে তাকে দেখছে। অনন্ত এগিয়ে এসে গলা নামিয়ে বলল, ‘আপনি ভাড়া দেন?’
‘নিশ্চয়।’
‘আমি ভাড়া আদায় করতে এসেছি।’
‘কী নাম আপনার, কে পাঠিয়েছে?’
‘এস্টেট থেকে আসছি, আমার নাম অনন্ত দাস।’
বিল বইটা সে দেখাল। লোকটার কথায় সামান্য বিহারি টান না থাকলে বাঙালিই মনে হত।
‘আপনি যে বাড়িওয়ালার লোক তা বুঝব কী করে? বিল তো ছাপাখানা থেকে যে— কেউই ছাপিয়ে আনতে পারে।’
অনন্ত ফাঁপরে পড়ল। একটা চিঠি বা ছবিওলা আইডেন্টিটি কার্ড থাকলে ভালো হত। এমন প্রশ্ন যে উঠতে পারে তা একবার ভেবেওছিল। অজয় হালদার বলেছিল : ‘ও—সব লাগবে না, সবাই একবার চিনে গেলে আর কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করবে না।’ অনন্ত দ্বিতীয়বার আর বলেনি। নিজেকে চিনিয়ে নিতে না পারাটা হয়তো তাকে অযোগ্যতার পর্যায়ে ফেলে দেবে।
‘আমার ভাড়া পরিমলবাবু নিয়ে যেত।’
‘তিনি আর নেই।’
‘জানি। আমাকে বলে গেছে। এস্টেটের পেট্রল পাম্পে কাজ করছে।’
‘তা হলে ম্যানেজারবাবুকে বলব ভাড়ার জন্য আপনাকে চিঠি দিতে।’
‘চিঠিমিঠি কেন দেবেন’…লোকটা বিব্রত হয়ে বলল। ‘আপনাকেই ভাড়া দেব। পরিমলবাবু তো বিলটিল দিত না, আপনিও দেবেন না।’
‘সে কী! বিল দেব না?’
খদ্দের এসে পান চাওয়ায় লোকটা ব্যস্ত হল। অনন্ত এইবার বুঝতে পারছে ভাড়াটেদের লিস্টে কেন এর নাম নেই। এস্টেটকে গোপন করে দোকান বসানো হয়েছে, ভাড়াটাও গোপন রাখা হয়েছে। পরিমল চাটুজ্জেই একমাত্র লোক আদায়ের দায়িত্বে ছিল। সে যা জমা দিত তাই জমা করা হত। খাতাপত্র সেই লিখত, হিসেবও রাখত। কেউই ভাড়াটে সম্পর্কে খোঁজখবর নিত না। এভাবে কত টাকা যে পরিমল চাটুজ্জে পকেটে পুরেছে কে জানে!
‘তিন হাজার টাকা সেলামি দিয়েছি, মাসে সত্তর টাকা ভাড়া। আজ দু—বছর হল দোকান করেছি।’
লোকটা হাসছে। হাসিটা খুব স্বচ্ছ নয়।
‘আগের লোক কামিয়েছে, আপনিও কামান। ভাড়ার টাকা তো আমি দেবই। টাকা কে নিচ্ছে তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। এ—বাড়িতে অনেকভাবে টাকা কামাতে পারবেন।’
‘অনেক ভাবে?’
‘হ্যাঁ অনেকভাবে। আপনাকে পরে বলব।’
‘এখনই বলুন না।’
‘বাড়ির উঠোনটা তো দেখেছেন, কত রকমের লোহালক্কড়, বস্তা, বাক্স, পেটি পড়ে আছে, ওমনি ওমনি কি আছে? ভাড়া দিচ্ছে। বিলটিলের ধার ধারে না।’
‘কারা দিচ্ছে?’
‘কাচের দোকানের মাল থাকে, মোটর পার্টসের দোকানেরও থাকে, বাইরের প্লাইউড দোকানের বড়ো বড়ো বোর্ড, রাতে রেডিমেড জামাকাপড়ওয়ালার চৌকি বাক্সও থাকে। জলের পাম্প খারাপ বলে, নতুন পাম্প পরিমলবাবু কিনল, পাম্পটা কিন্তু ভালোই ছিল, সেটা বিক্রি করে দিল, টাকা কি জমা দিয়েছে? দেখুন আমি সব জানি, বুঝতে পারি। এখানকার দারোয়ান নিতাই ওরই লোক…বাঙালি। একে আগে তাড়ান, চোট্টা আছে। রাতে এসে দেখবেন কত লোক ঘুমোয়, সকালে স্নান করে, পায়খানা সারে, সবার কাছ থেকেই পয়সা নেয় নিতাই। আমি আপনাকে ভালো লোক দিব, আমার ভাইয়ের ছেলে।’
লোকটা এতক্ষণ ঝুঁকে চাপা স্বরে দ্রুত কথা বলছিল। খদ্দের আসতেই সোজা হয়ে বসল। অনন্ত উত্তেজিত বোধ করছে। এতভাবে বাড়িটা থেকে টাকা ওঠে অথচ এক পয়সাও জমা পড়েনি। আজই সে গিয়ে ম্যানেজার অজয়বাবুকে বলবে। রাতে সাধন বিশ্বাসকে তো জানাবেই। প্রথম দিনেই এই সব খবর পেয়ে যাওয়া, তার কল্পনার অতীত।
‘ওকে আসতে বলি?’
‘কাকে?’
‘আমার ভাইয়ের ছেলেকে।’
‘আগে ম্যানেজারবাবুর সঙ্গে কথা বলব। লোক রাখা না—রাখার মালিক তো আমি নই। এখন আপনার ভাড়াটা দিন।’
‘কাল পাবেন, দোকানে তো টাকা রাখি না, ঘর থেকে আনতে হবে। আপনি ম্যানেজারবাবুকে বলুন…এখানে যা চলছে তাতে এস্টেটেরই লোকসান হচ্ছে। ভালো লোক রাখা চাই। আমার ভাইয়ের ছেলেকে রাখলে চোরা কারবার বন্ধ হয়ে যাবে। আপনাকে সব তো বললুম, এবার আপনি ম্যানেজারবাবুকে বলুন।’
‘বলব। আপনার নামটা কী?’
‘নন্দকিশোর তেওয়ারি। আর যদি বলেন, আপনারও যাতে দু—চার টাকা আসে তা—ও ব্যবস্থা করতে পারি।’
‘আমি চোর নই।’
‘আহহা, আমি কি চুরির কথা বলছি! আপনাকে দেখেই বুঝেছি ভালো লোক আছেন। উপরি রোজগার তো ভালো—মন্দ সব মানুষই করে। টাকার কি দরকার নেই? সবার দরকার।’
‘আমার দরকার নেই। আমি কাল তা হলে আসছি।’
ফটক দিয়ে ঢুকে ডান দিকে সিমেন্ট বাঁধানো বড়ো চৌকো উঠোন আর সিঁড়ির পাশ দিয়ে ঢাকা লম্বা একটা পথ। নন্দকিশোর যা বলেছিল সেই রকমই, প্রায় গুদামের মতো হয়ে আছে জায়গাটা। একধারে স্তূপ হয়ে আছে কাঠের ভাঙা বাক্স। তার পাশে বস্তায় ভরা কাপড়ের ছাঁট, মোটর গাড়ির স্প্রিং পিনিয়ন, শরবতের ঠেলা গাড়ি, মোবিলের ড্রাম, দোতলায় যাওয়ার সিঁড়ির পাশে বান্ডিল করে রাখা চটের বস্তা।
সে নিতাইকে খুঁজল। একতলায় একটা ঘরে থাকে, এইটুকুমাত্র সে জানে। ওকে সে একবারমাত্র অঘোর এস্টেটে দেখেছে। অজয় হালদার পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিল: ‘দারোয়ান কাম কেয়ারটেকার। বছর দশেক কাজ করছে।’ চল্লিশের কাছাকাছি বয়স। কালো, রোগা, একটু খুঁড়িয়ে হাঁটে। নিতাইয়ের বিনীত কৃতার্থ ভঙ্গি তার ভালো লাগেনি।
ঢাকা পথটায় সে উঁকি দিল। পথের শেষে তালা দেওয়া কলঘর, তার পাশে পায়খানা ও পাম্পঘর। বাঁ দিকে তিনটে ঘর, বসবাসের জন্য নয়। মাত্র একটি জানালা প্রতি ঘরে, সম্ভবত মালপত্র রাখার জন্যই ঘরগুলো। একটা ঘরের জানালা এবং দরজায় গেরুয়া রঙের পর্দা। অনন্ত এগিয়ে এসে পর্দা সরিয়ে দেখল, দরজায় তালা দেওয়া। এখানেই কি নিতাই থাকে? সে কি জানালা—দরজায় পর্দা টাঙানোর মতো লোক?
