‘তা হলে কী করবি?’
‘তিন জনকেই বর্গাদার করে দেব বলে এসেছি। জমি ছ—মাস পড়ে রয়েছে, এতদিনে দুটো ফসল তো তোলা যেত। একজন চাষ করলে আমার ভাগে যা পাব, দশজন চাষ করলেও তাই পাব তা হলে আমি কেন দলাদলির ঝামেলায় যাব। চাষের খরচখরচা আমি দিচ্ছি, ফসলের ফিফটি পারসেন্ট ভাগ আমার পেলেই হল। তোর কোনো অসুবিধে হচ্ছে না তো? বড়ো জ্যাঠামশায়ের সঙ্গে কথা বলে এলি?’
‘হ্যাঁ। চমৎকার লোক, স্মৃতিশক্তি প্রখর।’
‘কালও তোকে একা থাকতে হবে। জমি ইন্সপেকশন করতে আসবে আমাকে থাকতে হবে। যদি কাজ হয়ে যায় পরশু আমি কলকাতায় ফিরে যাব।’
পরদিন সকালে রবিন্দু বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁতে ব্রাশ করছে। তখনই চোখে পড়ল উঠোনের নিমগাছটায় মোনা উঠে ডাল ভেঙে নীচে ফেলছে কুড়োচ্ছে সোনা। ব্রাশ চালানো বন্ধ করে রবিন্দু হাঁ করে তাকিয়ে রইল। পড়ে গেলে তো হাত—পা ভাঙবে। মোনা নামতে শুরু করল। সাবধানে পা ফেলে এ ডাল ও ডাল করে নামছে। নীচের দিকের একটা ডাল দু—হাতে ধরে ঝুলে পড়ল। জমি থেকে প্রায় চারফুট উপরে ঝুলছে তার পা। হাত ছেড়ে দিয়ে ঝপাৎ করে মোনা মাটিতে পড়ল। চোখ তুলেই রবিন্দু তাকিয়ে আছে দেখে লজ্জায় মুখ নীচু করে ছুটে পালাল।
রবিন্দু হাঁফ ছেড়ে আবার ব্রাশ করতে শুরু করল। বারান্দা থেকে পুকুরটা দেখা যায়। একটা লোক খ্যাপলা জাল ফেলে মাছ ধরছে। তার খুব ইচ্ছে করল পুকুর পাড়ে গিয়ে মাছ ধরা দেখতে। মুখ ধুয়ে সে নীচে নেমে এল। খিড়কির দরজা দিয়ে পুকুরে যেতে হয়। সে দরজার দিকে এগোচ্ছে তখন সোনা তার সঙ্গ নিল।
‘জালফেলা দেখতে যাচ্ছি। চলো আমার সঙ্গে।’
‘আপনি কখনো দেখেননি?’
‘না। সিনেমায় দেখেছি।’
‘বাসুদা খুব ভালো জাল ফেলে। বেছে বেছে ঠিক জায়গাটায় ছুঁড়বে।’
নারকোল গাছের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি ঘাটটা থেকে একটু দূরে পাড়ে দাঁড়িয়ে বাসু জালটা ঘোরাতে ঘোরাতে পুকুরে ছুঁড়ল। শূন্যে ছাতার মতো ছড়িয়ে গিয়ে জলে পড়ল। একটু পরে ধীরে ধীরে টেনে তুলতে লাগল। রবিন্দু উৎকণ্ঠিত হয়ে অপেক্ষায় রইল, জালে কী ওঠে! কটা মাছ, কী জাতের মাছ? এই সময়টাই মাছ শিকারের আসল সময়, এই প্রত্যাশাটা। বাসু জালটা টেনে ডাঙায় তুলল। ছটফটাচ্ছে জালে বন্দি কয়েকটা মাছ। তেলাপিয়া, চারাপোনা, বাটা, কই, একটা প্রায় আধ কিলো ওজনের কাতলা, কিছু গেঁড়ি আর গলদার বাচ্চচা।
রবিন্দু হতাশ হল, এত ছোটো ছোটো মাছ! ভেবেছিল দু—তিন কেজি ওজনের রুই কাতলা জালে উঠবে। সোনা বলল, ‘বড়ো বড়ো মাছ উঠবে টানা জাল দিয়ে যখন ধরবে। এই তো মাসখানেক আগে, যারা পুকুর জমা নিয়েছে তারা ধরল।’
‘তোমাদের এখানে এসে মাছ ধরা দেখলুম, আর কী দেখার আছে বল তো?’
‘দেখার।’ সোনা নাকে আঙুল ঠেকাল। ‘হালদারের রাধাগোবিন্দ মন্দির। মন্দিরের গায়ে পোড়া মাটির দেবদেবীর মূর্তি আছে, হাটতলার রথটা তিনতলা উঁচু, রথের সময় খুব বড়ো মেলা বসে, আমাদের স্কুল বাড়ি।’ আর কিছু সে খুঁজে পেল না।
‘মাত্র এই কটা, আর কিছু দেখার নেই?’
‘আপনি বুঝি শুধু বর্গাপুর দেখতে এসেছেন? আপনি তো এসেছেন দিদিকে দেখতে!’
‘দিদিকে দেখতে, কেন?’ রবিন্দু কথাটা বলল, আমোদ পেয়ে।
সোনা চুপ করে রইল। তারপর ইতস্তত করে বলল, ‘মা তো বলল, দিদিকে দেখতে বড়ো মামার বন্ধু আসবে।’
রবিন্দুর মাথার মধ্যে একটা চমকানি লাগল। ‘বড়োমামার বন্ধু কী জন্য দিদিকে দেখতে আসবে?’ তার কৌতূহল এবার তীক্ষ্ন হয়ে উঠেছে।
‘বারে, বিয়ের আগের মেয়েকে দেখতে আসে না? দেখে পছন্দ হলে তবেই তো বিয়ে হবে।’ সোনা বিজ্ঞের মতো মুখভঙ্গি করল।
বলে কী, বিয়ে হবে! রবিন্দু সোনার সরল মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সে তো এই সবের কিছুই জানে না, অমিয় তো তাকে কিছুই বলেনি কী উদ্দেশ্যে তাকে বর্গাপুরে নিয়ে আসছে। দিদির হাতের রান্না, গ্রামের মিষ্টি, হিমসাগর আম এই সবই তো বলেছিল, মেয়ে দেখানোর কথা তো বলেনি।
‘আপনি কিন্তু কাউকে বলে দেবেন না আমি এ কথা বলেছি। মা বারণ করে দিয়েছে।’ সোনার মুখে অস্বস্তি আর মিনতি।
‘না না বলব না, তোমার দিদি জানে?’
সোনা মাথা কাত করে বলল, ‘হ্যাঁ।’
বড়ো জ্যাঠার মাথার কাছে দাঁড়ানো মোনার চোখ ও চাহনি এখন রবিন্দুর কাছে বিশেষ অর্থ নিয়ে ধরা দিল। চেপে রাখা পুলক উচ্ছ্বসিত হয়ে মোনার চোখের মণি দুটিকে উজ্জ্বল করে রেখেছিল। অল্প বয়স তাই জীবনের প্রথম ভালোলাগা পুরুষটির কাছে সে আবেগ গোপন করতে পারছিল না। হৃদয়ের অঙ্কুরিত ভীরু লজ্জা দিয়ে সে স্বাভাবিক চঞ্চলতার রাশ টেনে ধরতে চেষ্টা করে হার মানছিল। রবিন্দুর কাছে সোনার ভাবভঙ্গি কথাবার্তার বিশ্লেষণ অন্য এক মোনাকে তার সামনে দাঁড় করাল।
‘তুমি আজ স্কুলে যাবে না?’
‘না, দিদিও যাবে না। আপনার দেখাশোনা করতে হবে, বড়োমামা বলে দিয়েছে। মা ঘরে থেকে বেরোয়নি, হাঁপানির টানটা বেড়েছে।’
‘তা হলে এখন কী করে সময় কাটানো যায়?’ রবিন্দু হালকা চালে বলল। সে যে এখানে তাকে আনার উদ্দেশ্যটা জানে না, সেটাই বজায় রাখবে ঠিক করল। এরা সবাই আশাই আশায় থাকবে। অমিয় একি ফ্যাসাদ তৈরি করল। মোনাকে বিয়ে! ঠাট্টা তামাশা ছেলেমানুষি কথাবার্তা বেশ লাগছে কিন্তু স্ত্রী হিসেবে ভাবতে গেলেই মনে কী যেন একটা খচখচ করছে। বড্ড ছেলেমানুষ, বড্ড কম বয়স। তবে সীমন্তির থেকে সব দিক দিয়েই ভালো।
