মোনা জানলায় গিয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘কেন গো কাতুর মা?’
‘কেন আবার কী, সন্ধে হয়ে গেছে তোমরা পড়তে বসবে না? মাস্টারমশায়ের আসার টাইম হয়ে গেছে।’
জিভ কেটে মোনা ‘সোনা আয়’ বলেই সিঁড়ির দিকে ছুটল।
রবিন্দু উঠে দাঁড়াল, ‘জ্যাঠামশাই আজ তা হলে আসি। আবার এলে দেখা করব।’
ফিরে এসে রবিন্দু দেখল খাওয়ার দালানের একধারে মাদুর পেতে দুই ভাইবোন পড়তে বসার জন্য তোড়জোড় করছে। সে দোতলায় উঠতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। ‘মোনা গল্পের বইটই কিছু আছে?’
মোনা একতলার শোবার ঘর থেকে দুটো বই আনল, বঙ্কিম গ্রন্থাবলী আর রামকৃষ্ণ কথামৃত।
‘কার বই এগুলো?’
‘মায়ের।’
‘তুমি পড়েছ?’
‘একটু একটু…চা খাবেন?’
‘খাব, তোমার কপালের কাটা দাগটা কীসের?’
কপালের কাটা দাগটায় আঙুল ঠেকিয়ে মোনা হাসল, ‘পড়ে গিয়ে।’
মোনা চা করে আনতে রান্নাঘরের দিকে যেতেই সোনা বলল, কী করে পড়ে গেছল জানেন রবু মামা? হনুমান সাইকেল থেকে দিদিকে ফেলে দিয়েছিল।’
‘সাইকেল থেকে মানে!’ রবিন্দু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
‘আমাদের জামরুল গাছে বসে একদিন পাঁচ—ছ—টা হনুমান জামরুল খাচ্ছিল আর চারিদিকে ছড়াচ্ছিল। দিদি একটা বাঁশ নিয়ে ওদের তাড়া করে, গোদাটাকে এক ঘা বসিয়েও দেয়। পরদিন দিদি মহাকালীর মাঠে কবাডি খেলে যখন সাইকেল চালিয়ে আমাদের পুকুর ধারের বাঁশবনের পাশ দিয়ে আসছে তখন বাঁশবন থেকে গোদা হনুমানটা দিদির ঘাড়ের উপর লাফ দিয়ে পড়ে এক চড় কষায়। দিদি ছিটকে রাস্তার ইটের ওপর পড়ে, তাইতেই কপালটা কেটে যায়। লজ্জায় দিদি কাউকে বলে না হনুমানের চড় খেয়েছে’ সোনার চোখমুখ এই গোপন তথ্যটি ফাঁস করার মজায় ঝকঝক করে উঠল। ‘জানেন রবুমামা, হনুমানটার সাইজ প্রায় আমার কাঁধ সমান, গায়ে খুব জোর, ওর একটা চড় খেলে আমি অজ্ঞান হয়ে যাব, দিদি হয়নি। হনুমানটা আমাদের ছাদ থেকে লাফিয়ে বড়োদাদুর ছাদে চলে যায়। সেদিন দিদি মহাবাঁচান বেঁচে গেছল।’
‘তোমার দিদি সাইকেল চালাতে জানে?’
‘হ্যাঁ দিদির তো সাইকেল আছে, বড়োমামা কিনে দিয়েছে। ওই যে শেকলতোলা ঘরটা, ওর মধ্যে রাখা আছে, দেখবেন?’
‘না না থাক এখন।’
‘আপনি সাইকেল চালাতে জানেন?’
‘না, কলকাতায় এত গাড়ি লোকে সাইকেল আর চড়ে না। স্কুটার আর মোটরবাইকে চাপে নয়তো ট্রাম বাসে। তোমার দিদি কবাডি খেলে?’
‘আপনি জানেন না! দিদি তো মাধ্যমিক পাশ করার আগে পর্যন্ত মহাকালী সংঘে খেলত। চন্দননগর, চুঁচড়ো কত জায়গায় খেলে এসেছে মেডেলও পেয়েছে। আপনি কবাডি খেলেছেন?’
‘না।’ রবিন্দু জীবনে কোনো খেলাই খেলেনি লুডো আর ক্যারম ছাড়া। প্রসঙ্গটা ঘোরাবার জন্য তাড়াতাড়ি বলল, ‘তোমার দিদি আর কী কী পারে, সাইকেল কবাডি ছাড়া?’
সোনা নাকে আঙুল ঠেকিয়ে পাঁচ—ছ সেকেন্ড ভেবে নিয়ে বলল, ‘ছিপ দিয়ে মাছ ধরতে পারে, ডুব সাঁতারে মাঝ পুকুর পর্যন্ত যেতে পারে, বড়ি দিতে পারে—’
চায়ের কাপ হাতে মোনাকে আসতে দেখে সে চুপ করল। তখনই উঠোন থেকে গম্ভীর গলায় ‘মোনা সোনা।’ বলে ডেকে উঠল কেউ।
‘ওরে বাবা মাস্টারমশাই।’ সমীহ আর ভয় ফুটে উঠল মোনার গলায়। চায়ের কাপ আর বই দুটো হাতে নিয়ে রবিন্দু দোতলায় উঠে এল। খাটে চিত হয়ে শুয়ে কথামৃতের প্রথমেই যে পাতাটা খুলল সেখান থেকে পড়তে শুরু করল—
‘ভক্ত—সংসারে কেন তিনি রেখেছেন?
শ্রীরামকৃষ্ণ—সৃষ্টির জন্য রেখেছেন। তাঁর ইচ্ছা। তাঁর মায়া। কামিনীকাঞ্চন দিয়ে ভুলিয়ে রেখেছেন।
ভক্ত—কেন ভুলিয়ে রেখেছেন? কেন তাঁর ইচ্ছা?’
শ্রীরামকৃষ্ণ—তিনি যদি ঈশ্বরের আনন্দ একবার দেন তা হলে আর কেউ সংসার করে না, সৃষ্টিও চলে না।
চালের আড়তে বড়ো বড়ো ঠেকের ভিতরে চাল থাকে। পাছে ইঁদুরগুলো ওই চালের সন্ধান পায়, তাই দোকানদার একটা কুলোতে খই মুড়কি রেখে দেয়। ওই খই মুড়কি মিষ্টি লাগে, তাই ইঁদুরগুলো সমস্ত রাত কড়রমড়র করে খায়। চালের সন্ধান আর করে না।
কিন্তু দ্যাখো, এক সের চালে চোদ্দোগুণ খই হয়। কামিনীকাঞ্চনের আনন্দ অপেক্ষা ঈশ্বরের আনন্দ কত বেশি। তাঁর রূপচিন্তা করলে রম্ভা তিলোত্তমার রূপ চিতার ভস্ম বলে বোধ হয়।
রবিন্দু এই পর্যন্ত যখন পড়েছে তখন ঘরে এল অমিয়। সকালে বেরিয়ে ছিল। মুখচোখ বসে গেছে।
রবিন্দু বই বন্ধ করে বলল, ‘কাজ কত দূর হল?’
অমিয় বলল, ‘অনেকটা এগিয়েছে। ঘটপুকুরের জমিটা নিয়েই গন্ডগোল। কুড়ি বিঘে জমি, বর্গাদার ছিল আমাই শেখ। ও হঠাৎ আন্ত্রিক রোগে মরে গেল, রেখে গেল বউ আর দুটো বাচ্চচা। ওরা তো আর ব্যক্তিগতভাবে চাষ করতে পারবে না। কী হবে?’
‘কেন তুই চাষ করবি।’
‘অত সোজা নয় রে, ভূমিসংস্কার আইন বলে একটা আইন আছে। বর্গাদার মরে গেলে তার বৈধ ওয়ারিশদের থেকে একজন বর্গাদার হবে। আমাই—এর বউ দুই ছেলে নিয়ে এখান থেকে আট মাইল দূরে হাদিসপুরে বাপের বাড়ি চলে গেছে। সে আর চাষ করতে চায় না।’
‘ভালোই তো এবার তোর জমি তুই ফেরত নিয়ে লোক দিয়ে চাষ করা।’
‘করা যাবে না। নিয়ম হচ্ছে ভূমিহীন কাউকে দিয়ে বর্গায় চাষ করাতে হবে। জমি আমার হলেও ফেরত পাব না। মুশকিলটা হয়েছে তিনজন চাইছে বর্গাদার হতে। গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানের বাড়িতে গেছলুম, সে ঠিক করে দিক তিনজনের মধ্যে কাকে বর্গাদার করা হবে। ঠিক করবে কী, ওখানে বিরাট দলাদলি। পার্টির ব্যাপার, দুটো তিনটে উপদল। গেলুম আর আই অফিসে। ইন্সপেক্টরবাবু অসহায়। দলাদলিতে যে পক্ষেই যান না কেন তার সরকারি চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে।’
