‘আমার ব্যাপার আমি বুঝব, তোমাদের মাথা ঘামাতে হবে না।’
‘হবে।’ চিৎকার করে ধমকে উঠলেন পূর্ণেন্দু।
ঘর থেকে দ্রুত বেরোতে যাচ্ছিল নবেন্দু, ‘উহহহ’ বলে মুখ বিকৃতি করে দাঁড়িয়ে পড়ল চেয়ার ধরে। বাঁ পা তুলে লাফিয়ে লাফিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েছিলেন মায়া। তিনি বললেন, ‘এ মেয়ে বউ হয়ে এলে সংসার ছারখার করে দেবে।’
‘কে বিয়ে করতে যাচ্ছে! ঘরে ঘরে বলে বেড়াবে, আমিও ওর পাড়ায় বাড়ি বাড়ি বলে আসব। কত ধানে কত চাল বুঝিয়ে দোব।’
.
নবেন্দু যখন কলকাতায় ওই কথাগুলো বলছিল তখন বর্গাপুরে অমিয়দের পাশের বাড়িতে বড়ো জ্যাঠা কমলাপতি বিশ্বাসের শোবার ঘরে বসে রবিন্দু গল্প করছিল সাতাত্তর বছরের বৃদ্ধ পাঠশালার প্রাক্তন শিক্ষকের সঙ্গে।
বৃদ্ধ কমলাপতি পিঠে উঁচু করে রাখা বালিসে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে আধশোয়া। তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে মোনা চুলে আঙুল ডুবিয়ে মাথা টিপে দিচ্ছে। রবিন্দু খাটের ধারে একটা টুলে বসে, পায়ের কাছে বিছানায় বসে সোনা।
‘কী নাম বললে? ভগবতী পাঠশালা, সেখানে তুমি পড়েছ? কলকাতায় এখনও তা হলে পাঠশালা আছে!’
রবিন্দু বলল, ‘এখনও পর্যন্ত আছে। তবে ইংলিশ মিডিয়াম পাঠশালা যেভাবে গজাচ্ছে তাতে বাংলা পাঠশালায় গরিবরা ছাড়া আর কেউ পড়বে না।’
‘কেন পড়বে না?’ কমলাপতি কৌতূহলী হলেন।
‘মাইনে। ইংলিশ মিডিয়ামে চার—পাঁচ বছরের বাচ্চচাকে দিতে হয় মাসে ষাট টাকা, তাও ভরতির জন্য কী ভিড়! গত বছর ছিল চল্লিশ টাকা, সামনের বছর হবে পঁচাত্তর টাকা এইভাবে বেড়ে চলেছে মাইনে। শুনছি ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত ইংরিজি পড়ানো বন্ধ করে দেবে গভর্নমেন্ট স্কুলে।’
‘জানো রবু, আমাদের ছোটোবেলায় গ্রামের পাঠশালায় ধনী—দরিদ্র সবাই একসঙ্গে পড়ত। মাইনে ছিল শিশু শ্রেণিতে দু আনা, প্রথম শ্রেণিতে চার আনা, প্রথম মান ছ আনা, দ্বিতীয় মান আট আনা, পঁচিশ—তিরিশজন ছাত্র ছিল, মোট আদায় হত সাত—আট টাকা। ছাত্র পিছু মাসে এক সের করে চাল সিদে বাবদ দিতে হত। সত্তর বছর আগে কালীমাস্টারের এই ছিল মাসে রোজগার।’ এই বলে বৃদ্ধ চোখ পিটপিট করে মুখ টিপে হাসলেন।
‘ভাবা যায় না এখনকার সঙ্গে তুলনা করলে।’ রবিন্দু বলল।
‘কালীমাস্টার প্রথমে মেনুয়া গ্রামে মাস্টারি করতেন। স্টেশন থেকে দশ—বারো মাইল দূরে, অতটা রাস্তা তাকে হেঁটে যেতে হত, ভাবতে পার! তারপর আমার ঠাকুরদা বেণীমাধব বিশ্বাস ওনাকে বর্গাপুরে আনেন। আমাদের বৈঠকখানা ঘরেই থাকতেন। পরে বংশগোপাল দাস মশায়ের বৈঠকখানা ঘরে থাকতেন। ঘরের বারান্দায় পাঠশালা। একটা টিনের চেয়ারে বসে উনি পড়াতেন।’
কমলাপতি ঝরঝরেভাবে টানা বলে যাচ্ছেন তাঁর বাল্যকালের পাঠশালার কথা, খুঁটিনাটি কিছুই ভোলেননি, তখন রবিন্দু লক্ষ করল মোনা অপলকে তার দিয়ে চেয়ে রয়েছে। চোখাচুখি হতেই চোখ নামিয়ে মুখ নীচু করে বৃদ্ধের মাথা দিয়ে ব্যস্ততা দেখাল। রবিন্দু নড়েচড়ে চোখে একাগ্রতা ফুটিয়ে বৃদ্ধের মুখের দিকে চোখ ফেরাল কিন্তু মোনার মুখটি তার দৃষ্টির অন্তর্গত করে রাখল।
‘তারপর জ্যাঠামশাই।’ রবিন্দু মনোযোগী শ্রোতার ভূমিকা নিল।
‘কালীমাস্টার গরমের আর পুজোর ছুটিতে বাড়ি যেতেন, নয়তো দশ মাসই দিনরাত পড়ানো নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন।’
মোনা অবাক হয়ে বৃদ্ধের দিকে তারপর রবিন্দুর দিকে তাকিয়ে চোখ বিস্ফার করে বলল, ‘দিনরাত পড়াতেন! বাব্বা, ছাত্রদের কী অবস্থা হত?’
রবিন্দু মুগ্ধ দৃষ্টিতে মোনার চোখদুটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যারা হায়ার সেকেন্ডারিতে ফেল করতে চায় না তাদের জন্য দরকার এই কালীমাস্টারের মতো পড়াবার লোক।’ যাকে উদ্দেশ্য করে বলল সে মুখ নীচু করে মৃদুস্বরে বলল, ‘ফেল করায় আমার অ্যালার্জি আছে, জীবনে ফেল করিনি।’
‘তারপর জ্যাঠামশাই।…দিনরাত উনি পড়াতেন।’
মোনা এতক্ষণে কথা বলল, ‘বড়োদাদু মাস্টারমশাই খেতেন কোথায়?’
‘কেন নিজে রেঁধে খেতেন। সিদেয় পাওয়া চাল ছাড়াও ছাত্ররা এটাসেটা আনাজ তেল নুন এনে দিত। পালা করে ছেলেরা জল আনা, উনুনে আঁচ দেওয়া, ঘর পরিষ্কার করা, কাপড়জামা কাচার কাজ করে দিত।’
বড়োজ্যাঠাকে কথা চালিয়ে যাওয়ার জন্য রবিন্দু একটা কৌতূহল ধরিয়ে দিল, ‘শুনেছি তখনকার পাঠশালায় খুব ভালো অঙ্ক শেখান হত?’ মোনার সঙ্গে যতবার দৃষ্টি বিনিময় হয়েছে তার বুকের মধ্যে তিরতিরে একটা ভাব হালকা ছলক দিয়েছে, এমনভাবে শরীরটা কখনো পালকের মতো লাগেনি।
‘শেখানো হত মানে! আট—ন বছর বয়সে আমরা পাটিগণিতের যেসব অঙ্ক শিখেছি হাইস্কুলে ক্লাস সেভেন পর্যন্ত তাই ভাঙিয়ে চলে গেছে। তার সঙ্গে ছিল শুভঙ্করের অঙ্ক—মনকষা, সেরকষা, মাসমাইনে, বিঘাকালি, কাঠাকালি। প্রত্যেকটার জন্য আলাদা আলাদা আর্যা মুখস্থ করতে হত। এখনকার ছেলেমেয়েদের তো শিখতেই হয় না, এ সবের নামও শোনেনি, এখন তো মিটার লিটার ডেসিমেল। বিঘাকালির আর্যা কী ছিল জান?—কুড়ুবা, কুড়ুবা কুড়ুবা লিহ্যে, কাঠায়া কুড়ুবা কাঠায় লিহ্যে; কাঠায় কাঠায় ধূল পরিমাণ, বিশধূলে হয় কাঠায় প্রমাণ। কুড়ুবা মানে বিঘে, ধূল মানে গণ্ডা বুঝলে কিছু?’ বৃদ্ধ মিটমিট চোখে হাসতে লাগলেন।
সেই সময় বাড়ির বাইরে থেকে নারীকণ্ঠ চেঁচিয়ে ডাকল ‘মোনা সোনা শিগ্গিরি এসো, দিদি তোমাদের বাড়ি আসতে বলছে।’
