ঠান্ডা গলায় পূর্ণেন্দু বললেন, ‘বিয়ে করতে আমি বারণ করছি না, তুমি আমাকে ভুল বুঝছ। শুধু বলতে চাইছি ওটা নিছকই পুতুলের বিয়ের মতো ব্যাপারে দাঁড়াবে। প্রেমহীন দাম্পত্য, যা বেশিরভাগ পরিবারেই তুমি দেখতে পাবে, যদিও তারা বাইরে দেখায় খুবই সুখী দম্পতি, এমন একটা সম্পর্ক কী তুমি আজীবন চাও? দিনকাল যে বদলেছে, মানুষের চিন্তা যে এগিয়ে গেছে এটা কী তুমি বুঝতে পারো না?’
স্মৃতিকে বিভ্রান্ত দেখাল। পূর্ণেন্দু বুঝলেন তাঁর থেকে বয়সে কম করে চার দশকের ছোটো একটি মেয়ে বিপন্ন হয়ে তাঁর কাছে জীবনের ব্যক্তিগত লজ্জার কথা খুলে ধরেছে কিন্তু নিজের অবস্থানটিকে ঠিকমতো দেখতে পাচ্ছে না। এই বিপন্নতা কোনোকালে নবেন্দুর মতো কোনো পুরুষ অনুভব করতে পারবে না যা এই মেয়েটির জীবনে এসেছে। ওর ধারণা বিয়ে করলেই বোধহয় সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু একটি পুরুষ ও নারীর মধ্যে গূঢ় বোঝাপড়ার সম্পর্কটা সাতপাকে বাঁধার বা মালাবদলের দ্বারাই তো স্থির হয়ে যায় না! ‘
স্মৃতির চোখে আবার জ্বলে উঠল আগুন। কণ্ঠস্বর চেপে বলল, ‘দেখুন আমি অতশত কথার মধ্যে যেতে চাই না, নবেন্দুকে বিয়ে করতেই হবে নয়তো আমি এই হাউজিংয়ের ঘরে ঘরে গিয়ে আপনার ছেলের কীর্তির কথা বলে আসব। একটা কথা বলে রাখছি, নবেন্দুর জীবন কিন্তু নিরাপদ থাকবে না, স্মৃতি চ্যাটার্জির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার ফল ও হাতে হাতে পাবে। এটা আপনার ছেলেকে বলে দেবেন, আমার চরিত্রে কাদা ছিটিয়ে ও যদি ভাবে পার পেয়ে যাবে, তাহলে ভুল করবে। নবেন্দুকে আমি ভালোবাসি, হ্যাঁ, এত কিছু বলার পরও।’
‘তাহলে তুমি নবেন্দুর সঙ্গেই বোঝাপড়া করে নাও। আমাকে এখানে এসে হুমকি দিচ্ছ কেন?’ পূর্ণেন্দু বিরক্ত ও তিক্ত স্বরে বললেন ধমক দিয়ে, তিনি ইতিমধ্যেই যথেষ্টভাবে বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত। এই নির্বোধ মেয়েটির কাছ থেকে আর কিছু শুনতে চান না।
‘বেশ তাই হবে। নবেন্দুকে শেষবারের মতো বলব, যদি রাজি হয় তাহলে ভালো। নয়তো—’ কথা অসমাপ্ত রেখে সে ঘর থেকে বেরিয়েই থমকে পাশে তাকাল। মায়া দেয়ালে হাত রেখে ফ্যাকাসে মুখে দাঁড়িয়ে। স্মৃতি সদর দরজা খুলে বেরিয়ে আস্তে পাল্লা দুটো ভেজিয়ে দিল।
পূর্ণেন্দু মুখ তুললেন মায়াকে দেখে। বজ্রাহাতের মতো মায়া সামনে বসলেন। কেউই কোনো কথা বলছেন না। অবশেষে নীরবতা অসহ্য হয়ে উঠতে মায়া মুখ খুললেন, ‘এখন কী করব?’
‘নবেন্দুকে বলব।’
‘বিয়ে করতে? এমন মেয়েকে?’
‘এমন ছেলের জন্য এমন মেয়েই তো যোগ্য।’ যেন কালমেঘ পাতা চিবিয়ে ফেলেছেন এমনভাবে পূর্ণেন্দু বললেন, ‘বিয়ে ওকে করতেই হবে, নয়তো যা মেয়ে দেখলুম, নির্ঘাৎ এখানে এসে হুলস্থুল বাধাবে। তুমি কী চাও আমরা এখানে মাথা নীচু করে বাস করি, ফ্ল্যাট বেচে দিয়ে চলে যাই? আমার আরও একটা ছেলে আছে তারও বিয়ে দিতে হবে, মেয়ে—জামাই আত্মীয়স্বজন আছে।’
‘রবু ফিরে আসুক, ওর সঙ্গে কথা বলে যা ঠিক করার করো।’
‘কেন, রবুর সঙ্গে কথা বলতে হবে কেন? আমি কী নিজেই ঠিক করতে পারি না?’ পূর্ণেন্দু চিৎকার করে উঠলেন, ‘আমার থেকে রবুর বিদ্যেবুদ্ধিটা কী বেশি?’
স্বামীর মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মায়া ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। পূর্ণেন্দু বেসিনে গিয়ে ঘাড়ে মুখে জল দিয়ে এসে সোফায় শুয়ে পড়লেন।
নবেন্দু আজ ফিরল তাড়াতাড়িই। বাঁ পায়ে নতুন করে ক্রেপ ব্যান্ডেজ বাঁধা। খোঁড়াচ্ছে। মায়াকে জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে বলল, ‘আজ আবার লাগল, আবার এক্স—রে করাতে হবে।’
মায়া কথা না বলে রান্নাঘরে ঢুকলেন। খাওয়ার টেবলে একা বসে থেকে বিরক্ত হয়ে নবেন্দু নিজ মনে বিড়বিড় করল, ‘টিভি—টা বন্ধ কেন, এখন তো সিরিয়াল হয়!’ সে উঠে অন্ধকার বসার ঘরে ঢুকল। আলো জ্বালতেই দেখল পূর্ণেন্দু চিত হয়ে সোফায় শুয়ে।
‘অন্ধকার শুয়ে যে! টিভি দেখছ না?’
‘আজ একটা মেয়ে এসেছিল নাম বলল স্মৃতি চ্যাটার্জি।’ পূর্ণেন্দু উঠে বসলেন। নবেন্দুকে তিনি মানসিক প্রস্তুতি নেবার সময় দিতে চান না, কোনো ভূমিকা না করেই বললেন, ‘কেন এসেছিল নিশ্চয় তা অনুমান করতে পারছিস। নোংরা কথাটা আমি আর উচ্চচারণ করতে চাই না।’
নবেন্দু টিভির সুইচে আঙুল সবে দিয়েছে, সরিয়ে নিল। চোখ কুঁচকে বাবার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘স্মৃতি এখানে এসেছিল! আশ্চর্য, সাহস তো কম নয়! বারণ করেছিলুম তা সত্ত্বেও?’
‘ব্যাপারটা যখন চরম লজ্জার মেয়েরা তখন সাহসী হয়ে ওঠে।’
‘কী বলল?’
‘বিয়ে না করলে এখানে এসে ঘরে ঘরে বলে যাবে তোর কীর্তির কথা। আর তোর জীবন নিরাপদ থাকবে না।’
‘তার মানে মেরে ফেলবে? তা ওর দাদা পারে, একটা মাফিয়া!’
‘তোর জীবন নিয়ে আমি ভাবছি না কিন্তু অন্য ব্যাপারটা আমায় ভাবাচ্ছে—তোকে বিয়ে করতে হবে।’ অচঞ্চল অনুত্তেজিত পূর্ণেন্দুর গলা।
‘কেন করতে হবে?’ নবেন্দুর ভঙ্গিটা তেরিয়া হয়ে গেল। ‘প্রমাণ করুক আগে, ব্লাড টেস্ট করতে হয় তো করুক। আমি কী একা নাকি, ওর তো আরও বয় ফ্রেন্ড আছে।’
‘তাহলে এমন মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছিলিস কেন? এখন তো খেসারত দিতেই হবে। মেয়েটা কিন্তু বাজে থ্রেট করে যায়নি নবু, খুব সিরিয়াস, মরিয়া।’
