‘আমাকে আপনি চিনবেন না আমার নাম স্মৃতি চ্যাটার্জি। আমার দাদার নাম বুদ্ধদেব চ্যাটার্জি একবার তিনি এখানে এসেছিলেন।’
পূর্ণেন্দুর মনে পড়ল সমরেশের মোটরবাইকের পিছনে বসে ধুতি পাঞ্জাবি পরা যে লোকটা একদিন এসেছিল, তার নাম বলেছিল বুদ্ধদেব। সবুজ সংঘের সেক্রেটারি, ওর ক্লাবেই খেলত নবু। সেদিন বুদ্ধদেব চ্যাটার্জিকে এখান থেকেই পার্টির মিটিংয়ে নিয়ে যায় সমরেশ।
‘হ্যাঁ বুদ্ধদেব চ্যাটার্জি একদিন এসেছিলেন।’
‘নবেন্দুকে আমার দাদা খুব পছন্দ করতেন। নবেন্দু সমরেশদার বাড়িতে প্রায়ই যেত, আমিও যেতাম, একই পাড়ায় আমরা থাকি। ওখানেই আমার সঙ্গে আলাপ হয় নবেন্দুর। তখন ও প্রমিসিং উঠতি প্লেয়ার। বড়ো কিছু একটা হবে আমাদের সেই রকম ধারণাই হয়েছিল। নাম হবে, টাকা হবে ও আমাকে বুঝিয়েছিল। আমি বিশ্বাসও করেছিলুম। দাদাই সমরেশদাকে বলে ওকে মোহনবাগানে ঢোকায়। কিন্তু যা হতে পারত তা হল না। আর বোধহয় হবেও না। ওর পায়ে একটা ইঞ্জুরি হয়েছে সেটা লুকিয়ে রেখেছিল। এখন ক্লাবের সবাই তা জেনে গেছে। নবেন্দু আগে বাগুইহাটি যেত এখন আর যাচ্ছে না। এসব কথা বলে আমি বোধহয় আপনাকে বিরক্ত করছি। ভাবছেন দুপুরবেলায় একটা মেয়ে এসে কী আবোল—তাবোল বকছে।’ স্মৃতির চোখ দুটি তীক্ষ্ন হয়ে উঠল। চোয়ালের নীচে শক্ত হয়ে গেল মাংসের দলা। চোখ নামিয়ে কী একটা ভেবে নিয়ে বলল, ‘আমি আপনার আর সময় নষ্ট করব না।…আমি মা হতে চলেছি, বাবা নবেন্দু।’
কথাটা ভালো করে পূর্ণেন্দুর মাথার মধ্যে বসতে সেকেন্ড দশেক সময় লাগল। ‘কী বললে তুমি!’
‘আমি প্রেগনান্ট, চার মাস চলছে।’
পূর্ণেন্দুর মাথার মধ্যে অন্ধকার নেমে এল। স্তম্ভিত হয়ে পাথরের মতো বসে রইলেন, স্মৃতির মুখ ঝাপসা হয়ে আসছে। সারা শরীরের রক্ত দ্রুত বুকে এসে জমা হচ্ছে। একটা কাতরধ্বনি অস্ফুটে তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল। তিনি ধীরে ধীরে শরীরটাকে আলগা করে চেয়ারে হেলান দিয়ে জানলার দিকে মুখ ফেরালেন।
‘নবেন্দুকে বলেছ?’
‘ও জানে।’
‘আর কেউ?’
‘না। শুধু আপনি এখন জানলেন। একথা কী কাউকে জানানো যায়।’
‘নবেন্দু কী বলছে!’
‘যা বলেছে সেটা আমি পারব না, সন্তান নষ্ট করব না, তা ছাড়া অ্যাবরশনের সময়ও পার হয়ে গেছে।’
‘এখন তুমি কী করতে চাও?’
‘বিয়ে।’ পুকুরে ঢিল ফেলার মতো একটা শব্দ যেন উঠে এল স্মৃতির উচ্চচারণে।
পূর্ণেন্দুর মনে হচ্ছে দৃঢ় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে মনস্থির করে সেই মেয়েটি একবার শেষ চেষ্টা করতে তাঁর কাছে এসেছে।
‘নবেন্দু বিয়েতে রাজি নয়। স্বীকার করতে চায়নি, বলছে অন্য কেউ এর বাবা।’ স্মৃতি পেটের উপর দুটি তালু চেপে ধরল। পূর্ণেন্দু দুটি চোখ আবার জানালার বাইরে রাখলেন।
‘নবেন্দু এভাবে আমার চরিত্রে কালি ছিটোবে আমি ভাবিনি।’ স্মৃতির ঠোঁট কাঁপছে। চোখ দিয়ে বেরিয়ে এল ক্রোধের হলকা। আঙুলগুলো দুমড়ে বেঁকে উঠল। চেষ্টা করে যাচ্ছে নিজেকে ধরে রাখতে, শেষ পর্যন্ত পারল না। চোখ থেকে দরদর করে জলের ধারা নামতে শুরু করল।
‘আমার দাদাকে আমি জানি, মারাত্মক লোক। ওর পলিটিক্যাল প্রোটেকশনেই টিকে আছে সমরেশ ঢালির মতো দু—তিনটে খুনি যারা দাদার কথায় কাজ করে। দাদা যদি একবার শোনে, আমার এই হাল কে করেছে তাহলে কী যে কাণ্ড ঘটবে তা ভাবতেও পারছি না।’
স্মৃতি সোফা থেকে নেমে আচমকা পূর্ণেন্দু দুটো পা জড়িয়ে ধরল। ‘বিশ্বাস করুন আমার পেটে নবেন্দুরই বাচ্চচা। ও যদি বিয়ে না করে তা হলে আমাকে আত্মহত্যা করতে হবে।’
পূর্ণেন্দু ডান হাতটা সামান্য তুললেন নিষেধ করার ভঙ্গিতে। শ্রান্ত স্বরে বললেন, ‘বিয়ে হয়তো করতে হবে কিন্তু তুমি ওকে এতটা প্রশ্রয় কেন দিলে? তোমার কথা বলা থেকে মনে হচ্ছে কিছু লেখাপড়া শিখেছ।’
মাথা নামিয়ে স্মৃতি চুপ করে রইল।
‘যাও উঠে বসো। নবেন্দুর বাবা আমি, যতটা লজ্জা পাওয়ার আমি পাচ্ছি। সে এখন বড়ো হয়েছে, সাবালক। নিজের ভালোমন্দ বোঝার ক্ষমতা তার নিশ্চয় হয়েছে। যা করেছে তার দায় তাকেই নিতে হবে। আমি বড়ো জোর তাকে ত্যাজ্য পুত্র করতে পারি, এই ফ্ল্যাট থেকে বার করে দিতে পারি, এর বেশি আর কী করতে পারি যদি সে আমার কথা না শোনে? নবেন্দু এখন স্বাবলম্বী।’
দিগভ্রষ্ট পথিকের মতো স্মৃতি বলল, ‘আপনি কী আমায় কোনো সাহায্যই করতে পারেন না?’ পূর্ণেন্দু আবার হাতটা তুললেন।
‘ওকে আমি নিশ্চয় বলব বিয়ে করতে। কিন্তু মা তুমি কী এই বিয়ের পর সুখী হবে?’ পূর্ণেন্দু আবার হাতটা তুললেন।
‘ওকে আমি নিশ্চয় বলব বিয়ে করতে। কিন্তু মা তুমি কী এই বিয়ের পর সুখী হবে? তোমাদের সম্পর্ক তো কখনো স্বাভাবিক হবে না। নবেন্দু বলছে, সে পিতা নয়, তার মানে সে দায় এড়িয়ে পালাতে চায়। কেন পালাতে চাইছে? উত্তরটাও সহজ—তোমাকে ভালোবাসে না। এমন লোককে তুমি বিয়ে করবে!’ পূর্ণেন্দু কথার শেষে সামনে ঝুঁকে পড়লেন জবাবের অপেক্ষায়। স্মৃতির মন এখন কীভাবে কাজ করছে সেটা তাঁর জানা দরকার। ‘বলো, এমন একটা স্বামী কী তুমি চাও?’
‘কিন্তু সমাজে আমি মুখ দেখাব কেমন করে, মাথা তুলে চলব কেমন করে? সবাই ছি ছি করবে। বিয়ে না হওয়া মা বিদেশে চলে, আমাদের উঁচু সমাজে চলে আর ঝুপড়ি বস্তির সমাজে চলে কিন্তু মধ্যবিত্ত সমাজে চলে না। আপনার ছেলেকে বিয়ে করতে আপনি বারণ করছেন। না, আমি বিয়ে করতে চাই চাই চাই।’ উত্তেজিত হয়ে স্মৃতি উঠে দাঁড়িয়ে আবার সোফায় বসে পড়ল। তার চোখ দিয়ে ধকধক করে বেরিয়ে আসছে হিংস্রতা।
