‘একে কী তোলা বলে? আরও তোলো।’ রবিন্দু হালকা স্বরে বকুনির মতো বলল।
গম্ভীর মুখে দুই ঠোঁট টিপে মোনা আবার ভাত তুলল মুঠোটা আরও ছোটো করে।
‘উঁহু, এইভাবে তোলো।’ রবিন্দু হাতের চেটো থাবার মতো মেলে ধরে দেখাল।
মোনা এই প্রথম কথা বলল, ‘এটুকু খেতে পারবেন।’ কথাটা বলেই সে থালা হাতে উঠে দাঁড়িয়ে বুঝিয়ে দিল আর সে ভাত তুলবে না।
‘দিদি এটা কী?’ রবিন্দু একটা বাটি আঙুল দিয়ে দেখাল।
‘চালকুমড়োর পাতুরি, নারকোল আর সর্ষেবাটা দিয়ে। আমি তো আজ রান্নাঘরে যেতেই পারিনি, সব তো মোনাই রেঁধেছে। মুখে যতটুকু পেরেছি বলে দিয়েছি। দেখো তো খেয়ে কেমন হয়েছে!’
রবিন্দু চালকুমড়োর একটা চাকলা তুলে ভাতের সঙ্গে মেখে প্রথম গ্রাস মুখে দেবার সময় আড়চোখে মোনার মুখটা দেখে নিল। উৎকন্ঠায় পাংশু হয়ে রয়েছে।
‘ইসস একদম নুনে পোড়া।’ রবিন্দু মুখ বিকৃতি করল।
‘সে কী রে, কই আমার তো নুন ঠিক লাগল!’ অমিয় খুবই অবাক হয়ে বলল। অরুণাকে সন্ত্রস্ত দেখাল।
রবিন্দুর মনে হল মোনার মুখ থেকে পলকের জন্য রক্ত সরে গেল। ‘আপনাকে ওটা খেতে হবে না’ বলে থমথমে মুখে সে বাটিটা প্রায় ছোঁ মেরে তুলে নিল।
‘তুমি একটু টেস্ট করে দেখো।’ রবিন্দু নির্দেশ দিল গম্ভীর মুখে।
মোনা বাটি থেকে আঙুলে কোরা নারকোল ও বাটা সর্ষের কাই তুলে মুখে দিয়ে জিভে পরখ করে ঢোঁক গিলেই শিউরে উঠল, ‘মাগো কী মারাত্মক নুন। পরেশ মুদি এবার নুন দিয়েছে, একেবারে বিষের মতো।’ হাসিতে ঝকমক করে উঠল তার চোখের মণি।
রবিন্দু বুঝে গেল মোনা রসিকতা বোঝে এবং পালটা করতেও পারে। অরুণাও মোনার কথা থেকে বুঝে গেলেন রবিন্দু ঠাট্টা করেছে।
‘বাটিটা দাও। নুন যখন একবার খেয়েছি তখন গুণও গাইব।’ রবিন্দু হাত বাড়াল। ‘দিদি এমন জিনিস কখনও খাইনি, অপূর্ব। নুন খেয়ে কিন্তু বলছি না, দ্রৌপদীও হার মেনে যাবে।’
‘এঁটো হয়ে গেছে বদলে আনি।’ মোনা রান্নাঘরের দিকে ছুটল এবং একই গতিতে অন্য একটা বাটিতে পাতুরি নিয়ে ফিরে এল। রবিন্দু বাটি উপুড় করে পাতে ঢালল।
কুচো চিংড়ি আর ছোলা দিয়ে কচুশাকের ঘণ্ট এবং মসুর ডাল দিয়ে ভাত খাবার পর একটা বাটিতে ঝোলে ডুবে থাকা একটা বড়ো গলদা চিংড়ির মাথা দেখে রবিন্দু বলল, ‘আমাকে দিয়েছেন কিন্তু অমিয়কে তো দেননি?’
অরুণা কুণ্ঠিতভাবে বললেন, ‘পুকুরে জাল দিয়ে ওই একটাই পাওয়া গেছে।’
‘অমিয় এটাকে তাহলে ভাগাভাগি করা যাক। তুই ধড়টা নে আমি মাথাটা নিচ্ছি।’
আপত্তি করে উঠল অমিয়। মোনা বলল, ‘চিংড়ি মাছে মামার অ্যালার্জি আছে, আপনি একাই খান।’
‘আমারও অনেক কিছুতে অ্যালার্জি আছে।’
রবিন্দু বুঝে যাচ্ছে না তার মধ্যে কী এমন ঘটল যে এইভাবে সে ছেলেমানুষের মতো কথা বলে যাচ্ছে! হঠাৎ একটা সজীব প্রফুল্লতায় সে আক্রান্ত হল কেন? সবাই তার সম্পর্কে প্রশংসা করে বলে বিবেচক, বিচক্ষণ, অগ্রপশ্চাৎ ভেবে কাজ করে, আবেগের বশে কিছু করে না। অথচ যুক্তির এবং বিজ্ঞতার গণ্ডির বাইরে বেরোবার জন্য তার মধ্যে কী একটা যেন ফাঁপিয়ে উঠছে। এখন তার কৈশোরে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে।
রবিন্দুকে অবশ্য গোটা গলদাটাই খেতে হল। তারপর চালতার টক। অরুণা জানালেন টাটকা মৌরালা মাছ বাজারে আজ ওঠেনি, পরে অম্বল করে খাওয়াবেন। খাওয়ার পর রবিন্দু হাত ধুতে বাইরের রকে এল। বালতিতে জল আর মগ হাতে নিয়ে মোনা দাঁড়িয়ে, অন্য হাতে গামছা ও সাবান। হাতে সাবান মাখতে মাখতে রবিন্দু নীচু গলায় বলল, ‘তোমাকে চেনাই যায় না, বড়ো হয়ে গেছ।’
‘হবেই তো, বয়স বাড়লে তো বড়োই হয়। আপনি কিন্তু একটু মোটা হয়েছেন, মা যাই বলুক।’
ভিতরের দালানে অমিয় তখন দিদিকে বলছে চাপা গলায়, ‘মনে হচ্ছে ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষাটায় মোনা ফার্স্ট ডিভিশন পাবে, ফাইনালে কী হয় সেটাই ভাবাচ্ছে।’
.
অমিয় যখন বর্গাপুরে তার দিদিকে কথাটা বলছিল সেই সময় কলকাতায় আনন্দ নিকেতনে পূর্ণেন্দুর ফ্ল্যাটের দরজার বেল বাজল। পূর্ণেন্দু তখন খেয়ে উঠে বসার ঘরে সোফায় শুয়ে খবরের কাগজের সম্পাদকীয় পড়ছিলেন। মায়া পাশের ঘরে বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। এই সময় কে এল! রবু কলকাতায় নেই, নবু ক্লাবের ক্যান্টিনে ভাত খেয়ে কোনোদিন ফিরে আসে কোনোদিন ফেরে না। আর ওর আসার সময় পার হয়ে গেছে। তাহলে ভরদুপুরে কে এল!
দরজা খুলে দেখলেন একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে। একে আগে কখনো দেখেননি। এই সময় নানান রকম জিনিস বিক্রি করতে আসে মেয়েরা, কিন্তু এর হাতে তো চামড়ার লেডিজ ব্যাগ ছাড়া আর কিছু নেই। বোধহয় ফ্ল্যাট ভুল করেছে।
‘কাকে চাই?’
‘আপনি কী পূর্ণেন্দু গুপ্ত?’ দ্রুত অস্থিরভাবে মেয়েটি বলল।
পূর্ণেন্দু বিস্মিত চোখ নিয়ে বললেন, ‘হ্যাঁ আমিই।’
‘আপনার সঙ্গে কথা আছে, ভেতরে যেতে পারি?’
‘আসুন।’ বলেই পূর্ণেন্দু মেয়েটির আপাদমস্তক দেখে নিলেন। বেশ ফর্সা, মাঝারি উচ্চচতা, বয়স বাইশ—চব্বিশ হবে, গোলগাল শরীর। মুখটি চোখা, প্রসাধন নেই শুধু ঠোঁটে হালকা রঙ, চোখের চাহনি তীক্ষ্ন, রঙিন ফুলছাপ ভয়েলের শাড়ি, রিস্টওয়াচ, একহাতে সোনার বালা, লাল পাথরের আংটি। মনে হয় গেরস্থ ঘরেরই।
বসার ঘরে এসে বলার আগেই মেয়েটি সোফায় বসে পড়ল। সামনের চেয়ারে বসলেন পূর্ণেন্দু। ‘বলুন কী দরকার?’
