রবিন্দু উঠোনে দাঁড়িয়ে এপাশ ওপাশ তাকিয়ে বলল, ‘আরে কিছুই তো বদলায়নি, সব তো একই রকম আছে!’
অমিয় তার ছোটো সুটকেস আর রবিন্দুর ব্যাগটা, হাফপ্যান্ট আর রঙিন স্পোর্টস শার্ট পরা শ্যামলা রঙের লম্বা ছিপছিপে ছেলেটির হাতে দিয়ে বলল, ‘ওপরে বড়োঘরে রেখে আয়।’ তারপর রবিন্দুকে বলল, ‘দিদি খুব গুছোনো আর খুঁতখুঁতে। একটা জিনিসও এধার ওধার হবার উপায় নেই। ভোররাতে উঠে আগে উঠোন ঝাঁট দেয়।’
রবিন্দু একবার উপর দিকে তাকাল। বারান্দায় খুঁটি ধরে ঝুঁকেছিল একটি মুখ। রবিন্দু শুধু দেখল ঝুলে পড়া চুলের মধ্য দিয়ে হালকা শ্যামবর্ণ একটা মেয়ের মুখ আর বড়ো বড়ো টানা চোখ তার দিকে কৌতূহলভরে তাকিয়ে। তাকে মুখ তুলতে দেখেই চট করে সরে গেল।
‘রবু ডাব খাবি? হ্যাঁরে সোনা, বাসু কোথায় রে? ওকে ডাব কেটে দিতে বল।’
দোতলায় ব্যাগ ও সুটকেস রেখে সোনা ফিরে এসে রবিন্দুকে কৌতূহলী চোখে নিরীক্ষণ করায় ব্যস্ত। সে বলল, ‘বাসুদা তো ডাব পেড়ে দিয়ে বাড়ি চলে গেছে। ডেকে আনব?’
‘থাক পরে খাব।’ রবিন্দু বলল।
‘এই সোনা, শোন।’ আধভেজানো দরজার পাশ দিয়ে একটা হাত হাতছানি দিল। তুঁতে রঙের শাড়ির আঁচল দেখতে পেল রবিন্দু। সোনা ‘কী’ বলে রকে উঠে দরজার কাছে গেল। সেখান থেকেই বলল, ‘দিদি ডাব কেটে দিচ্ছে।’
‘কাটারি দিয়ে ডাব কাটবে! না না দরকার নেই।’ রবিন্দু প্রায় আঁতকে উঠল। সে ভাবতে পারে না, হাতের তালুতে ভাব রেখে খচাত খচাত করে কাটারির কোপ দিয়ে কোনো মেয়ে ডাব কাটছে। যদি একটা কোপ হাতের উপর পড়ে!
ততক্ষণে খচাত খচাত শব্দ শুরু হয়ে গেছে। অমিয় হাসছে।
‘তোকে ডাবের জল না খাইয়ে ছাড়বে না মোনা।’
সোনা দুটো কাচের গ্লাসে ডাবের জল নিয়ে এল। রকের সিঁড়িতে বসে দু—জনে দু—গ্লাস করে জল খেল।
অমিয় বলল, ‘ওপরে চল, জামা প্যান্ট ছাড়বি, সোনা, দিদি কোথায় রে, রান্নাঘরে তো?’
‘মা সকাল থেকে শুয়েছিল, এখন রান্নাঘরে গেল।’
অমিয় বিব্রত স্বরে বলল, ‘আবার শরীর খারাপ? কী হয়েছে, সেই শ্বাসের টান?’
‘হ্যাঁ, কাল থেকে।’ সোনা ম্লান স্বরে বলল।
‘তাহলে তো মুশকিল হল।’ অমিয়কে চিন্তিত দেখাল। ‘তোকে দিদির হাতের রান্না খাওয়াব বলে আনলুম।’
রবিন্দু ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘তাতে কী হয়েছে। নাইবা ডালনা ঘণ্ট অম্বল হল, ঝোল—ভাতই খাব।’
অমিয়র দিদি অরুণা রান্নাঘর থেকে গেলেন। বয়স পঁয়তাল্লিশের মধ্যে, কৃশকায়, শ্যামবর্ণ, মুখাকৃতি ডিমের মতো, দীর্ঘ চোখ, পরনে কালো পাড় সাদা শাড়ি। দু—হাতে একগাছা করে সরু সোনার চুড়ি।
‘ঝোল ভাত খাবে কী!’ রবিন্দুর প্রণাম নিতে নিতে বললেন। তাই দেখে সোনার এতক্ষণে খেয়াল হল, সে তাড়াতাড়ি রবিন্দুকে প্রণাম করল।
‘বাড়িতে কী রান্না করার লোক নেই? আমি তো শুধু কচুর শাকটা করে দিচ্ছি। রবিন্দু তুমি কিন্তু রোগা হয়ে গেছ।’
‘বলছেন কী দিদি! নীচু হয়ে মোজা পরতে গেলে এখন পেটে চাপ পড়ে।’
অমিয় হালকা চালে বলল, ‘থাক এখানে সাতদিন, মোজা পরাই তোর বন্ধ করে দেবে দিদি।’
অরুণা তাড়া দিলেন, ‘বারোটা বেজে গেছে, এবার চানটান করে খেয়ে নাও। কলঘরে জল ধরা আছে।’
দোতলায় উঠেই প্রথম ঘরটা বড়ো ঘর। পালঙ্কের মতো জমকালো একটা খাট, পুরু গদি, দুটো মাথার ও দুটো পাশবালিস। ধবধবে চাদর। নতুন ইলেকট্রিক ওয়্যারিং, সিলিং ফ্যান। বর্গাপুরে বিদ্যুৎ এসেছে। রবিন্দু চেইন টেনে ব্যাগ খুলতেই চোখে পড়ল সোনালি মোড়কে দুটো চকোলেট বার। সকালে বাসে ওঠার আগে কিনেছিল অমিয়র ভাগনেভাগনিকে দেবার জন্য, ভুলে ছিল এতক্ষণ। পরে দেবে ভেবে রেখে দিল।
স্নান করে দুজনে খেতে এল একতলার লম্বা দালানে। রঙিন পশমের নকশা করা আসন, কাঁসার বগি থালার মাঝখানে পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখা ভাতের স্তূপ, তার ধারে আলু ও বেগুন ভাজা, পাতিলেবুর টুকরো, নুন, দুটো কাচালংকা। থালা ঘিরে চারটি বাটি ও ঢাকা দেওয়া জলের গ্লাস। ধাতব বাসনগুলি ঝকঝকে। সারা ব্যাপারটার যত্ন ও আন্তরিকতা ছড়িয়ে রয়েছে। দেখেই, রবিন্দুর মন প্রসন্ন হয়ে উঠল। বহু বছর পর সে বাবু হয়ে খেতে বসল।
বসেছিলেন অরুণা হাতপাখা নিয়ে, আস্তে আস্তে সেটা নাড়ছেন থালার উপর যদিও কোনো মাছি নেই। তার পাশে দাঁড়িয়ে মোনা। এখানে এসে এই প্রথম রবিন্দু ভালো করে দেখল মোনাকে। লম্বা, ছিপছিপে, দৃঢ় গড়ন। পরিপূর্ণভাবে যৌবনের ফুটে ওঠার জন্য অপেক্ষা করছে দেহ। স্নান করে পরেছে হলুদ ডুরে শাড়ি, ভিজে চুল পিঠে ছড়ানো। চোখে সরু কাজল, খয়েরি টিপ, মুখের গড়ন মায়েরই মতো ডিম্বাকৃতি, নাকটি টিকালো, পায়ের নখে খয়েরি রঙ। দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট কামড়ে সে তাকিয়ে রয়েছে রবিন্দুর মুখের দিকে। চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিল।
‘দিদি ভাত তুলুন, যা দিয়েছেন তাতে আমার দু—বেলার খাওয়া হয়ে যাবে।’
‘সে কী, এই ক—টা ভাত খেতে পারবে না! খুব পারবে।’
অমিয়র পাতেও সমান আকারের স্তূপ। সে ভাত ভেঙে তাতে ডাল ঢালতে ঢালতে বলল, ‘খেয়ে নে খেয়ে নে, না পারিস তো ফেলে রাখবি।’
‘না রে, অমিয়, সত্যি বলছি পারব না। ফেলে নষ্ট করাটা ঠিক হবে না।’
অরুণা চোখের ইশারায় মোনাকে ভাত তুলতে বললেন। একটা ছোটো থালা হাতে সে রবিন্দুর পাতের সামনে ঝুঁকে ছোট্ট মুঠোয় ভাত তুলল। যেন কঠিন দুঃসাধ্য কোনো কাজ তাকে করতে হচ্ছে মুখের ভাব এমনই। মুঠোয় ভাত নিয়ে সে অনুমোদনের জন্য রবিন্দুর মুখের দিকে তাকাল।
