দুজনের কাঁধে ভর দিয়ে একটা একটা করে পা ফেলে নবেন্দু ঘরে এল। ওকে খাটে শুইয়ে দিল রবিন্দু। ছেলেটি যাবার সময় মনে করিয়ে দিয়ে গেল, ‘কালই যেন এক্স রে করা হয়।’
সন্তর্পণে নবেন্দুর পা—টা তুলে তার নীচে বালিশ রাখতে রাখতে মায়া জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ছেলেটি কে?’
‘গোলকিপার খেলে, থাকে দমদমে।’
‘হাবড়ায় কীসের খেলা ছিল?’ পূর্ণেন্দু জানতে চাইলেন।
‘এগজিবিশন ম্যাচ।’
‘মোহনবাগান খেলল?’
‘না। প্রাইমারি স্কুলের ঘর তোলার জন্য এম এল এ—র দলের সঙ্গে জেলা সভাধিপতির দলের খেলা ছিল।’
‘ক্লাবের প্র্যাকটিস তো পয়লা বোশেখের পর শুরু হবে, আর কটা দিনই বা রয়েছে, তাড়াতাড়ি সেরে ওঠা দরকার।’ পূর্ণেন্দুর মুখে চিন্তার মেঘ জমে উঠল। নবেন্দুর মুখের উপর দিয়ে উড়ে গেল হালকা একটা ভয়ের মেঘ।
রাত্রে পাশের খাটে শুয়ে রবিন্দু বলল, ‘এইসব ম্যাচ খেলা তোর উচিত নয় নবু। নিশ্চয় টাকা দিয়েছে?’
ক্ষীণ স্বরে নবেন্দু বলল ‘হ্যাঁ। না হলে যাব কেন খেলতে।’
রবিন্দু টাকার অঙ্কটা জানতে চাইল না। ভর্ৎসনার সুরে বলল, ‘ক—টা টাকার জন্য খারাপ মাঠে খেপ খেলতে নেমে চোট পেয়ে গেলি। টাকা দু—দিনে ফুরিয়ে যাবে, চোটটা দু—দিনে যাবে না।’
‘কাল সকালে আমাকে এক্স—রে করাতে নিয়ে যাবে দাদা?’ নবেন্দুর স্বরে কাতরতা আর ভয় স্পষ্ট ফুটে উঠল।
এক্স—রে রিপোর্টে পাওয়া গেল হেয়ারলাইন ফ্র্যাকচার। ডাক্তার বাঁ পায়ের গোড়ালি আর পাতা প্লাস্টার করে দিলেন। পাঁচ দিন পর অমিয় এল রবিন্দু ছুটি পেয়েছে কি না জানতে। সে জানিয়ে দিল নবেন্দুর এখন সাহায্য দরকার, বাড়িতে শুধু বাবা—মা। ওদের ভরসায় ভাইকে রেখে বর্গাপুরে এখন সে যেতে পারবে না। দ্রুত সেরে ওঠা দরকার নবেন্দুর কেননা আর দু—সপ্তাহ পরেই ক্লাবের প্র্যাকটিস শুরু হবে ওকে মাঠে নামতে হবে।
প্র্যাকটিস শুরু হবার তিন দিন পর নবেন্দু সকালবেলায় মাঠে গেল। ক্লাবের গেটের সামনে ট্যাকসি থেকে নেমে যখন টেন্টের দিকে যাচ্ছে তখন কেউ যদি ওর হাঁটাটা একটু মন দিয়ে লক্ষ করত তা হলে ধরতে পারত নবেন্দু বাঁ—পাটা আলতো করে জমিতে ফেলছে, এখনও সে পুরো সেরে ওঠেনি। কোচকে বলে সে বিশ্রাম নিতে পারে। কিন্তু এই বলাটাকেই সে ভয় পেল। চোট আছে, এই কথাটা চাউর হলে বিপদ, খেলায় সামান্য ত্রুটি ঘটলেই চোটের কথা বলে তাকে সরিয়ে রাখা হবে। টিমে ফিরে আসা তখন কঠিন হয়ে পড়বে। নবেন্দু প্র্যাকটিসে এসে বোঝাতে চাইল চোটটা খুবই সামান্য ছিল, এখন সে ফিট।
নবেন্দু মাঠে যাচ্ছে দেখে রবিন্দু অফিসে ছ—দিনের ছুটি চাইল এবং তা মঞ্জুর হয়ে গেল। অফিস থেকেই সে অমিয়র দোকানে ফোন করে তাকে পেয়ে গেল।
‘সোম থেকে শনি ছ—দিন আর দুটো রোববার মোট আট দিনের ছুটি পেয়েছি। ছুটি শুরু হবে পঁচিশে এপ্রিল রবিবার থেকে, ওই দিনই বর্গাপুর রওনা হলে কেমন হয়?
অমিয় বলল, ‘খুব ভালো হয়। তবে তিন দিনের বেশি আমি থাকতে পারব না, ওখানকার কাজ মিটে গেলেই চলে আসব, এখানে অনেক কাজ হাতে রয়েছে, আমার থাকা দরকার। তুই বর্গাপুরে আট দিনই থেকে থেকে যাস, কোনো অসুবিধে হবে না। থাকে তো মোটে তিনটে লোক, কেউই তোর অপরিচিত নয়। রবু তাহলে পঁচিশে সকাল নটায় হাওড়ায় বড়ো ঘড়ির নীচে থাকিস, ট্রেন নটা সতেরোয়। এই কথা রইল। আমি দিদিকে কালই খবর পাঠাচ্ছি।’
.
রাতে খাওয়ার পর ঘরে শুতে এসে রবিন্দু দেখল বিছানায় চিত হয়ে নবু বাংলা কমিকস পড়ছে। ছবিওলা বাচ্চচাদের বই পড়তে ভালোবাসে। পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে গোছা করে এই বইগুলো কিনে আনে। রবিন্দু একদিন বলেছিল ‘কী সব হাবিজাবি বই পড়িস, ভালো বই পড়তে পারিস না! পথের পাঁচালি পড়।’ নবু বলেছিল ‘দেখা হয়ে গেছে।’ এরপর ভেবেচিন্তে রবিন্দু বলে, ‘আবোল তাবোলও তো পড়তে পারিস।’ উত্তর পেয়েছিল ‘পাউরুটি আর ঝোলাগুড় তো, স্কুলে পড়েছি।’ রবিন্দু আর কখনো নবুকে ভালো বই পড়তে বলেনি।
আজ সে বলল, ‘তোর একটা বগলে ঝোলানর বড়ো নাইলনের ব্যাগ এক সপ্তাহের জন্য আমায় দিতে পারিস?’
‘কী জন্য, কোথাও যাবে?’
‘অমিয়দের দেশের বাড়িতে যাব। সুটকেস নেওয়ায় হ্যাঙ্গামা অনেক লোকাল ট্রেনে, বাসে।’
‘ওটা নিয়ে যাও’ নবেন্দু আঙুল দিয়ে মেঝেয় পড়ে থাকা দেড় হাত লম্বা, চেইন দেওয়া ব্যাগটা দেখাল। ‘নোংরা করো না যেন।’
সেই ব্যাগ বগলে ঝুলিয়ে রবিবার সকাল নটায় রবিন্দু হাওড়া স্টেশনে পৌঁছে দেখল অমিয় বর্ধমান লোকালের টিকিট কেটে অপেক্ষা করছে। তাকে দেখেই তাড়া দিল অমিয়, ‘তাড়াতাড়ি চল নয়তো বসার জায়গা পাবি না, সরকারি অফিসের বাবুরা এই ট্রেনটা ধরে।’
‘এই ট্রেনে গেলে তো অফিসে লেট হয়ে যাবে।’ রবিন্দু অবাক সুরে বলল।
‘লেটই যদি না হল তাহলে সরকারিবাবু হবে কী করে? সরকারি অফিসে তো চাকরি করিস না বুঝবি কী করে!’
মিনিট পনেরো লেট করে ট্রেন তালান্ডু স্টেশনে পৌঁছল। ভ্যান রিকশা চেপে অমিয়দের বাড়ি পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে এগারোটা বেজে গেল।
.
.
ছয়
পুরোনো দোতলা বাড়ি। মানুষসমান উঁচু পাঁচিলে ঘেরা। আলকাতরা মাখানো কাঠের দরজা দিয়ে ঢুকেই মাটির উঠোন। তার প্রান্তে একটা মরাই। তার পিছনে খড়ের চাল দেওয়া উঁচু মাটির ঘরে রান্না হয়। তার পাশে টিউবওয়েল, দেওয়াল ঘেরা টালির চাল দেওয়া স্নানের জায়গা। একটা ঘোড়া নিমগাছ, তুলসীমঞ্চ, আর রান্নাঘরের চালে চালকুমড়ো, পাঁচিল ঘেঁষে কয়েকটা নয়নতারা ছাড়া উঠোনে আর কোনো গাছ নেই। উঠোনের ডান দিকে উঁচু টানা চওড়া রক। চারটে সিঁড়ি ভেঙে রকে উঠে বাড়িতে ঢুকতে হয়। ঢুকেই রকের সমান্তরাল টানা দাওয়া। লাগোয়া তিনটে ঘর আর উপরে ওঠার সিঁড়ি। দাওয়ার ঠিক উপরে দোতলায় দক্ষিণে টানা রেলিং দেওয়া বারান্দা, কাঠের খুঁটির উপর টালি দিয়ে বারান্দাটা ঢাকা। দোতলায় বড়ো দুটি ঘর।
