অমিয় অনেক আশা নিয়ে ওদের দু—জনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। পূর্ণেন্দুর মুখের উপর আবেগ ঘোরাফেরা করছে, মায়ার মুখও অল্পবিস্তর নরম।
‘অমিয় তোমার ভাগনিকে দেখাবার ব্যবস্থা কর, আমাদের জন্য নয়, রবুর জন্য। আগে ও দেখুক।’ পূর্ণেন্দু গম্ভীর স্বরে কর্তৃত্ব ভরা গলায় বললেন, মায়ার দিকে না তাকিয়ে, মায়া বুঝে গেলেন এখন চুপ করে থাকতে হবে।
পূর্ণেন্দু কপালে আঙুলের টোকা দিতে দিতে বললেন, বিয়ে করার জন্য মেয়ে দেখছি এভাবে নয়, তাহলে মনটা আগে থেকেই সমালোচকের মতো তৈরি হয়ে থাকে খুঁত ধরার জন্য, তখন ভুলে যায়, খুঁত মানুষমাত্রেরই আছে। এই ভুলটাই তখন ঘটে, পাঁচ মিনিটেই বিচার করে ফেলে। তার থেকে তোমার ভাগনিকে রবু দেখুক কিছু না জেনেই।’ পূর্ণেন্দু ভেজানো দরজার দিকে সন্তর্পণে তাকিয়ে গলা নামিয়ে নিলেন, ‘ওকে বরং তোমাদের বাড়িতে একদিন নেমন্তন্ন কর, ভাগনি খাবারটাবার পরিবেশন করুক, মামার বন্ধুর সঙ্গে কথাবার্তা বলুক, একটা ঘরোয়া স্বাভাবিক পরিবেশে দু—জনে দু—জনকে দেখুক কিছু না জেনেই। মেয়েরও একটা পছন্দ—অপছন্দ আছে এটাও মান্য করা উচিত, কী বলো?’
সদর দরজা বন্ধ করার শব্দ এল, রবিন্দু এখন ঘরে আসবে। ওরা কথা থামিয়ে রাখলেন। রবিন্দু চেয়ারটা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল। মুখে বিরক্তি।
‘টেনেটুনে পাশটা হয়তো করে যাবে। একদম খাটে না, এতদিন ফাঁকি দিয়ে এসে পরীক্ষার দু—দিন আগে বই খাতা নিয়ে বসলে আমি কী করতে পারি!’ রবিন্দু গজগজানি থামিয়ে অমিয়কে বলল, ‘তোদের দোকানে দু—দিন ফোন করেছিলুম তোকে পাইনি। খুব ব্যস্ত থাকিস মনে হচ্ছে।’
‘ঘুরে বেরিয়ে কাজ দেখতে হয়। দোকানে কম সময়ই থাকি। এই দেখনা এদিকে কাজ শুরু করেছি বলে তাই আসার সময় আর সুযোগ পেলুম। দেশ থেকে দিদি চিঠি পাঠিয়েছে ভাগনের হাত দিয়ে, যে লোকটার উপর বর্গা চাষের দায়িত্ব দেওয়া ছিল সে হঠাৎ আন্ত্রিকে মরে গিয়ে গন্ডগোল পাকিয়েছে, যেতে হবে আমাকে। চল না আমার সঙ্গে তিন—চারটে দিন বর্গাপুরে কাটিয়ে আসবি। সাত বছর আগে তো আমার সঙ্গে একবার গেছলি। দিদির হাতের এঁচোড়ের ডালনা আর মৌরলামাছের অম্বল খেয়ে কী বলেছিলিস মনে আছে? আবার খেতে আসব বলে আর তো গেলি না, দিদি অনেকবার তোর কথা বলেছিল, ছেলেটি বড়ো শান্ত, ছেলেটির স্বভাবটি খুব মিষ্টি, দেখতে খুব সুন্দর।’ অমিয় হেসে উঠল।
রবিন্দু মুখ নীচু করে নিল লজ্জায়। ফর্সা গালে টোল পড়ল। পাতলা গোলাপি অধর দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরল। গভীর চাহনির টানা চোখ দুটি তুলে বলল, ‘সত্যিই আমার অনেকবার ইচ্ছে করেছিল যাওয়ার। শুধু দিদির হাতের রান্না খাওয়ার জন্যই নয়, গ্রাম দেখতে আমার ভালো লাগে। আমাকে সঙ্গে নিয়ে গ্রামটা ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল তোর ভাগনি, কী যেন নামটা?’
‘মোনা।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ মোনা। বিশাল একটা বাঁশবন, ইটের ভাঁটি, বিশাল একটা দিঘি তাতে হাজার খানেক পদ্মগাছ আর ধানখেত ধু ধু করছে, প্রায় মাইল দেড়—দুই তারপর একটা গ্রাম। ধানকাটা চলছে, তখনও অনেক জমিতে ধান রয়ে গেছে। শীতকাল ছিল বোধহয় জানুয়ারির শেষাশেষি, অল্প অল্প ঠান্ডা বাতাস, রোদ্দুরটা যে কী ভালো লাগছিল! অমিয়, ভাবলে সত্যিই মন কেমন করে।’
‘শীতকালে গেছিস এবার বর্ষার শুরুতে চল। ভাগ্যে থাকলে গ্রামের বৃষ্টি দেখতে পাবি। আমাদের আমবাগানটা তো দেখেছিস, ভালো হিমসাগর হয়েছে, খাবি।’ অমিয় রবিন্দুর গ্রামপ্রীতিটা উসকে দেবার জন্য কথাগুলো বলে পূর্ণেন্দুর দিকে তাকিয়ে এমনভাবে মাথাটা হেলাল, যার দ্বারা সে বলতে চাইল, মেসোমশাই রবু যাচ্ছে।
‘তোর ভাগনে ভাগনিরা কত বড়ো হয়েছে?’
‘সাত বছরে যত বড়ো হওয়া উচিত তত বড়োই হয়েছে। মোনা এখন রীতিমতো তরুণী, দেখলে চিনতে পারবি না, ক্লাস টুয়েলভে পড়ে আর বাবু ক্লাস সিক্সে। কবে যাবি বল?
‘যাব বললেই কী দুম করে যাওয়া যায়। তোর মতো ব্যবসা তো করি না, চাকরি করার অনেক ফ্যাসাদ। ছুটি চাইতে হবে, যদি তেমন কাজকর্ম না থাকে তাহলে ছুটি পাব।’
‘আমি তো এদিকে আসছিই, চার—পাঁচ দিন পরে এসে খোঁজ নেব।’ অমিয় উঠে দাঁড়াল। ‘দিন সাতেকের জন্য ছুটি নে।’
অমিয় চলে যাবার মিনিট পাঁচেক পরই নবেন্দু ফিরল একটা মোটরবাইকের পিছনে বসে। পূর্ণেন্দু বারান্দায় বেরোলেন বাইকের ইঞ্জিনের শব্দে। দেখলেন সন্তর্পণে নবু নামল। বাঁ পা ফেলেই ঝুঁকে পড়ল। বাইকটাকে স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে অল্পবয়সি চালক নবুর পাশে গিয়ে ওর একটা হাত নিজের কাঁধে রেখে বলল, ‘হাঁটতে পারবি?’
কাঁধে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে নবু ফ্ল্যাটের দরজায় এল। তার আগেই দরজা খুলে পূর্ণেন্দু আর রবিন্দু দাঁড়িয়ে।
‘কী হয়েছে?’ পূর্ণেন্দু উদবিগ্ন চোখে তাকালেন।
নবেন্দুর সঙ্গের ছেলেটি বলল, ‘অ্যাঙ্কেলটা টুইস্ট করে গেছে, মাঠটা খুব বাজে ছিল। হাবড়াতেই ডাক্তার দেখান হয়েছে। মলম মাখিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিয়েছেন আর বলেছেন কালকেই যেন এক্স—রে করে দেখা হয়। হাঁটাচলা যেন একদম না করে, পা—টাকে রেস্টে রাখতে হবে। এখনও ব্যথা করছে?’ ছেলেটি নবেন্দুকে জিজ্ঞাসা করল।
নবেন্দু মুখ বিকৃত করে বলল, ‘করছে।’
রবিন্দু এবার ওর একটা হাত নিজের কাঁধে তুলে নিল, অন্য হাতটা পূর্ণেন্দু কাঁধে নিতেই ছেলেটি তাড়াতাড়ি বলে উঠল, ‘আপনি ছাড়ুন, আমি ধরছি।’ পূর্ণেন্দু সরে দাঁড়ালেন।
