‘আমার এক পুরোনো বন্ধু এসেছে।’
‘তাহলে আমি এখন যাই।’
‘না না বোসো, পরীক্ষার তো আর এক মাসও বাকি নেই। তুমি বরং খাওয়ার টেবলে বোসো।’
রবিন্দু ঘরে বসে অমিয়কে বলল, ‘মিনিট পনেরো একটু বোস, পড়তে এসেছে সামনেই পরীক্ষা।’
রবিন্দু চেয়ারটা তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা ভেজিয়ে দিল। অমিয় জিজ্ঞাসু চোখে মায়ার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছাত্রী?’
মায়া বললেন, ‘কুটুম, ছায়ার ননদ এই হাউজিংয়েই থাকে।’ তারপর গলা নামিয়ে ফিসফিস করে জুড়ে দিলেন, ‘ছায়ার শাশুড়ি রবুর সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে, নানান টোপ ফেলে যাচ্ছে। রবুও গিলছে না আমরাও গিলছি না।’
পূর্ণেন্দু বললেন, ‘বিয়ের কোনো প্রশ্নই ওঠে না।’
গুরুতর বিষয়ে আলোচনার মতো স্বরে অমিয় বলল, ‘যদি বলেন তো রবুর জন্য পাত্রী আমি দেখতে পারি।’
দুজনেরই ভ্রূ কুঁচকে উঠল, পূর্ণেন্দু বললেন, ‘তোমার হাতে আছে নাকি?’
‘আছে, তবে বদ্যি নয়, চলবে?’
‘কেন চলবে না।’ মায়া কিছু বলে ওঠার আগেই পূর্ণেন্দু তাড়াতাড়ি বললেন, ‘বিজ্ঞাপনের ভাষায় যা সব লেখা হয়—শান্ত, কোমলস্বভাবা, গৃহকর্মনিপুণা, সুমুখশ্রী, গৌরবর্ণা, স্বাস্থ্যবতী, পাঁচফুট তিন ইঞ্চি, বিএ পাশ, বয়স তেইশ—চব্বিশ হলেই চলবে।’
‘মেসোমশাই বোধহয় খবরের কাগজের পাত্র—পাত্রী কলাম খুব পড়ছেন।’
‘সমাজের শিক্ষিতরা জাত—গোত্রের সংস্কারে এখনও যে কতটা আচ্ছন্ন সেটা বোঝার সেরা উপায় হল পাত্রপাত্রী কলামে চোখ বোলানো। তোমার মনে হবে একশো বছর আগের খবরের কাগজ পড়ছি। এই দেখো না—’পূর্ণেন্দু তার পাশেই সোফার উপর পড়ে থাকা ভাঁজ করা খবরের কাগজটা মুখের সামনে ধরে বললেন, ‘শুধু একটা কলামেই কতগুলো গোত্রের নাম পেলুম জান? শাণ্ডিল্য, গৌতম, মউদগল্য, কাশ্যপ, ব্যাসঋষি, আলিম্মান, অবৎস্য।’ সাতটা, প্রত্যেকটা বিজ্ঞাপনে পাত্র বা পাত্রী পূর্ববঙ্গের না পশ্চিমবঙ্গের তাও বলা আছে। এটা বলার কি কোনো দরকার আছে? লেখাপড়া জানা উচ্চচবর্ণের বাঙালি হিন্দুরা সাবেকি রীতির পিছু পিছু অন্ধের মতো এখনও চলেছে। সেকেলে চিন্তাধারার কিছু বদলায়নি। অথচ আধুনিক কবিতা, গল্প—উপন্যাস, ফিল্ম, পেইন্টিং, নাটক তৈরি হচ্ছে, লেখা হচ্ছে, এসব পড়ে বা দেখে কতজন?’ পূর্ণেন্দু উত্তরের জন্য অমিয়র দিকে তাকিয়ে রইলেন।
‘শতকরা পাঁচজনও নয়।’ অমিয় নির্বিকার মুখে বলল।
মায়া অধৈর্য হয়ে পড়েছেন, পূর্ণেন্দুর কথাগুলো শুনতে শুনতে বললেন, ‘তোমার বকবকানি থামাও তো। অমিয় যা বলেছিলে বল, মেয়েটি বদ্যি নয়, তাহলে কী জাত?’
‘বামুন।’
মায়ার মুখে স্বস্তি ফুটে উঠল।
‘মেয়েটির বাবা নেই। বিধবা মা, দাদা আর ছোটোভাই, অবস্থা ভালো নয়, থাকে গ্রামে।’ এই পর্যন্ত বলে অমিয় আর বলবে কিনা জানার জন্য দুজনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে লাগল।
পূর্ণেন্দু বললেন, ‘গরিবঘরের মেয়েতে আপত্তি নেই।’
মায়া বললেন, ‘দেখতে শুনতে কেমন, পড়াশুনো কদ্দুর?’
অমিয় বুঝল এরা শুনতে অনাগ্রহী নয়। ভেজানো দরজার ওধারে রবিন্দু এই ঘরের কথাবার্তা শুনতে পাচ্ছে না, এটা ধরে নিয়ে সে বলল, ‘মেসোমশাই বিজ্ঞাপনের পাত্রীর যে বর্ণনা দিলেন তার মধ্যে মাত্র দু—তিনটির সঙ্গে মিল এই পাত্রীর রয়েছে যেমন সুমুখুশ্রী, গৃহকর্মে নিপুণা, স্বাস্থ্যবতী তবে মোটা বা আলগা গড়ন নয়, ছিপছিপে। মিলছে না যেগুলোর সঙ্গে, শান্ত কোমলস্বভাবা নয়, ছটফটে, সাহসী, ডানপিটে ভদ্র—সভ্য নম্র, ফরসা নয় কালো, পাঁচ ফুট ছয় ইঞ্চি বাঙালি মেয়ের পক্ষে বেশ লম্বাই, বিএ পাশ নয় উচ্চচমাধ্যমিক পরীক্ষা সামনের বার দেবে, বয়স তেইশ—চব্বিশ নয় আঠারো—উনিশ।’
পূর্ণেন্দু বললেন, ‘রবুর সঙ্গে বয়সের পার্থক্য অনেক, বারো—তেরো বছরের।’ মায়া হালকা প্রতিবাদ করলেন, ‘হোক অনেক, আমার ঠাকুমার থেকে ঠাকুরদা বাইশ বছরের বড়ো ছিলেন। মেয়ে কালো বললে, কতটা কালো?’
‘কয়লার মতো নয়, বলতে পারেন, বেলে মাটির মতো। ছেলে হলে ওটা কালো গন্য হবে না।’
মায়া স্বামীকে প্রশ্ন করলেন, ‘পাঁচ ফুট ছ—ইঞ্চিটা কতখানি হবে বল তো?’
পূর্ণেন্দু ডান হাতের বুড়ো আঙুল ও তর্জনী খানিকটা ফাঁক করে তুলে ধরে বললেন, ‘তোমার থেকে এতটা লম্বা।’
মায়া চোখ সরু করে আন্দাজ করতে করতে বললেন, ‘রবুর কাছাকাছি হবে।’
পূর্ণেন্দুর মনে ধরে গেছে মেয়েটি সাহসী ডানপিটে শুনে, বললেন, ‘মেয়েদের লম্বা হওয়াটা খারাপ নয়, ছেলেপুলেরাও লম্বা হবে।’
‘অমিয় বামুন বললে, কোন শ্রেণির?’ মায়া আবার জেরা শুরু করলেন।
‘শ্রেণিট্রেনি তো বুঝি না জানিও না তবে চাটুজ্জে।’
‘তুমি কতটা চেনো?’ মায়ার প্রশ্ন।
‘জন্ম থেকেই। মেয়েটি আমার ভাগনি, আপন দিদির মেয়ে।’
ঘরের মধ্যে বোমা ফাটল যেন। ওরা দুজন স্তম্ভিত হয়ে রইলেন। অমিয় এটাই আশা করেছিল। হাসি পেলেও সে মায়ার মুখ দেখে উৎকণ্ঠিত হল।
‘দিদি শ্যামবাজারে শ্যামল চ্যাটার্জির কাছে গান শিখতে যেন। তিনিই ওকে বিয়ে করেন, জাত নিয়ে জামাইবাবুর বাড়িতে আপত্তি উঠেছিল। উনি তা অগ্রাহ্য করে দিদিকে রেজেস্ট্রি বিয়ে করেছেন। বিয়ের দশ বছর পর ক্যানসারে মারা যান। বড়ো, একান্নবর্তী পরিবার, ওর রোজগার অন্যদের তুলনায় কমই ছিল। আধুনিক গানের দু—খানা রেকর্ড করেছিলেন, বিক্রি হয়নি। চিকিৎসা করতে গিয়ে দিদির সব গয়না বিক্রি করতে হয়। তারপর থেকেই বড়ো ভাসুর আর তার পরিবার দিদিদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার শুরু করে, নানাভাবে চাপ দিতে থাকে যাতে অতিষ্ঠ হয়ে বাড়ির অংশ ভাসুরকে বিক্রি করে চলে যায়। একটা মেয়ে আর দুটো ছেলে সবাই বাচ্চচা, তাদের নিয়ে কপর্দকশূন্য অবস্থায় দিদির বাস করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। তখন আমার বাবাই বললেন, থাকতে হবে না ওখানে বাড়ির অংশ বেচে দিয়ে বর্গাপুরে গিয়ে থাক। আমিই তোকে দেখব। আমি মরে গেলে ভাইয়েরা তোকে দেখবে। আঠারো হাজার টাকায় দিদি তার ভাগের অংশ বিক্রি করে শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে চলে আসে আমাদের দেশের বাড়ি বর্গাপুরে। টাকাটা বাবা ফিক্সড করে দিয়েছে বর্গাপুরে পোস্ট অফিসে আর দশ বিঘে ধেনোজমি লিখে দিয়েছেন দিদির নামে, একটা দেড় বিঘের পুকুর আছে, তার জমা দেওয়ার টাকা আমরা নিই না, দিদিই পায়, ছোটো একটা আমবাগান আছে সেটারও জমা দেওয়ার টাকা আমরা দিদিকেই দিই। বাবা বড়ো নাতিটাকে কলকাতায় নিজের কাছে এনে রাখেন লেখাপড়া করাতে। বিএ পাশ করে এখন সে আমার ব্যবসায় আমার ডান হাত হয়ে কাজ করছে। মাসিমা এই হল পাত্রীর পরিচয়। মোনার আর্ধেকটা ব্রাহ্মণ আর্ধেকটা কৈবর্ত। এতে কী আপনাদের আপত্তি হবে? রবুকে জানি বলেই প্রস্তাবটা দিলুম, মোনা আমাদের ফ্যামিলির আদরের নাতনি, সে সুখী হোক এটাই আমি চাই।’
