‘নিশ্চয় মিরাকল, ইন্ডিয়ার ওয়ার্ল্ড কাপ জেতার মতো।’ অমিয় প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎসাহ দেখিয়ে বলল, ‘ম্যান অফ দ্য ম্যাচ কাকে বলবেন?’
‘তোমার মাসিমা।’
তখন ট্রেতে চায়ের কাপ আর পাঁপর ভাজা নিয়ে মায়া ঘরে ঢুকলেন।
‘আমার কথা যেন হচ্ছে মনে হল।’
‘ছায়ার বিয়েটাকে অমিয় ওয়ার্ল্ড কাপ জেতার মতো বলল। আমি বললুম ম্যান অব দ্য ম্যাচ তোমার মাসিমা।’ পূর্ণেন্দু নিঃশব্দে হেসে একটা পাঁপড় তুলে নিয়ে বললেন, ‘অমিয় শুরু করো।’
মায়া বিব্রত স্বরে অমিয়কে বললেন, ‘এত তাড়াহুড়োয় বিয়েটা হল যে সবাইকে নেমন্তন্ন করা গেল না।’
অমিয় কথাটা না শোনার ভান করে বলল, ‘মাসিমা এই পা নিয়ে কষ্ট করে রান্না ঘরে যাচ্ছেন কেন, একটা রাঁধুনি রাখলেই তো পারতেন, কত আর খরচ? আড়াইশো বড়োজোর তিনশো।’
‘ব্যাপারটা তো খরচের নয় পারিবারিক রীতির। এনাদের আবার বাইরের লোকের হাতে রান্না মুখে রোচে না।’ মায়া ঠোঁট মুচড়ে স্বামীকে আঙুল দিয়ে দেখালেন। ‘তাই বাড়ির মেয়ে—বউয়েদের দিয়ে রাঁধান। এই রীতি নাকি ঠাকুরদার বাবার আমল থেকে চলে আসছে। কত শিক্ষিত শিক্ষিত ছেলে তো এদের বংশে জন্মেছে কেউ কিন্তু মেয়েদের মুখ চেয়ে এই রীতিটা ভাঙার চেষ্টা করেনি, ইনিও সেই দলের।’ মায়া আবার আঙুলটা স্বামীর দিকে তুলে দেখালেন। অমিয় বুঝতে পারল মায়ার অভিযোগের আড়ালে প্রশ্রয় রয়েছে।
‘আসলে কী জান অমিয়, তোমার মাসিমার হাতের রান্না একবার খেলে অন্য কারুর রান্না আর মুখে দেওয়া যায় না। যদি উনি চান তাহলে আমি রীতি ভাঙতে রাজি আছি।’ পূর্ণেন্দু ঠোঁট টিপে তেরছা চোখে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
‘থাক থাক এই বুড়ো বয়সে রীতি ভেঙে আর কাজ নেই। মায়ার কথার মধ্যে তিক্ততা আর পরিহাস দুটোই রয়েছে।
‘মাসিমা ঠিকই বলেছেন, রীতি ভাঙতে যাবেন কেন। ওনার এখন কষ্ট হয়। রবুর বিয়ে দিন, রান্নাঘরটা ছেড়ে দিন বউমার হাতে, প্রবলেম সলভড!’ অমিয় দুটো কাঁধ তুলে সমস্যার ফয়শালা বুঝিয়ে দিল, দুই প্রৌঢ়র মুখের ভাব সে লক্ষ করল। সেখানে দ্বিধা জড়িত অনুমোদন।
‘কিন্তু রবু কী এখন বিয়ে করতে রাজি হবে?’ পূর্ণেন্দু সন্দেহ প্রকাশ করলেন।
‘রাজি না হবার কী আছে। বয়স বত্রিশ—তেত্রিশ তো হল, আর কবে বিয়ে করবে?’
‘একটা রিজনেবল লেভেলে রোজগার না হলে কী বিয়ে করা যায়? রবু বলেছিল মাসে হাজার পাঁচেক আয় করতে পারলে আর নবু বাড়ি করে চলে গেলে তখন বিয়ের কথা ভাববে।’
অমিয় অবাক হয়ে বলল ‘কিন্তু আপনি যে এইমাত্র বললেন নবু এখন বাড়ি করবে না, হাতে লাখ দুয়েক জমলে তখন করবে।’
‘রবু বলেছিল অনেকদিন আগে তখন নবু বাড়ি করবে বলেছিল, তার পর মত বদলায়। আমি ওকে বলি তুই কোথাও বাসভাড়া করে থাক না। তাইতে নবু বলে ক্লাব থেকে যে টাকা পাই তাই দিয়ে বাসভাড়া করে থাকতে পারব বটে কিন্তু যদি কোনো কারণে ক্লাব খারাপ ব্যবহার শুরু করে, যদি টাকা আটকে দেয়, লিখিত তো নয় সবই মৌখিক চুক্তি। প্রথম সিজনটা নবু খুব ভালো খেলে টিমে জায়গা করে নেয়, পরের বছর তত ভালো খেলতে পারেনি, পরপর ছটা ম্যাচে গোল পায়নি, ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে ভাইটাল ম্যাচে দুটো প্রায় ওপেন নেট মিস করে। ওকে বসিয়ে দেওয়ার কথা উঠেছিল। নবু সেই যে তখন নিজের ওপর আস্থা হারাল আজও তা উদ্ধার করতে পারেনি।’
পূর্ণেন্দুর কথায় সুর থেকে অমিয়র কানে ধরা পড়ল এই পরিবারের জীবনযাপনের মধ্যে অসঙ্গতি এবং সেটা শুধুই নবুর ফুটবল কেরিয়ারকে উপলক্ষ্য করে, নবু যেমন চাপের মধ্যে রয়েছে তেমনি এই দুই প্রৌঢ়, হয়তো রবুও।
‘মাসিমা আপনি কতদিন আর কষ্ট করে এ ভাবে রান্না করে সংসার দেখাশোনা করবেন? আপনার তো এখন বিশ্রাম নেবার কথা। মেসোমশাই আপনাদের পারিবারিক ঐতিহ্য ছেড়ে এবার বেরিয়ে আসুন, একটা রাঁধুনি আর নয়তো রবুর বিয়ে দিয়ে একটা বৌমা আনুন।’
পূর্ণেন্দু সিধে হয়ে বসে গলা চড়িয়ে বললেন, ‘আমি তো বলেছি রাঁধুনি রাখো। কিন্তু এই উনি—’ তিনি আঙুল তুললেন মায়ার দিকে আর তখনই দরজায় বেল বাজল। অমিয় দ্রুত উঠে গিয়ে দরজা খুলল। রবিন্দু দাঁড়িয়ে। অমিয়কে দেখে বিস্ময়ে তার ভ্রূ উঠে গেল।
অমিয় বলল, ‘আয়, তোর কথাই হচ্ছিল।’
‘এতদিন পর এলি আমার কথা বলার জন্য!’ রবিন্দু ঘরে এসে বসার জায়গা না পেয়ে খাওয়ার টেবিলের একটা চেয়ার নিয়ে এল।
‘তুই বিয়ে করছিস না কেন? মাসিমার কষ্ট কী তার চোখে পড়ে না?’
রবিন্দুর হাসি মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। চোখ কুঁচকে মায়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা আমি করিনি। বিয়ে করে থাকব কোথায়?’
অমিয় সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল, ‘কেন, এই ফ্ল্যাটে।’
‘নবু তাহলে থাকবে কোথায় আর বাবা মা? ঘর তো মোটে দুটো!’
‘তুই বিয়ে করবি বল, নবুর থাকার ব্যবস্থা আমাদের গড়িয়ার নতুন বাড়িতে করে দোব। ব্যাচিলার, একটা ঘর হলেই তো চলে যাবে, কোনো অসুবিধে হবে না থাকতে। নবু নিশ্চয় দাদার মুখ চেয়ে রাজি হয়ে যাবে। তার আগে তুই বল, তুই রাজি?’
দরজায় বেল বাজল, রবিন্দু উঠে গিয়ে দরজা খুলল। ঘর থেকে ওঁরা শুনতে পেলেন একটি মেয়ের গলা, ‘জানলা থেকে দেখলুম আপনি ফিরছেন তাই ভাবলুম অঙ্কটা একটু ঝালিয়ে নিয়ে আসি। আপনি কী খুব ব্যস্ত?
