মায়া খুশি হয়ে বললেন, ‘অমিয় চা খাবে?’
‘এই একটা নেশা, কখনো না বলতে পারি না। দিনে বারো—চোদ্দো কাপ হয়ে যায়।’
মায়া সোফা থেকে উঠতে গিয়ে ‘আহহ’ বলে হাঁটু ধরে আবার বসে পড়লেন। ‘ব্যথাটা সকাল থেকে আবার চাগিয়েছে। কাজের মেয়েটা এই একটু আগে চলে গেল, থাকলে চা—টা করে দিত।’
‘আপনাকে ব্যস্ত হতে হবে না মাসিমা, চা না খেলেও এখন চলবে।’
‘এই একটা রোগ মানুষকে অথর্ব করে দেয়।’ মায়া চেষ্টা করে এবার উঠে দাঁড়ালেন, ‘তুমি বোসো অমিয় অনেকদিন পর এলে, এক কাপ চা অন্তত খেয়ে যাও।’
মায়া ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর অমিয় বলল, ‘মেসোমশায়ের এখন সময় কাটছে কেমন করে?’
‘টিভি দেখে। অখাদ্য প্রোগ্রাম, যা দেখায় সেটাই গিলতে হয়। মনোপলির এই এক ঝামেলা, কম্পিটিটার নেই ফলে উন্নতির কোনো চেষ্টাও নেই।’
পূর্ণেন্দুর কথা শেষ হওয়া মাত্রই বিকট শব্দে বাইরের মাঠে একটা পটকা ফাটল। তিনি উঠে গিয়ে জানলার পর্দা সরিয়ে দেখে ফিরে এলেন।
‘বোধহয় একটা রয়ে গেছল সেটাই ফাটাল। দুদিন ধরে যা হল, কান ঝালাপালা করে দিয়েছিল। টিভি—তে দেখলুম, অমিয় তুমি দেখেছ? কপিল কী ক্যাচটাই নিল ভিভ রিচার্ডসের!’
‘ক্যাচ বলে ক্যাচ! পনেরো কুড়ি গজ পিছনে ছুটে গিয়ে ওইভাবে ধরা! ম্যাচটাতো তখনই ঘুরে গেল। ভিভ থাকলে একশো তিরাশি তো হেসে খেলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ তুলে নিত।’ অমিয় চেয়ারের কিনারে এগিয়ে এল উত্তেজিত হয়ে।
‘তুমি বলছ ম্যাচের ওটাই টার্নিং পয়েন্ট? কিন্তু জিম্বাবোয়ের এগেনস্টে যে ইনিংসটা কপিল খেলল তাকে কী বলবে? ওটা তো সারা টুর্নামেন্টের টার্নিং পয়েন্ট!’
‘হান্ড্রেড পারসেন্ট একমত আপনার সঙ্গে। টার্ন ব্রিজ ওয়েলসে ওইরকম ব্যাটিং…সতেরো রানে পাঁচটা উইকেট পড়ে গেছে—’।
‘অমিয় কথাটা টার্ন নয় টান, টান ব্রিজ ওয়েলস।’
পলকের জন্য অমিয়র মুখ থেকে রক্ত সরে গেল। সামলে নিয়ে সপ্রতিভ ভাবে লঘু স্বরে সে বলল, ‘এই আমার বড়ো ঘাটতি মেসোমশাই, ইংরিজি উচ্চচারণটা ঠিকঠাক হয়না, পেস বোলিংটা স্পেস বোলিং হয়ে যায়, ডাইভ হয়ে যায় ড্রাইভ।’ কথা শেষে সে বোকার মতো হাসল।
‘এই যে ভুল উচ্চচারণের কথা বললে, এর বড়ো কারণ শব্দগুলো যখন পড় তখন বানানটা লক্ষ করোনা। অভ্যাসটা ছোটোবেলা থেকে তৈরি হয়ে গেছে। এই যে ইন্ডিয়ান ব্যাটসম্যানদের অফ স্টাম্পের বাইরে ব্যাট বাড়িয়ে স্লিপে ক্যাচ দেওয়া, এটাও সেই অভ্যাসের ব্যাপার।’ অধ্যক্ষ পূর্ণেন্দু গুপ্তকে বহুদিন পর যেন ফিরে পেলেন পূর্ণেন্দু। ক্লাসে এই ভঙ্গিতেই ছাত্রদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিতেন।
‘মেসোমশাই, সত্যিকারের একটা ফাস্ট বোলার নেই, একটা স্পিনার নেই, তা সত্ত্বেও লয়েডের টিমকে একশো চল্লিশ রানে শেষ করে দেওয়াটা স্রেফ মিরাকল।’
পূর্ণেন্দু বহুদিন পর ক্রিকেট নিয়ে কথা বলারও শ্রোতা পাওয়ার সুযোগ পেয়ে সুদীপ্ত হয়ে উঠলেন। নবুর সঙ্গে ফুটবল ছাড়া আর কিছু নিয়ে কথা বলা যায় না, রবুর কোনো খেলাই পছন্দ নয়, মায়ার কাছে বিশ্বকাপের থেকে চায়ের কাপ অনেক মূল্যবান।
‘অমিয় ওই জয়টা মিরাকল বা ফ্লুক বলতে পার কিন্তু দ্বিতীয়বার এটা ঘটবে না, এ জিনিস একবারই হয়। খবরের কাগজটা মন দিয়ে যদি পড়তে তাহলে একটা খবর তোমার চোখে পড়ত, এবার ইংল্যান্ডে সিজনের গোড়ায় খুব বৃষ্টি হয়েছিল। মাঠ, পিচ ভিজে ছিল, আবহাওয়াও স্যাঁতসেঁতে, উইকেট স্লো, বল যতটা সীম করে তার থেকেও বেশি করেছে। এই রকম কন্ডিশনে মারাত্মক হয়ে ওঠে সেই সব মিডিয়াম পেসারেরা যাদের লেংথ, লাইন আর সুইংয়ের ওপর ওস্তাদি আছে, ইন্ডিয়ান বোলারদের তা ছিল, ঠ্যাঙাড়ে ব্যাটসম্যানদের ঠান্ডা করে দেওয়ার মতো আইডিয়াল কন্ডিশন আমাদের বোলাররা পেয়ে গেছল। আমার কথার পয়েন্টটা কী তুমি ধরতে পারছ?’ পূর্ণেন্দু উৎসুক চোখে তাকিয়ে থাকলেন।
‘বরাত জোরে আমরা জিতেছি।’ অমিয় একটি বাক্যে সার কথাটা বলে দিল।
‘আর কমাস পরেই তো ওরা ভারতে ট্যুর করতে আসছে। দেখো ইন্ডিয়ান কন্ডিশনে কী হয়, দুরমুস করে দিয়ে যাবে।’ পূর্ণেন্দু প্রত্যয় ভরে বললেন।
অমিয় মাথা নেড়ে বলল, ‘আপনি এত নেগেটিভ চিন্তা করছেন কেন, আমরা তো ওদের হারাতেও পারি।’
পূর্ণেন্দু স্থির চোখে সামনে বসা উদীয়মান ব্যবসায়ীটিকে লক্ষ্য করতে করতে বললেন, ‘নেগেটিভ চিন্তা নয় এটা হল যুক্তিযুক্ত বিবেচনা প্রসূত ধারণা, নানান দিক দেখে একটা সিদ্ধান্তে আসা। আমার এই মানসিকতাই পেয়েছে শুধু রবু কিন্তু নবু পায়নি। তবে একটা কথা কী জানো, কখন যে কোথা থেকে অজানা ঘটনা এসে সব হিসেব নিকেশ, কষে রাখা ছক তছনছ করে দেবে কেউ তা জানে না; তেমনই ভালো ঘটনাও ঘটে যায় ছায়ার বিয়েটার মতো।’
পূর্ণেন্দু লক্ষ করলেন না অমিয়র বসাটা হঠাৎ শক্ত হয়ে গেল। বলার ঝোঁকে তিনি বললেন, ‘আমি তো ভেবেছিলুম চেনাশোনা লোকেদের কাজে পাত্রের কথা বলতে হবে, খবরের কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে দেখে চিঠিপত্র লিখতে হবে। তখনই বাড়িতে বেল বাজিয়ে ছেলের মা হাজির। এম টেক, উচ্চচশিক্ষিত, বোম্বাইয়ে তিন হাজার টাকা মাইনের চাকরি, দেখতে ভালো, ভদ্র মার্জিত রুচি, বয়স কম, দাবি দাওয়া নেই, সব থেকে বড়ো কথা স্বজাতি স্বগোত্র—আর কী চাই! ভাবতে পার অমিয়, এটাকে মিরাকল বলবে না?’
