‘ছেলেটাকে এতদিন বসিয়ে রেখেছিল।’ পূর্ণেন্দু ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন সবাইকে উদ্দেশ্য করে।
খেলা যত এগিয়েছে পূর্ণেন্দু ততই খেলার সঙ্গে মিশে যেতে লাগলেন। হাজার হাজার দর্শকের সঙ্গে একাত্ম বোধ করছেন। এমন ভাবে কখনো তিনি নিজেকে উপভোগ করেননি। দুই মুষ্ঠিবদ্ধ হাত উপর দিকে ছুঁড়লেন, পা ঠুকলেন, চিৎকার করলেন এবং নিজের বয়সটা ভুলে গেলেন। নবেন্দুকে নিয়ে প্রশংসার ঘূর্ণির মধ্যে তিনি তলিয়ে যাচ্ছেন। উঠে এল নবু, সমর্থকরা ওর পিছনে এসে দাঁড়াবে। আর ওকে বসিয়ে রাখা যাবে না। খেলায় নবেন্দুর গোলেই মোহনবাগান জিতল। ভিড়ের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে এসপ্ল্যানেডে আসার পথে তিনি অনেকবার মায়ার মুখটি দেখতে পেলেন।
বাস থেকে নেমে বহুদিন পর মুরগির মাংসের দোকানের সামনে দিয়ে আজ তিনি এলেন। দোকানদার তাকে দেখতে পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ‘কাকাবাবু, রিলেতে শুনলুম নবেন্দুর গোলে আমরা জিতেছি।’
পূর্ণেন্দু চোখেমুখে বিস্ময় ফুটিয়ে বললেন, ‘তাই নাকি! বাঃ বেশ ভালো খবর দিলেন।
‘মাংস নেবেন না? আজই তো খাবার দিন।’
ইতস্তত করে তিনি বললেন, ‘দিন এক কেজি।’
.
পাঁচ
রবিবার সন্ধ্যাবেলায় টিভি—তে বাংলা সিনেমা দেখছিলেন মায়া ও পূর্ণেন্দু। ফ্ল্যাটে আর কেউ নেই। কাজের মেয়েটি এইমাত্র চলে গেল। এমন সময় কলিং বেল বাজল। মায়া উঠতে যাচ্ছিলেন তাকে হাত তুলে বারণ করে পূর্ণেন্দু উঠলেন। মায়ার বাতের ব্যথা দিনকয়েক হল বেড়েছে। দরজা খুলে পূর্ণেন্দু অবাক।
‘আরে অমিয়, তুমি!’
‘অবাক করে দিলুম তো। প্রায় দু—বছর পর।’
‘হ্যাঁ প্রায় দু—বছর পর এলে। ভেতরে এসো।’ পূর্ণেন্দু টিভি বন্ধ করলেন।
অমিয় বসার ঘরের একমাত্র চেয়ারটায় বসে বলল, ‘মাসিমা কেমন আছেন?’ মায়ার মুখে স্বচ্ছন্দ হাসি ফুটে উঠল। ছায়ার বিয়ে হয়ে গেছে। তার বাচচা হওয়ার তারিখ আর পাঁচমাস পর। বোম্বাইয়েই হবে। তখন ওখানে গিয়ে তার মাস দুই থাকার ইচ্ছা। অমিয় এখন আর তার কাছে অবাঞ্ছিত নয়, সুতরাং হাসতে পারেন।
‘এতদিন পর আমাদের মনে পড়ল।’ মায়া প্রথামাফিক অনুযোগ করলেন।
‘মনে ঠিকই পড়ত, আসার সময় করে উঠতে পারিনি। কাঁকুড়গাছিতে একটা কাজ শুরু করেছি তাই এদিকে আসতে হচ্ছে।’
‘তুমি তো ইনটিরিয়ার ডেকরেশনের ব্যবসা শুরু করেছিলে। সেটাই চালিয়ে যাচ্ছ?’ পূর্ণেন্দু কৌতূহল দেখালেন।
‘হ্যাঁ, যাচ্ছি। এই উল্টোডাঙ্গার মোড়ে একটা বড়ো চশমার দোকান হচ্ছে, সেটারই কাঠের ব্যতীত কাজ, আর্ট ডেকরেশন এইসব করছি। গুজরাতি মালিক কলকাতায় চারটে দোকান, ওখানে প্রচুর পয়সা ঢালছে। আপনাদের এই দিকটা, বেলেঘাটা থেকে উল্টোডাঙ্গা পর্যন্ত সল্টলেকে আর এয়ারপোর্টে যাবার রাস্তাটা বিরাট উন্নতি করবে, দশ বছর পর আর চেনা যাবে না। কলকাতার সেরা জায়গা হবে।’
‘কী করে বুঝলে তুমি?’ পূর্ণেন্দু আগ্রহ দেখালেন।
‘রাস্তার দু—ধারে পয়সাওলা লোক বেশিরভাগই মাড়োয়ারি বা অবাঙালিতে ভরে যাচ্ছে। দামিদামি জিনিসের দোকান হচ্ছে, প্রত্যেকটা বড়ো ব্যাঙ্ক এখানে ব্রাঞ্চ খুলেছে, গন্ডায় গন্ডায় হাউজিং হচ্ছে তাতে বাস করছে উচ্চচ মধ্যবিত্তরা। মেসোমশাই আপনাদের এদিকটায় লোকের হাতে প্রচুর টাকা।’
‘কই আমার হাতে তো টাকা নেই। এই দেখোনা আমার ঘরদোরের অবস্থা, যা তুমি দেখে গেছলে এখনও তাই রয়েছে একটা নতুন জিনিসও বাড়েনি,’ পূর্ণেন্দু হাত দিয়ে ঘরের চারপাশটা দেখালেন।
‘বাড়েনি বলছ কী!’ মায়া ছদ্ম গাম্ভীর্য মুখে এনে বললেন, ‘আমার বাতের ব্যথাটা বেড়েছে না?’
‘নিশ্চয় নিশ্চয়, আর আমার চশমার পাওয়ার।’ পূর্ণেন্দু হাসলেন, তার সঙ্গে অমিয়ও।
‘কাগজে নবুর নাম দেখি, ভালোই খেলছে।’ অমিয় কথা চালাবার জন্য বলল, ‘জমিটমি কিনেছে? বলেছিল আমাকে দিয়ে ইন্টিরিয়র ডেকরেশন করাবে। বলেছিলুম গড়িয়ার দিকে কিনতে, এখন দাম বিশ হাজারে উঠে গেছে।’
‘আর জমি কেনা!’ পূর্ণেন্দু সোফায় হেলান দিলেন হতাশভঙ্গিতে। ‘তখন বলেছিল বটে বাড়ি করব, এখন বলছে হাতে লাখ দুয়েক টাকা না জমলে বাড়ি করতে যাওয়াটা বিপজ্জনক। প্রথম বছরেই যে ভাবে বসিয়ে রেখেছিল তাতে ওর শিক্ষা হয়ে গেছে। আবার যে বসতে হবে না তার কী কোনো গ্যারান্টি আছে? প্লেয়ার সব সময় ফর্মে থাকবে তার নিশ্চয়তা কী কেউ দিতে পারে? যে কটা টাকা পেয়েছে তা জমি বাড়িতে ইনভেস্ট করল, ওদিকে টিম থেকে বসিয়ে দিল, চাকরিবাকরিও নেই অবস্থাটা তখন কী হবে একবার ভাব!’
পূর্ণেন্দু অমিয়কে ভাববার জন্য চার—পাঁচ সেকেন্ড সময় দিয়ে নিজেই সমাধানের সূত্রটা তুলে নিলেন। ‘ও যা বলেছে আমার মনে হল সেটাই ঠিক, এখন তো প্লেয়ারদের দর লাখ টাকায় উঠেছে। মজিদ বাসকার পেয়েছে আরও অনেকে লাখের কাছাকাছি পাচ্ছে। আমি বলছি না নবু মজিদের ক্লাসের, তবে বছর দশেক যদি বড়ো ক্লাবে খেলতে পারে ফর্ম রেখে আর চাকরি যদি একটা পায় তাহলে সাত—আট লাখ জমিয়ে ফেলতে পারে, পারবে না?’
পূর্ণেন্দুর ও মায়ার মুখ দেখে অমিয় বুঝে নিল তাকে কী উত্তর দিতে হবে। ‘সাত—আট লাখ কেন, দশ বছরে প্লেয়ারদের এক একটা সিজনের জন্য পাঁচ—ছ লাখে পৌঁছে যাবে। নবু দশ বছর খেলতে পারলে পনেরো ষোলো লাখ কামাবে। ততদিনে নিশ্চয় একটা চাকরিও পেয়ে যাবে।’
