গ্যালারির মাঝ বরাবর বসে তিনি সামনে ঝুঁকে আধাবয়সি লোকটিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘প্লেয়াররা মাঠে নামবে কোনখান দিয়ে?’
লোকটি মাথা ঘুরিয়ে কয়েক সেকেন্ড পূর্ণেন্দুর মুখ দেখে নিয়ে মাঠের ওপারে সিমেন্টের সদস্য গ্যালারির দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘ওর মাঝে যে সরু পথটা দেখছেন ওখান দিয়ে। মাঠে আজ প্রথম এলেন?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ।’
যখন এসে বসেন তখন গ্যালারি অর্ধেক ভরা ছিল, ক্রমশ ঠাসাঠাসি হয়ে ভরে উঠল। পূর্ণেন্দুর মনে হল মাঠের তিন দিক ঘিরে হাজার কুড়ি পঁচিশ লোক তো হবেই। চতুর্থ দিকে কোনো গ্যালারি নেই। গোলপোস্টের পিছনে কিছুটা ফাঁকা জমি তারপর বেড়া। তার ওধারে কেল্লার ঢালু জমিতে থিকথিক করছে লোক। এই ঢালে দাঁড়িয়ে মাঠটা দেখা যায়। পূর্ণেন্দু ভেবে পেলেন না অতদূর থেকে লোকগুলো খেলার কতটা দেখতে পাবে!
চারপাশের লোকেদের কথাবার্তা থেকে তার মনে হল সবাই মোহনবাগানের সমর্থক আর সহজেই জিতে যাব এমন ধারণা কেউ করছে না।
‘আরে মশাই সবার ধারণা ইস্টবেঙ্গলই বুঝি মোহনবাগানের চির প্রতিদ্বন্দ্বী, ভুল ভুল, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হল এরিয়ান্স সেই জন্মের সময় থেকে।’ পূর্ণেন্দুর পিছনে কেউ একজন বলল। ‘বাগবাজার আর শ্যামপুকুর দুটো পাড়ার রেষারেষি আকচাআকচি থেকে খেয়োখেয়ি। আশি নব্বুই বছর আগের কলকাতার সঙ্গে গ্রামের কোনো তফাত ছিল না।’
‘দাদা আজও কী কোনো তফাত আছে।’ কেউ ফোড়ন কাটল।
‘দেখবেন মোহনবাগানের সঙ্গে খেলা পড়লেই নড়বড়ে এরিয়ান্স কী রকম শক্ত হয়ে যায়। আলাদা একটা জেদ ওদের ওপর চেপে বসে। সেই দুখিরামবাবুর আমল থেকে এটা হয়ে আসছে।’
কে দুখিরামবাবু? পূর্ণেন্দু সামনের লোকটিকে জিজ্ঞাসা করবেন ভাবলেন। কিন্তু সেই চাহনি আর ‘মাঠে প্রথম এলেন’ তাকে দমিয়ে রাখল।
‘গৌতম পাল আজ খেলছে না, তার জায়গায় দুটো হাফে দুটো নতুন ছেলেকে খেলিয়ে দেখবে। ওদের খেলা দেখেছেন নাকি?’
‘সমীর ছেলেটা স্পোর্টিংয়ের এগেনস্টে সেকেন্ড হাফে খেলেছিল, চলনসই তবে নবেন্দু ছেলেটাকে দেখিনি।’
পূর্ণেন্দু উৎকর্ণ হলেন নবেন্দুর নাম শুনে।
‘গত বছর মোহনবাগানকে গোল দিয়েছিল। এ বছর একটাও ম্যাচ খেলেনি।’
‘গোলটা দেখেছি, বিশ গজ থেকে মেরেছিল, ছেলেটার মাথাটা পরিষ্কার, দু পায়ে শট আছে, ভিড়ে ঢুকে ধাক্কাধাক্কি করতে পারে, কেন যে বসিয়ে রেখেছে বুঝতে পারছি না।’
কথাগুলো যে বলল তার গলায় দরদের ছোঁয়া পেয়ে পূর্ণেন্দুর মন কৃতজ্ঞতায় ফেঁপে উঠল, মাঠের একটা কোণের দিকের গ্যালারি থেকে মৃদু হাততালি উঠল। এরিয়ান্স দল মাঠে নেমেছে। তিন মিনিট পর বিপুল হো হো ধ্বনি আর সারা মাঠের হাততালির সঙ্গে গ্যালারির মানুষরা দাঁড়িয়ে পড়ল। পূর্ণেন্দুও উঠে দাঁড়ালেন। মোহনবাগান দল মাঠে আসার জন্য সরু পথটা দিয়ে এগিয়ে আসছে। খেলোয়াড়দের আসতে দেখেই এই সম্বর্ধনা। জমিতে হাত ঠেকিয়ে হাত কপালে ছুঁয়ে ওরা চোদ্দোজন মাঠে পা রাখল। পূর্ণেন্দুর চোখ খুঁজে বেড়াচ্ছে নবেন্দুকে। অবশেষে দেখতে পেলেন।
চারটে বল নিয়ে মোহনবাগান মাঠে নেমেছে। গোলে শট নিচ্ছে, নিজেদের মধ্যে দেওয়া নেওয়া করছে যারা তাদের একজন নবেন্দু। কিছুক্ষণ পর রেফারির বাঁশি শুনে নবেন্দু আরও দুজনের সঙ্গে মাঠের বাইরে এসে বেঞ্চে বসল। প্রথমার্ধের খেলায় কোনো দল গোল করতে পারল না। পূর্ণেন্দু অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করলেন দ্বিতীয়ার্ধের জন্য। দেখলেন নবেন্দু নেমেছে। বলের জন্য ছোটাছুটি করছে, তাড়া করছে। একবার বল পেয়ে ডানদিকে একজনকে এমন ঠেলে দিল যে বলটা এরিয়ানসের প্লেয়ারের পায়ে জমা পড়ল।
পূর্ণেন্দুর মনে হচ্ছে নবু একটা কিছু করে দেখাবার জন্য মরিয়া হয়ে এলোমেলো করে ফেলছে তার খেলা। এইভাবে খেলতে খেলতে নবেন্দু একটা পঁচিশ গজের শট নিল। গোলকিপার কোনোক্রমে বলটা বারের উপর তুলে দিল। কর্নার, কর্নার কিক থেকে বলটা গোলের সামনে উঁচু হয়ে পড়ছে। গোলকিপার বল ধরার জন্য এগিয়ে এসেও পিছিয়ে গেল। মোহনবাগানের লম্বা বাক্যটি উঠে এসেছে সে হেড করে বল গোলের মধ্যে পাঠিয়ে দিল।
গগনবিদারী চিৎকার কী বস্তু পূর্ণেন্দু জীবনে এই প্রথম তার স্বাদ পেলেন। চিৎকার সবে থিতিয়েছে তখনই মোহনবাগান গোল খেয়ে গেল। দোষটা ছিল ওই লম্বা ব্যাকেরই। গোলের সামনে সে পায়ে বল নিয়ে অযথা বাহাদুরি দেখাতে বিপক্ষ ফরোয়ার্ডকে একবার কাটিয়ে আবার কাটাতে গেল। বলটা পা থেকে একটু বেরিয়ে যেতেই ফরোয়ার্ডটি দুম করে বলটা গোলে মেরে দেয়। গোলকিপারকে হতভম্ভ করে বলটা গোলে ঢুকে যায়। সারা মাঠ স্তব্ধ।
দশ মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে বল দিয়ে নবেন্দু বুনো মোষের মতো সোজা ঢুকল এরিয়ান্স রক্ষণের মধ্যে। দুজনকে শুধু গতিতে পার হয়ে বলটা পাশে একজনকে ঠেলে দিতেই সে সঙ্গে সঙ্গে বলটা ছুটন্ত নবেন্দুর সামনে বাড়িয়ে দিল। বাঁক নেওয়া পনেরো গজের প্রচণ্ড একটা শট এবং গোল। আবার গগনবিদারী চিৎকার। সহখেলোয়াড়রা জড়িয়ে ধরে চুমু খাচ্ছে নবেন্দুকে। থরথর কেঁপে উঠলেন পূর্ণেন্দু। সবার সঙ্গে তিনিও চিৎকার করে উঠেছিলেন। নবু এখন মাঠের হিরো। চেঁচিয়ে তার বলতে ইচ্ছে করছে, ‘ও আমার ছেলে, আমার ছেলে।’
‘বহুদিন পরে একটা গোলের মতো গোল দেখলুম মশাই।’ সামনের লোকটি মুখ ফিরিয়ে বলল।
