‘তিরিশ হাজার নয় পনেরো হাজার। বাকি পনেরো আর কোনোদিন আদায় করা যাবে না।’ নবেন্দু নিশ্চিত স্বরে কথাটা বলল। তাতে হতাশা নেই। সে যেন জানে টাকা না পাওয়াটাই নিয়ম।
‘এবার সমরেশকে গিয়ে বল, তোমার কথা শুনেই আমার কেরিয়ারের ক্ষতি হল। তুই নিজেও কী বুঝিস না নিজের ভালো কিসে হবে আর কিসে হবে না?’ বহু বছর পর পূর্ণেন্দু প্রায় ধমক দিলেন নবেন্দুকে। বরাবরই অবাধ্য ও উদ্ধত তার ছোটো ছেলে, তাই শাসন করতে যেতেন না মান খোয়াবার ভয়ে।
মুখ নামিয়ে রইল নবেন্দু। মায়া শুনছিলেন ওদের কথা। পাংশু মুখে ভীত স্বরে বললেন, ‘আর টাকা দেবে না? জমি কেনা, বাড়ি করা এ সব তা হলে হবে না? হ্যাঁ রে নবু কিছুই তাহলে হবে না?’
নবেন্দু মরা মাছের মতো ফ্যাকাসে চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে পূর্ণেন্দুকে বলল, ‘সমরেশদাকে আমি বলেছি তুমি আমার যে ক্ষতি করলে তা আর কোনোদিন পূরণ করা যাবে না। এই উঠতি সময়ে একটা বছর নষ্ট হলে মন ভেঙে যায়। ভাঙা মন নিয়ে বড়ো হওয়া যায় না।’
‘সমরেশ কী বলল?’ পূর্ণেন্দু তার অজানা এক জগতের দরজায় দাঁড়িয়ে টোকা দেবার মতো করে জানতে চাইলেন।
‘বলল, আবার তুই কোনো ছোটো ক্লাবে গিয়ে শুরু কর। মোহনবাগান থেকে যাব ছোটো ক্লাবে? লোকে হাসবে কিন্তু কিছু করার নেই। বলেছিল ব্যাঙ্কে চাকরি পাইয়ে দেবে। তাও আর হবে না। বড়ো ক্লাবের বড়ো প্লেয়ারকেই ব্যাঙ্ক নেবে, আমাকে নেবে কেন? নতুন করে আবার উঠে দাঁড়াবার জন্য চেষ্টা করতে হবে। হ্যাঁ ছোটো ক্লাবেই যাব, আবার গোল দিয়ে মোহনবাগানকে শিক্ষা দোব নইলে হাজার মাধ্যমিক পাশ করাদের একজন হয়েই আমাকে বাঁচতে হবে।’ নবেন্দু খাবারের থালা ঠেলে দিয়ে বেসিনে হাত ধুতে গেল। পূর্ণেন্দু আর মায়া ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন! হাত ধুয়ে প্রায় ছুটেই নবেন্দু ঘরে চলে গেল।
একটা তিনতলা বাড়ি ধসে পড়ছে মায়ার চোখের সামনে আর তিনি ভাঙা বাড়ির চাঙড় সরিয়ে সরিয়ে খুঁজতে লাগলেন এই দুই ঘরের ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথটা। পথ না পাওয়া বিভ্রান্ত চোখ দুটি স্বামীর দিকে মেলে তিনি বললেন, ‘আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’
একই ভাবে তাকিয়ে পূর্ণেন্দু বললেন, ‘আমিও পারছি না।’
‘ওকে ভালো করে জিজ্ঞেস করে দেখো না। রবু তো বলেছিল সমরেশ লোকটা ভালো নয়।’
‘ক্লাবের ব্যাপার—স্যাপার আমি একদম বুঝি না, এখন জিজ্ঞেস করে দরকার নেই। নবুই ভালো বোঝে, যা করার ওই করবে।’
রবিন্দু ফিরল একটু রাত করে। পূর্ণেন্দু তাকে বসার ঘরে ডেকে নিয়ে নীচু গলায় নবেন্দুর হতাশা ও ভেঙে পড়ার কথাটা বললেন।
চিন্তিত মুখে রবিন্দু বলল, ‘এরকম হয় শুনেছি। টিমের পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে এমন অপোনেন্ট প্লেয়ারকে রিক্রুট করে তারপর তাকে বসিয়ে রেখে নষ্ট করে দেয়। আর সব অল্পবয়সি ছেলেরই তো স্বপ্ন বড়ো ক্লাবের জার্সি পরা। আশ্চর্য ব্যাপার, নবুকে একটা ম্যাচেও খেলাল না।’
স্বপ্ন রবিন্দুও দেখেছিল, ভাই বাড়ি করবে তারপর এই ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে সেই বাড়িতে নবু উঠে যাবে। একটা ঘরে দুটো খাটে তারা দুজন শোয়, একটা আলনা ভাগ করে দুজনে ব্যবহার করে, টুলের মতো দুটো টেবলে তারা ছোটোখাটো জিনিস রাখে, খাটের নীচে দুজনের দুটো সুটকেশ, ঘরে নড়াচড়ার জায়গা নেই। রবিন্দুর আশা ছিল পুরো ঘরটাই একদিন তার হবে। হলে হাঁফ ছাড়ার সুযোগ পাবে। এমনকী তখন বিয়ের কথাও সে ভাবতে পারবে।
রবিন্দু বলল, ‘কিন্তু ও ক্লাবে যাওয়া বন্ধ করল কেন? এটা ঠিক কাজ নয়। যাক, রোজ যাক। বলা তো যায় না একদিন চান্স তো পেয়েও যেতে পারে।’
‘সেটা তুইই ওকে বুঝিয়ে বল। আমি বললে শুনবে না।’
অন্ধকার ঘরে চিৎ হয়ে নবেন্দু শুয়ে, কপালে আড়াআড়ি রাখা দুটো হাত। দেখেই রবিন্দু বুঝল ঘুমোয়নি, ভাবছে।
নবেন্দুর পাশে খাটে বসে সে বলল, ‘যাচ্ছিস না কেন ক্লাবে? ভুল করছিস, নজরের বাইরে থাকলে তোকে তো ওরা ভুলে যাবে। ফুটবল এমন একটা খেলা কখন যে কাকে দরকার পড়ে যাবে কেউ বলতে পারে না। বড়ো ক্লাবে মান অভিমান চলে না আর তুই এতবড়ো প্লেয়ার নোস যে বাড়িতে এসে সাধাসাধি করবে। ধৈর্য ধরে থাকতে হয়। কালই যাস।’
দাদার সহানুভূতি ভরা আন্তরিক স্বর নবেন্দুর মাথায় ঢুকল। পরদিন থেকে সে ক্লাবে গিয়ে সকালের প্র্যাকটিসে যোগ দিল। রবিন্দু যা বলেছিল ঠিক তাই ঘটল। মিড ফিল্ডার গৌতম পালের কুঁচকির পুরোনো চোটটা আবার ফিরে এল ইস্টার্ন রেলের সঙ্গে খেলায়, পরের ম্যাচ এরিয়ান্সের বিরুদ্ধে সে খেলতে পারবে না। স্থির হল দুই নবাগত সমীর পোল্যে আর নবেন্দু গুপ্তকে ম্যাচটায় খেলানো হবে আধাআধি করে, প্রথমার্ধে সমীর দ্বিতীয়ার্ধে নবেন্দু। খবরটা নবেন্দু বাড়িতে জানাল ম্যাচের আগের দিন।
পূর্ণেন্দু কখনো ফুটবল ম্যাচ দেখতে ময়দানে যাননি, মোহনবাগান মাঠটাও চেনেন না। ঠিক করলেন ম্যাচটা দেখতে যাবেন। বেলা তিনটে নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে শহিদ মিনারের কাছে বাস থেকে নেমে একটি অল্পবয়সি ছেলেকে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিলেন মোহনবাগান মাঠটা কোন দিকে। ছেলেটির আঙুল তুলে দেখিয়ে দেওয়া দিক লক্ষ করে কয়েকটা রাস্তা ও মাঠ পেরিয়ে পৌঁছলেন সবুজ গ্যালারির টিকিটের জন্য দাঁড়ানো লাইনে। মিনিট পনেরো পর তিনি জীবনে প্রথম ঘেরা মাঠে ঢুকলেন।
