বাড়িতে ফিরে এসে ছায়ার নতুন সংসার বিষয়ে পূর্ণেন্দু ও মায়ার অজস্র কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর দিতে হল রবিন্দুকে কিন্তু ঘুণাক্ষরেও সে বলল না ট্রেনে বাসন্তীর সঙ্গে তার কী কথাবার্তা হয়েছে। সে এটা বুঝেছে বাসন্তীর প্রস্তাব রীতিমতো অমর্যাদাকর এবং শুনলে তার বাবা ওদের সঙ্গে হয়তো বাক্যালাপ বদ্ধ করে দেবে। সম্পর্কটা তিক্ত যাতে না হয় সেজন্যই সে মুখ বুজে রইল।
বোম্বাই থেকে ফিরে আসার এক সপ্তাহ পরই রবিন্দু শুনল মোহনবাগান থেকে নবেন্দু ত্রিশের অর্ধেক পনেরো হাজার টাকা অ্যাডভান্স পেয়েছে। খবরের কাগজে সম্ভাব্য দলবদলের আলোচনার মধ্যে খবরটা বেরোয় এবং তাতেই নবেন্দু আনন্দ আবাসনে এবং উল্টোডাঙ্গা—বাগমারি এলাকায় পরিচিতি পেয়ে গেল। মাদার ডেয়ারির দুধ আর মুরগির মাংস বিক্রি করে যে লোকটি সে একদিন পূর্ণেন্দুকে বলল, ‘আপনি নবেন্দু গুপ্তর বাবা। আমার খদ্দের, দোকানের কাছেই থাকেন অথচ আপনাকে চিনি না!’ লোকটিকে খুব লজ্জিত দেখায়।
‘হ্যাঁ তাতে হয়েছি কী, সেজন্য আপনি কী একশো গ্রাম মাংস বেশি দেবেন?’ মজা করেই পূর্ণেন্দু বলেন।
লোকটি অপ্রতিভ হয়ে বলে, ‘আমাদের এদিকে বড়ো ক্লাবের প্লেয়ার তো কেউ এতদিন ছিল না, অভাবটা পূর্ণ হল।’
‘আপনি ফুটবল ভালোবাসেন।’
‘দু—বছর আগেও রেগুলার মাঠে যেতুম মোহনবাগানের খেলা থাকলে। এখন দোকান ফেলে আর যেতে পারি না।’ লোকটির স্বরে আক্ষেপ ফুটে উঠল।
‘নবেন্দুর খেলা আপনি দেখেছেন?’
‘দেখব কী করে, ও তো মোহনবাগানে আগে কখনো খেলেনি। গতবছর একটা গোল দিয়েছে তখনই তো নামই জানলুম, অবশ্য ইস্টবেঙ্গকেও একটা দিয়েছে। ওকে যে মোহনবাগান তুলে নেবে সেটা তখন বুঝে গেছলুম।’ লোকটির মুখে ছড়িয়ে পড়ল নিজ অনুমান সফল হওয়ার হাসি। ‘এল তো কিন্তু খেলার চান্স পাবে কিনা বলা শক্ত। সেট টিম, কাকে বসিয়ে ওকে খেলাবে?’ একটু উদবেগ মাখান মুখে লোকটি পূর্ণেন্দুর দিকে তাকিয়ে রইল।
পূর্ণেন্দু মুখ গম্ভীর করে মাথা নাড়লেন প্রশ্নটাকে গুরুত্ব দিয়ে। ফুটবল, মোহনবাগান এই দুয়ের কোনোটা নিয়েই তিনি মাথা ঘামান না শুধু ক্রিকেট ছাড়া, পূর্ণেন্দুর মুখ দেখেই লোকটি বুঝে গেল ময়দানের গূঢ় ব্যাপার—স্যাপার এই প্রৌঢ় কিছুই জানেন না। সে গলা নামিয়ে বলল, ‘এরকম উঠতি বিপজ্জনক প্লেয়ারদের ক্লাব ক্যাচ করে নিয়ে এসে বসিয়ে রেখে দেয়, না খেলিয়ে খেলিয়ে নষ্ট করে দেয়। একবছর বসে থেকে সেই প্লেয়ার যখন বিরক্ত হতাশ হয়ে অন্য ক্লাবে চলে যায় তখন আর আগের মতো খেলতে পারে না। এরকম অনেক দেখেছি। আপনার ছেলেকে বলবেন পলিটিক্স করে হোক বা অন্য যেভাবেই হোক এক আধটা ম্যাচে যেন খেলার জন্য চান্স করে নেয়। ক্লাবে ওর মুরুব্বি কে?’
পূর্ণেন্দু মাথা নেড়ে বললেন, ‘জানি না।’
‘নিশ্চয় কেউ আছে। সেই মুরুব্বির ক্লাবে ক্ষমতা কতটা? ক্ষমতা যদি থাকে তাহলে নবেন্দু খেলার চান্স পেতে পারে, আর একবার মাঠে নামার সুযোগ পেলেই যেন সাপোর্টারদের বুঝিয়ে দেয় ওকে বসিয়ে রেখে ভুল করা হয়েছে। আমার কথাগুলো ছেলেকে বলবেন। আর বলবেন ভুনোদার গ্রুপটা এখন ভেরি স্ট্রং, ওর কথামতো টিম হয়।’
পূর্ণেন্দু মাথা নেড়ে, সাড়ে সাতশো গ্রাম মুরগির মাংস নিয়ে ফিরে আসেন।
.
চার
মাংসের দোকানদার যা বলেছিল ঠিক তাই ঘটল। খবরের কাগজে মোহনবাগানের খেলা থাকলেই পূর্ণেন্দু খেলার পাতাটা পড়েন। মোহনবাগান টিমে নবেন্দু গুপ্ত নামটা একদিনও দেখতে পাননি। তখন দোকানদারের কথাগুলো তার মনে পড়ে। ভাবেন নবুকে জিজ্ঞাসা করবেন। জিজ্ঞাসা করতে গিয়ে আড়ষ্ট বোধ করেন। লক্ষ করেছেন তার ক্লাবের খেলার দিনে নবু খিটখিটে অধৈর্য হয়ে ওঠে। ফ্ল্যাট থেকে আর বেরোতেই চায় না।
এই রকম একটা দিনে পূর্ণেন্দু দেখলেন বিকেলে বিছানায় শুয়ে রয়েছে। অবাক হয়ে বললেন, ‘আজ তো মোহনবাগানের খেলা হয়েছে, তুই গেলি না?’
নবেন্দু কোনো জবাব দিল না। পূর্ণেন্দু আবার জিজ্ঞাসা করায় সে বলল, ‘শরীরটা ভালো নেই।’
ওর বলার ভঙ্গিতে পূর্ণেন্দু বুঝলেন, এই প্রসঙ্গে আর কথা বলতে চায় না। রাত্রে একসঙ্গে খেতে বসে পূর্ণেন্দু কথাটা তুললেন, ‘ব্যাপার কী বলত, খেলার দিন আজকাল তুই বাড়িতেই থাকিস! তোকে কি খেলায় চান্স দিচ্ছে না?’
নবেন্দু গুম হয়ে থালার দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে মাথা নেড়ে বলল, ‘না।’
‘লিগের একটা ম্যাচেও তো টিমে তোর নাম দেখলুম না। সাত—আটটা ম্যাচ হয়ে গেছে!’
নবেন্দু কথা না বলে রুটি ছিঁড়ে তাই দিয়ে তরকারি তুলে মুখে দিল।
‘ক্লাবে নাকি পলিটিক্স হয়? অনেকগুলো গ্রুপ আছে, সত্যি?’
‘তোমায় কে বলল?’
‘মুরগির মাংসা বিক্রি করে যে লোকটা, সে বলেছে।’
‘ঠিকই বলেছে।’
‘বলেছে তুই একটা গ্রুপে ঢুকে পড়, ভুনোদার গ্রুপে ঢুকলে চান্স পাবি।’
‘আমাকে সমরেশদা নিয়ে গেছল, সমরেশদা বরুণ ভটচাযের গ্রুপের লোক। বরুণদা আবার ভুনোদার অ্যান্টি গ্রুপের। আমি বরুণদার লোক বলে দাগি হয়ে গেছি। আসলে এখনই বড়ো ক্লাবে যাওয়াটাই আমার ভুল হয়ে গেছে। সমরেশদার কথাতেই গেছি, বলেছিল তিনটে ম্যাচ খেলিয়ে দেবে এখন দেখছি ওর কোনো পাওয়ারই নেই।
‘তোকে শুধু বসিয়ে রাখার জন্য ক্লাব তিরিশ হাজার টাকা খরচ করবে?’ পূর্ণেন্দুর গলায় আগাগোড়া অবিশ্বাস।
