রবিন্দু জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ কেউই কথা বলল না। বাসন্তীই শুরু করলেন, ‘মনে হচ্ছে তুমি আমার কথায় বিরক্ত হয়েছো। আচ্ছা রবু, সীমুকে কী তোমার পছন্দ নয়?’
ঝুলি থেকে তাহলে বেড়ালটা বেরোল। এই ধরনের একটা প্রশ্ন আসতে পারে সেটা অনুমান করেছিল। রবিন্দু মনে মনে হাসল এবং সতর্ক হল। ‘এ কথা বলছেন কেন?’
‘সীমুর জন্য আমরা তোমাকে পাত্র ঠিক করেছি।’ শান্ত গলায় বাসন্তী ভণিতা না করে সহজভাবে বললেন।
‘ঠিক করে ফেলেছেন?’ রবিন্দুর মাথা গরম হয়ে উঠল। মুখটা কঠিন করে সে আবার জানলার বাইরে তাকাল। ভদ্রমহিলা এমনিতে কথাবার্তায় বেশ ভালো, আন্তরিক, ওর মনে আঘাত দিতে তার ইচ্ছে করছে না। সীমুকে বিয়ে? একদমই ভাবা যায় না। ছায়ার বিয়ের কথা বলতে এসেছিলেন নিজেরা ঠিকঠাক করে একদম নিশ্চিন্ত হয়েই। ধরেই নিয়েছিলেন তার ছেলেকে এরা লুফে নেবে। ব্যাপারটা তাই—ই হয়েছিল। তবু রবিন্দুর মনে খচখচ করেছিল একটা কথা, আমাদের কী এতই দীন মনে হয়, দু—ঘরের ঘিঞ্জি ফ্ল্যাটে বাস করি বলে, বড়োমানষি দেখাবার মতো চাকরি নেই বলে? সম্বল শুধু মুখশ্রীটুকু! একবার মুখের দিকে তাকালে আর একবার ফিরে দেখতে হয়। আর সেই জন্যই ছায়াকে এরা পুত্রবধূ করেছে। তাই বলে শুধু এই কারণে তাকেও জামাই করতে চায়? মুখশ্রী ছাড়া কী এমন তার যোগ্যতা? সামান্য একটা চাকরি, দুটো টিউশনি আর শেয়ার সার্টিফিকেট, ডিবেঞ্চার, নানান কোম্পানির পাবলিক ডিপোজিট স্কিম ফিরি করে বেড়ানো এই তো তার উপার্জনের হাতিয়ার। এগুলো দিয়ে অগুস্তি পদাতিকের একজন হওয়া যায়, ছোটোখাটো সেনাপতিও হওয়া যায় না।
তাকে এরা জামাই করবেন বলে ঠিক করে ফেলেছেন এবং বোধহয় ধরেই নিয়েছেন ছেলেটি না বলবে না, রবিন্দু ঠান্ডা মৃদুস্বরে বলল, ‘আমি বুদ্ধিমান, বিবেচক, অগ্রপশ্চাৎ ভেবে কাজ করি, মাত্র এই কটা গুণ দেখেই আপনারা আমায় বাছাই করে ফেললেন? বিয়ে করে বৌকে নিয়ে থাকার ঘর আমার নেই সেটা তো জানেন।’
‘জানি। যতদিন না থাকার মতো ঘর পাচ্ছ ততদিন সীমু আমাদের কাছেই থাকবে। সুকু নেই ওর ঘরটা খালিই রয়ে যাবে, সেখানে তোমরা দুজন থাকবে, মনে হয় সুকু বোম্বাইতেই থেকে যাবে, কলকাতায় শিগ্গিরি আসার কোনো সম্ভাবনা নেই বলে দিয়েছে। এত ভালো চাকরি কলকাতায় কোথায় পাবে?’ বাসন্তী কথা থামিয়ে লক্ষ করলেন রবিন্দু মন দিয়ে তার কথা শুনছে। উৎসাহিত হয়ে তিনি যোগ করলেন, ‘সুকুর জন্য সল্টলেকে তিন কাঠা জমি কেনা আছে, ও বাড়ি করে নেবে। ফ্ল্যাটটা আমরা সীমুকেই দেব ঠিক করেছি।’
‘আমি তো দেখছি বেশ ভালোই আটঘাট বেঁধে আপনারা পাত্র ধরার কাজে নেমেছেন, যা অফার দিচ্ছেন তাতে আমার থেকেও অনেক ভালো ছেলে পেয়ে যাবেন, তাহলে আমাকে কেন?’ রবিন্দুর কথাগুলো হালকা ব্যঙ্গের মোড়কে মোড়া। বাসন্তী কিন্তু মোটেই উত্তেজিত হলেন না বরং মুখ টিপে হাসলেন।
‘হ্যাঁ, তোমার থেকে ভালো পাত্র পেয়ে যাব, পেয়েছিলুমও কিন্তু কেউ তোমার মতো দেখতে সুন্দর নয়। আমরা সুন্দর বউ চাই, সুন্দর জামাই চাই।’
‘কিন্তু আমিও যে সুন্দরী বউ চাইতে পারি, এটা বোধহয় খেয়ালে রাখেননি। আপনার মেয়ে কি সুন্দরীর পর্যায়ে পড়ে?’
‘একদমই না। আর সে জন্যই তার সুন্দর স্বামী চাই। আমরা চাই সুন্দর চেহারার নাতি নাতনি, সুন্দরের বংশ তৈরি করতে। সুকুর ছেলেমেয়েরা সুন্দর হবে, সীমুরও তাই হোক, এটাই চাই।’
রবিন্দু অবাক হয়ে বাসন্তীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। বলে কী! সুন্দরের বংশ তৈরি করার জন্য মানুষ এইভাবে পরিকল্পনা করে এগোতে পারে, এটা তার ধারণার বাইরে ছিল।
‘তুমি খুব অবাক হচ্ছ রবু আমার কথা শুনে, হবারই কথা। সুকুর বউভাতে আমাদের যে আত্মীয়স্বজনরা এসেছিল তাদের তুমি দেখেছ প্রত্যেকেই চলনসই রকমের হ্যান্ডসাম তার মধ্যে তোমার মেসোমশাই আর সীমুকে কী বেখাপ্পা লাগছিল সেটা হয়তো তুমি নজর করোনি কিন্তু আমি করেছি। আমি দেখেছি সবাই তোমার সঙ্গে তোমার বাবার সঙ্গে অন্যরকম ভঙ্গিতে অন্যরকম গলায় কথা বলছিল। এর প্রধান কারণ চেহারা আর ব্যক্তিত্ব। আমি এই দুটো চাই ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য।’ বাসন্তী নিজের মনের বাসনা আর গোপনে রাখলেন না, কেন রবিন্দুকে জামাই রূপে পেতে চান তা খোলাখুলি বলে দিলেন। তিনি বুঝে গেছেন, রবিন্দুকে আয়ত্তে আনতে হলে স্পষ্টাস্পষ্টি কথা বলাই ভালো।
রবিন্দু আবার জানলার বাইরে তাকাল অন্যমনস্ক ভাবে। বাসন্তীর এই চাওয়াটাকে কী বাতিক বলা যায়? জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার সুন্দরের বংশ তৈরি করেছে বেছে বেছে সুন্দরী মেয়েদের বউ করে এনে। বাসন্তীও সেই পন্থা নিয়েছেন সামাজিক সম্ভ্রম পাওয়ার জন্য। কিন্তু সেজন্য তাকে কেন হাড়িকাঠে মাথা দিতে হবে। সীমন্তির সঙ্গে আজীবন কাটানোর কথা ভাবতে গিয়ে তার শরীর মন বিমর্ষ বোধ করতে শুরু করল। বাসন্তী টাকা আর ফ্ল্যাটের টোপ রেখেছে। এ দুটো জিনিস খেটেখুটে সংগ্রহ করা যায় কিন্তু সীমন্তি একবার ঘাড়ে চেপে বসলে তাকে নামানো যাবে না।
‘মাসিমা, আমি এখন বিয়ের কথা একদমই ভাবছি না, অন্তত তিন—চার বছর ভাবব না।’
‘তারপর ভাববে তো? সীমুর বয়সও এমন কিছু নয়, তিন—চার বছর সে অপেক্ষা করে থাকতে পারবে।’
