‘একটা ঝাঁটা সবার আগে কেনা উচিত ছিল, এটা আর কারুর মনে পড়েনি। কী ধুলো ময়লা দেখেছ!’ বাসন্তী চারিদিকে তাকিয়ে ধুলোর উপস্থিতি বোঝালেন মুখ বিকৃতি করে।
কলিং বেল বাজল। সবাই অবাক হয়ে মুখ চাওয়া—চাওয়ি করল, এখানে চেনা তো কেউ নেই যে দেখা করতে আসবে। ভুল করে কেউ বেল বাজাল না তো! সুকুমারই দরজা খুলতে গেল।
শ্যামবর্ণা, চশমা পরা এক মহিলা, বাসন্তীর কাছাকাছি বয়সি। সপ্রতিভ স্বরে বললেন, ‘আপনারা তো আজই এলেন, আমি দোতলায় ঠিক আপনাদের উপরেই থাকি। বারান্দা থেকে দেখলুম আপনারা এলেন, আগেই জেনেছিলুম এক বাঙালি পরিবার আসছে। শুনে কী আনন্দ যে হয়েছিল, এখানে চল্লিশটা পরিবার, বাঙালি শুধু একা আমরা। আমার স্বামী একটা টেক্সাটাইল ডিজাইনিং ফার্মে কাজ করেন। আলাপ করতে এলুম!’ ভদ্রমহিলা হাসলেন। হাসিটা সুকুমারের কাছে খুবই মিষ্টি লাগল। ভিতর থেকে ছায়া এসে তার পাশে দাঁড়াল।
সুকুমার ছায়াকে বলল, ‘ইনি ওপরে থাকেন, বাঙালি, আলাপ করতে এসেছেন।’
ছায়া নমস্কার করে বলল, ‘থাকব আমরা দুজন। আমার দাদা শাশুড়ি পরশু চলে যাবেন।’
‘কদ্দিন বিয়ে হয়েছে?’
‘ফুলশয্যা হয়েছে তিন দিন আগে।’
‘দেখে মনে হয়েছিল অল্পদিন বিয়ে হয়েছে কিন্তু সেটা যে এত অল্পদিন বোঝা যায় না।’
‘ভেতরে আসুন, মা—র সঙ্গে আলাপ করবেন।’ ছায়া হাত ধরে মহিলাকে ভিতরে আনল।
কলকাতায় ফেরার সময় ট্রেনে বাসন্তী বললেন রবিন্দুকে ‘কী ভাগ্য দেখো ওদের, মেঘ না চাইতেই জলের মতো ওপর থেকে নেমে এল ভগবতী ঘোষ। বোম্বাইয়ে দু—বছর আছেন, এখানকার হালচাল বেশ ভালোই জানেন, ছায়ার কোনো অসুবিধে হবে না।’
‘ছায়ার ভাগ্যটা সত্যিই ভালো।’
‘রবু তুমি কোষ্ঠী ঠিকুজি মানো?’
রবিন্দু ইতস্তত করে বলল, ‘খানিকটা খানিকটা বিশ্বাস করি।’
‘আমি পুরোটাই বিশ্বাস করি।’ বাসন্তীর চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। ‘তোমার মেসোমশায়ের কোষ্ঠীতে সম্পত্তি, অর্থহানির সম্ভাবনার কথা লেখা আছে। আমি ওকে সঞ্চয়িতায় টাকা রাখতে দিইনি আর দেখো কী ঘটে গেল। শুভেন্দুবাবু চারদিন খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে বিছানায় পড়েছিলেন। উনি নয় ব্যবসায়ী, পয়সাওলা লোক, লাখ টাকা চোট খাবার ধাক্কাটা সামলে নেবেন কিন্তু অনুপবাবুর কথাটা ভাবো, দেড় বছর পর রিটায়ার করবেন। প্রভিডেন্ট ফান্ড ভেঙে ষাট হাজার টাকা তুলে সঞ্চয়িতায় রাখলেন, দুটো মেয়ে রয়েছে, বিয়ে দিতে হবে, ভদ্রলোক তো পাগলের মতো হয়ে গেছেন। ওই অবস্থা তো তোমার মেসোমশায়েরও হতে পারত। আমি বারণ করেছি, তুমিও নিষেধ করলে, তাই না উনি লোভ সামলালেন।’ বাসন্তী নিজের কৃতিত্বের অর্ধেকটা রবিন্দুকে দিয়ে লক্ষ করলেন কতটা ভাবান্তর ওর চোখেমুখে ঘটল। ঘটেছে দেখে আবার বললেন, ‘আসলে আমার বারণ উনি শুনতেন না, তুমি বলায় উনি পিছিয়ে গেলেন, তোমার উপর ওনার ভীষণ বিশ্বাস, শুধু ওর কেন আমাদের সবাইয়েরই বিশেষ করে সীমুর।’
‘আমার ওপর বিশ্বাস! কেন? রবিন্দু অবাক হয়ে জানতে চাইল।
‘এই কেনর কোনো জবাব তো জানা নেই। সীমুর কোষ্ঠীতে আছে, কুড়ি বছর বয়সে কোনো হিতাকাঙ্ক্ষী পুরুষ দ্বারা উপকৃত হবে। এখন ওর বয়স কুড়ি। আমি অনেক খুঁজে এমন কোনো পুরুষ দেখতে পাইনি যে ওর উপকারে আসতে পারে, এক তুমি ছাড়া।’
‘আমি! আমি ওর কী উপকার করতে পারি?’
‘ওকে পড়াতে পার, বি কম—টা পাশ করিয়ে দিতে পার। আমাদের কাছে এখন তো তুমি হাউজিংয়ের আর পাঁচটা ছেলের একজন নও, এখন তুমি সীমুর দাদার শালা, আত্মীয়, আমাদের ফ্ল্যাটে তো সবসময়ই আসতে পার কেউ কিছু মনে করবে না। এই ক—দিনেই আমি দেখেছি তুমি বুদ্ধিমান, বিবেচক, অগ্রপশ্চাৎ ভেবে কাজ কর, এমন একজন লোকের পরামর্শ নিয়ে চললে বৈষয়িক ব্যাপারে কখনো ঠকতে হবে না। এতদিন পরামর্শ নিতুম সুকুর কিন্তু এখন তো আর চট করে তাকে পাব না কিন্তু তোমাকে পাব।’
‘আমি কী পরামর্শ দোবো।’
‘পরামর্শ দেবার মতো ব্যাপারের কী অভাব আছে। লেখাপড়ার ব্যাপারটা আমাদের থেকে তুমি ভালো বোঝো। সীমুর পড়াশুনোটা তো তুমি গাইড করতে পার, পার না কী? সিমুর জন্য ওর বাবা পোস্ট অফিসের যে সার্টিফিকেট কিনল সেটা ম্যাচুওর করলে টাকাটা ও কী করবে, সেটা তো তুমি বলে দিতে পার।’
‘ততদিনে ওর বিয়ে হয়ে যাবে নিশ্চয়, তখন তো ওর স্বামীই বলে দিতে পারবে!’ রবিন্দু আশ্চর্য বোধ করল বাসন্তীর হিসেবে এমন ভুল হওয়ায়।
‘তা পারবে, কিন্তু কেমন পারবে তাতো এখন জানি না তবে এখন জানি তুমিই পারবে।’
রবিন্দুর অস্বস্তি লাগছে এই সব দায়িত্ব ঘাড়ে এসে যাচ্ছে বুঝতে পেরে। বোনের শ্বশুরবাড়ির সঙ্গে সম্পর্কটা ঘনিষ্ঠ করে তার লাভ কী? সীমুকে গাইড করে পাশ করিয়ে দিতে হবে। পাস করাটা কী হাতের মোয়া! আর আমিই বা অমন ফাঁকিবাজ মাথামোটা, আহ্লাদী মেয়ের দায়িত্ব নিয়ে শেষে বদনাম কুড়তে যাব কেন? মেয়ে চল্লিশ হাজার টাকার মালিক হবে, একথা বারবার শোনাচ্ছেন কেন? মতলবটা কী? ভদ্রমহিলা বাড়াবাড়ি রকমের প্রশংসা করছেন। উদ্দেশ্যটা বুঝে নেবার চেষ্টা করল রবিন্দু।
‘না, আমি পরের টাকা সম্পর্কে কোনো পরামর্শ দিতে পারব না। তাছাড়া পরামর্শ দেবার আছেটাই বা কী! ম্যাচুওর করবে আবার তাই দিয়ে সার্টিফিকেট কিনবে নয়তো টাকাটা খরচ করবে যদি প্রয়োজন দেখা দেয়, ব্যস। এ জন্য পরামর্শ নেবার কী দরকার তাতো বুঝছি না।’ রবিন্দুর স্বরে বিরক্তি ও উগ্রতা প্রকাশ পেল, বাসন্তী গম্ভীর হলেন।
