‘বিয়ে হবে কোথায়?’ পূর্ণেন্দু প্রশ্ন করে নিজেই উত্তর দিলেন, ‘সামনের মাঠে?’
‘এখানে সব বিয়ে তো মাঠেই প্যান্ডেল করে হয়, ফ্ল্যাটে জায়গা কোথায়?’
‘ডেকরেটর ঠিক করতে হবে তারপর আছে কেটারার ঠিক করা। এই সময়ই অমিয়কে দরকার ছিল, ছেলেটা কোথায় যে গেল, বহুদিন আর আসে না। ও থাকলে কিচ্ছু ভাবতে হত না।’ পূর্ণেন্দুর আক্ষেপে মায়া বিরক্ত হলেন।
‘তোমার দুটো ছেলে কী অপদার্থ না তাদের পক্ষাঘাত হয়েছে! বোনের বিয়েতে তারা কী খাটাখাটনি করতে পারবে না? এইটুকু ব্যাপারেই অমিয় অমিয় করে হেদিয়ে মরছ!’
পূর্ণেন্দু অপ্রতিভ হলেন, সত্যিই তো, নিজের ছেলেদের প্রতি আস্থা না থাকার তো কোনো সংগত কারণ তাঁর জানা নেই। ওরা নিজেরাই নিজেদের কেরিয়ার তৈরি করছে, তিনি রবুকে চাকরি পেতে সাহায্য করা ছাড়া আর কিছু তো করেননি। নবু তো নিজেই বেছে নিয়েছে তার পথ। তিনি ভেবেছেন শুধুই ছায়ার ভবিষ্যৎ। দু—মাস আগে জাতীয় সঞ্চয় পত্রগুলোর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ায় তিনি ষাট হাজার টাকা পেয়েছেন। টাকা ব্যাঙ্কে রয়েছে। ছায়ার বিয়ের কথা ভেবেই এই পত্র কিনেছিলেন। মেয়াদ পূর্ণ হতে না হতেই বিয়ে স্থির হয়ে গেল। একে পূর্ণেন্দু, যা কখনো বিশ্বাস করেন না সেই, ভাগ্যের আশীর্বাদ পেয়েছেন বলে মনে করলেন।
বিয়ের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিলেন সূর্যশেখর, এমনকী পুরোহিত জোগাড় করা পর্যন্ত। পরামর্শ দিলেন, ‘শুধু এই বাড়ির আটটা ফ্ল্যাট ছাড়া এখানকার আর কাউকে নেমন্তন্ন করবেন না। এখানে এটাই রেওয়াজ।’ নিমন্ত্রিতদের নামের ফর্দ মায়া সবাইকে জিজ্ঞাসা করে তৈরি করলেন। নবুই লক্ষ করে অমিয়র নাম ফর্দে নেই।
‘মা এটা কী করলে, এত বড়ো ভুল। অমিয়দার নামটাই বসাতে ভুলে গেলে।’
‘ছায়া তো বলল, নেমন্তন্ন করার দরকার নেই। যার বিয়ে সেই যদি বারণ করে তাহলে আমি আর কী করব।’ মায়ার গলার স্বরে কোনোরকম দ্বিধা বা মালিন্য নেই।
সুচারুভাবে সম্পন্ন হল বিয়ে। শুধু বিয়ের এক ঘণ্টা আগে কিছুক্ষণের জন্য পাওয়ার কাট হওয়া ছাড়া আর কোনো বিঘ্ন ঘটেনি, অবশ্য জেনারেটর থাকায় এটাকে বিঘ্ন বলা যায় না। ফুলশয্যার পরের দিনই সুকুমার বোম্বাই রওনা হল ছায়াকে নিয়ে ট্রেনে। সঙ্গে গেল রবিন্দু আর বাসন্তী নবদম্পতির সংসার পেতে দিয়ে আসার জন্য। ট্রাঙ্ক কলে কথা বলে সুকুমার আগেই জেনে নিয়েছিল তাদের জন্য সান্তাক্রুজ ইস্টে এক গুজরাতি হাউজিং সোসাইটিতে একটা তিন ঘরের ফ্ল্যাট আসবাব সমেত প্রস্তুত হয়ে রয়েছে। তারা ভিক্টোরিয়া টার্মিনাস স্টেশন থেকে সোজা চলে যেতে পারে। তাকে আর একটা কথা বাঙালি বলেই জানিয়ে দেওয়া হয়, আবাসনটি পুরো নিরামিষ। মাছ মাংস ডিম ওর চৌহদ্দির মধ্যে রান্না করা বা খাওয়া চলবে না। আবাসনে রাধাকৃষ্ণের মন্দির আছে।
তারা ঠিকমতো নির্বিঘ্নেই পৌঁছল। সেদিন সন্ধ্যাতেই বাসন এবং খাওয়ার জিনিস কিনতে বেরোয় তারা। আবাসন থেকে বেরিয়েই দোকান আর বাজার, স্টিলের বাসন আর দুটো প্লাস্টিকের বালতিতে মুদির দোকানের ঠোঙা, সর্ষের তেলের টিন, থলি ভরা কাঁচা বাজার আর টিফিন কেরিয়ারে ডাল—ভাত, চারজনে হাতে নিয়ে ফিরল।
‘ভাগ্যিস বড়দা এসেছে নইলে এত জিনিস হাতে করে রয়ে আনতে পারতুম না, সুকুমার খাটে পাতা ছোবড়ার গদিতে বসে ওয়াড়হীন ময়লা বালিশ কোলে টেনে নিয়ে হাঁফ ছাড়ার ভান করল।
রবিন্দু বলল, ‘এরকম আরও কয়েকবার তোমাকে দোকান বাজার থেকে জিনিসপত্তর আনতে হবে সুকু। দুটো ঘরে দুটো খাটের গদির যা অবস্থা, ওর ওপর তোষক না পাতলে শুতে পারবে না। চাদর, বেডকভার, বালিশ, দরজা জানলার পর্দা তো সর্বাগ্রে চাই। তারপর আরও কত কী যে লাগবে সেটা সংসার করতে করতে টের পাবে। হোটেলের থেকে টিফিন কেরিয়াবে ভাত এনে কদিন আর চালাবে। কাল সকালে প্রথমেই কেরোসিন আর উনুন কিনে আনব।’
সুকুমার বলল, ‘গ্যাসের ব্যবস্থা নিশ্চয় অফিস করে দেবে।’
বাসন্তী নীচের ঠোঁট উলটে বললেন, ‘এই তোর ফার্নিশড কোয়ার্টার!’ এরকম জানলে দুদিন আগে এসে কেনাকাটা গোছগাছ করে দিতুম, দেখত ছায়ার কত কষ্ট হবে। দুদিন থেকে কতটা আর গুছিয়ে দিয়ে যেতে পারব।’
‘মা জলে না নামিলে কেহ শিখে না সাঁতার। এইবার আমি তোমার বউমার সাঁতার কাটাটা দেখব।’
‘পারবে পারবে, ডুববে না। কী গো ছায়া পারবে না?’ বাসন্তী নিশ্চিন্ত স্বরে বললেন।
ছায়া মনে মনে উত্তেজিত। নতুন ঘর পেতে বসাটা তার কাছে চ্যালেঞ্জের মতো লাগছে। সে বলল, ‘এখন দু—চারদিন পিকনিকের মতো ব্যাপারটা হবে। যে কষ্ট করতে পারবে না সে যেন বাইরে খাওয়ার ব্যবস্থা করে।’ ছায়া আড়চোখে সুকুমারের দিকে তাকিয়ে মুখ গম্ভীর করল।
ছায়া—সুকুমার খুনসুটি দেখে রবিন্দুর মনে হল বিয়েটা ভালোই হয়েছে। মনের মিলটা খুব তাড়াতাড়িই ঘটে গেছে। আসার সময় ট্রেনে দুজনে জানলার ধারে পাশাপাশি বসে বহুক্ষণ গল্প করেছিল। এক সময় রবিন্দুর একটা ক্ষীণ সন্দেহ ছিল ছায়া বোধহয় অমিয়র প্রতি অনুরক্ত। বন্ধুর সুন্দরী বোনের প্রতি দুর্বলতা যেকোনো তরুণেরই ঘটতে পারে। অমিয় সম্পর্কে এটা রবিন্দুর মনে হত। ওর যখন তখন আসা মায়ার মন জুগিয়ে কথা বলা, দরকার দেখলে যেচে সাহায্য করা—এসব থেকেই রবিন্দুর মনে হয়েছিল ছায়ার সঙ্গে অমিয়র মানসিক যোগ গড়ে উঠেছে। কোনো মেয়ের সঙ্গে টানা পনেরো মিনিট কথা বলার সুযোগ আজও তার জীবনে আসেনি, এলে কী হত তাই নিয়ে সে ভাববার অবকাশই পায়নি। বহু ছেলেমেয়ের জীবনে হালকা মেঘের মতো বিয়ের আগে প্রেম উড়ে আসে, আবার উড়ে চলে যায়, ছায়ার ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হয়েছে।
