পূর্ণেন্দু মাথা নেড়ে স্ত্রীর কথাগুলো মেনে নিয়ে বললেন, ‘সুকুমার যদি চাকরিটায় রয়ে যায় তাহলে বোম্বাইতেই থেকে যাবে, এই ফ্ল্যাটে আর ফিরছে না। শুধু ওর বাবা—মা—ই তিনটে ঘর নিয়ে থাকবে।’
রবিন্দু ঠাট্টায় সুরে বলল, ‘মনে হচ্ছে, বাবার যেন হিংসে হচ্ছে।’
‘তা একটু হচ্ছে। যখন কল্যাণের কাছে খবর পেলুম তখন দুটোমাত্র দু—ঘরের ফ্ল্যাট খালি পড়েছিল। অগত্যা তাই নিতে হল।’ পূর্ণেন্দুর স্বরে আপশোস। ‘একটা ছেলে থাকলে ফ্ল্যাটে বাস করে সুবিধে আছে। আগে যদি জানতুম ফ্ল্যাটে এসে উঠতে হবে তাহলে—
‘তাহলে কী?’ মায়া তীক্ষ্ন স্বরে প্রশ্ন ছুঁড়লেন।
‘কিছু না।’ পূর্ণেন্দু খোলার জন্য পাঞ্জাবিটা মাথার উপর দিয়ে গলাতে লাগলেন।
‘জায়গা নেই, চলাফেরা করা যায় না। ঘেঁষাঘেঁষি, ঠাসাঠাসি, এই সব বলে তোমাকে আর গজগজ করতে হবে না। নবু বড়ো ক্লাবে যাচ্ছে, ত্রিশ হাজারে পাকা কথা হয়ে গেছে। আদ্দেক পেমেন্ট পেলেই জমি বায়না করবে বাগুইহাটিতে, ওর সমরেশদা জমি কিনিয়ে দেবে বলেছে, মিস্ত্রি দিয়ে বাড়িও করিয়ে দেবে।’
‘কবে!’ পূর্ণেন্দু প্রত্যাশা আর বিস্ময় মিশিয়ে তাকালেন। ‘নবু এতদূর এগিয়েছে তা তো জানতুম না, একেবারে জমি—বাড়ি পর্যন্ত।’
‘বলবে কী, তুমি কী কখনো খোঁজ রেখেছ না জানতে চেয়েছ। ওর সঙ্গে তো কথাও বলো না।’
‘বলব কী, যদি ক্রিকেট খেলত তাহলে নয় কথা বলা যেত। নবু কতক্ষণ আর বাড়িতে থাকে!’
রবিন্দু গলা ঝেড়ে বলল, ‘এই সমরেশ লোকটা সম্পর্কে কিছু কথা শুনেছি। ওর এলাকায় বাড়ি করতে গেলে নাকি ওকে পাঁচ হাজার টাকা সেলামি দিতে হয় আর ওর কাছ থেকেই বাড়ি তৈরির জিনিসপত্তর কিনতে হবে। তা নইলে বাড়ি তৈরির জন্য জমিতে যে সব মালমশলা এনে রাখা হবে, সব রাতারাতি হাওয়া হয়ে যাবে। ওর একটা বড়ো গ্যাং আছে, রেলের ওয়াগন ভেঙে লুট করে। আমাদের অফিসের একজন বাগুইহাটিতে থাকে, সে বলছিল। সমরেশের ভয়ে নাকি সবাই তটস্থ।’
পূর্ণেন্দু বললেন, ‘নবু বাচ্চচা ছেলে নয়, নিশ্চয় এসব কথা সে জানে।’
মায়া বললেন, ‘জানে নিশ্চয় তবে ওর তো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না, ওকে ভালোবাসে সমরেশের বাড়ির লোকেরা। বড়ো ক্লাবের সঙ্গে কথাবার্তা তো সমরেশই বলছে। বাড়িটা হলে নবু এখানে আর থাকবে না তখন রবুর বিয়ে দোব।’
ক্ষীণভাবে হেসে রবিন্দু বলল, ‘আমার বিয়ে নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।’
‘কেন, কারুর সঙ্গে ভাবসাব হয়েছে নাকি? এখনি পরিষ্কার করে বল। নইলে মেয়ে দেখে কথাবার্তা এগোবার পর তখন বলবি বিয়ের পাত্রী নিজে ঠিক করে রেখে দিয়েছি, তখন লজ্জায় পড়ে যাব।’ মায়ার হালকা সুরের আড়ালে থাকা উৎকণ্ঠা পূর্ণেন্দু ধরতে পারলেন। তাঁর মনে হল মায়া ঠিকই বলেছে, যদি কোনো মেয়েকে ভালো লেগে থাকে তাহলে এখনই তা বলে দেওয়া ভালো। রবুর পছন্দের উপর তাঁদের আস্থা আছে। মায়ার অবশ্য আপত্তি হবে মেয়ে যদি ছোটো জাতের হয়। এটা রবু জানে।
রবিন্দু স্বাভাবিক স্বরে বলল, ‘সেসব কিছু নয়। উন্নতি করতে হলে এখনই খাটার সময়। রোজগার পাঁচ হাজারে না পৌঁছলে বিয়ের কথা ভাবতে রাজি নই। এখন ছায়ার বিয়ের কথাটা ভাবো তো।’
‘রবু ঠিকই বলেছে ছায়ার বিয়ের তারিখ তো চোদ্দোই মাঘ ঠিক হয়েছে। কটা দিন আর বাকি। তোড়জোড় তো এখন থেকেই শুরু করতে হয়।’ পূর্ণেন্দু উঠে গিয়ে ইংরিজি—বাংলা তারিখ দেওয়া ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটালেন।
‘আসার সময় সুকুমার একটা কথা বলল, শুনে ওকে আরও ভালো লাগল।’ মায়া একটা নাটকীয় নীরবতা তৈরি করে দুজনের জিজ্ঞাসু চোখকে সময় দিলেন অধৈর্য হয়ে ওঠার জন্য।
‘বলল, বিয়েতে আমাকে একটা কিচ্ছু দেবেন না, ভাবতে পার?’ মায়ার চোখে ঝিলিক দিল গর্ব ও তৃপ্তির ছটা। ‘এখনকার দিনে এমন ছেলে পাওয়া যায়। সব তো হাত বাড়িয়ে থাকে শ্বশুরবাড়ি থেকে ভিক্ষে পাবার জন্য।’
‘শ্বশুরবাড়িরই তো দোষ। ভিক্ষে দেয় কেন? ভিখিরি তো ওরাই তৈরি করে। সুকুমারের বাবা বলল, শুনলে না, সাড়ে পাঁচ বছর পর জামাই পাবে চল্লিশ হাজার টাকা। এর মানে কী?’ দাঁত চেপে বলল রবিন্দু। ‘ওই মেয়েকে যে বিয়ে করবে সে চল্লিশ হাজার নগদ পাবে, তা ছাড়া হ্যানাতানা নানান জিনিস, গয়নাগাটি এসব তো আছেই।’ রবিন্দু উত্তপ্ত হয়ে উঠে গেল নিজের ঘরে।
দুজনে মুখ চাওয়া—চাওয়ি করলেন। ছেলের হঠাৎ রেগে ওঠার কারণ তাঁরা ভেবে পেলেন না।
‘সুকুমারকে বললুম তুমি নয় নেবে না কিন্তু আমরা যদি মেয়েকে কিছু দিই, বলল দেবেন কিন্তু আমাকে নয়।’
‘কিন্তু তাই বলে খরচ যে কিছু কম হবে তা ভেবো না। লোকজন খাওয়ানো, নানান আনুষ্ঠানিক খরচ, মেয়ের কিছু গয়নাগাটি। এসবেই তো বহু হাজার টাকা বেরিয়ে যাবে।’
‘সুকুমারের মা তো বললেন, শুধু শাঁখা সিঁদুর দিয়ে বউ নিয়ে যাবেন।’
‘ওটা মুখের কথা, ওটা ধরো না। বলেছে কি কত ভরি সোনা চাই?
‘এখন ভরি কত করে, দু—হাজার টাকা?’
‘গয়নার কথা ওঠেইনি। তবে আমি পাঁচ ভরি গয়না গড়িয়ে রেখেছি, দু—বছর আগেই।’
অবাক পূর্ণেন্দু প্রশ্ন করলেন, ‘টাকা পেলে কোথায়?’
‘ছিল আমার কাছে।’
ভ্রূ কুঁচকে পূর্ণেন্দু তাকিয়ে রইলেন ঠোঁট টিপে কঠিন মুখে বসে থাকা মায়ার দিকে। বুঝে গেলেন এই প্রসঙ্গে তাঁর স্ত্রী আর একটিও কথা বলবে না।
