‘আপনারও সুগার?’ সূর্যশেখরকে উৎফুল্ল দেখাল।
‘আমাদের দুজনেরও আছে, আমার কম ওর বেশি।’
বাসন্তী ছোট্ট ঝামটা দিয়ে বললেন, ‘আহা কত যেন বেশি, তোমার পিপি একশো আশি আমার আড়াই শো। মাত্র তো সত্তর বেশি।’
‘ডায়বিটিস শুনেছি বাবা মায়ের থাকলে সন্তানদেরও হতে পারে এটা হেরিডিটারি।’ পূর্ণেন্দু এই বলে প্লেট থেকে একটা খাস্তা কচুরি তুলে প্লেটটা সেন্টার টেবলে রেখে দিলেন।
কথাটা বাসন্তীর কান এড়াল না। তিনি ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘তাই বলে সুকু আর সীমুর আছে ভাববেন না। সুকু তুই তো গত হপ্তায়ই ব্লাডটেস্ট করিয়েছিস, কত হয়েছিল?’
‘একশো নয়।’ সুকুমার কথাটা বলে উঠে গিয়ে আলমারিতে রবীন্দ্র রচনাবলীর ফাঁকে গুঁজে রাখা ব্লাড রিপোর্টটা এনে পূর্ণেন্দুর হাতে দিল। তিনি একবার চোখ বুলিয়ে কাগজটা ফিরিয়ে দিলেন।
সীমন্তি বলল, ‘আমারও সুগার ফুগার নেই।’
মায়া বললেন, ‘না থাকলেই ভালো। তবে এত মিষ্টি খেলে সুগার না থাকলেও সুগার হয়ে যাবে। একটা প্লেট আনুন তুলে দিই।’
হাহা করে উঠলেন সূর্যশেখর, ‘সেকি সেকি, মাত্র তো এই কটা।’
পূর্ণেন্দুর মনে হল যেন প্রদর্শনী খোলা হয়েছে, কত রকমের মিষ্টি খাওয়াতে পারি এবার সেটা দেখো। একই জাতের মিষ্টি চার পাঁচটা শুধু রঙ আর আকৃতিটা ভিন্ন। এরা খাওয়াতে জানে না, টাকা খরচ করতে চায়। প্লেট হাতে নিয়ে রবিন্দু ও ছায়া চুপ করে বসে। বাসন্তী বললেন, ‘তোমরাও কী মায়ের দলে?’
‘হ্যাঁ; সত্যিই এত খাওয়া যায় না।’ রবিন্দু বলল।
‘ছায়া তুমি?’ বাসন্তী শুকনো গলায় হেসে জানতে চাইলেন।
‘আমি দাদার দলে।’ বলেই সে সুকুমারের দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, ‘নিন না এখান থেকে।’
সুকুমারের কাছে প্রস্তাবটা অপ্রত্যাশিত। সে ইতস্তত করছে দেখে প্লেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘ধরুন।’
ছায়ার কণ্ঠস্বরে কী যেন ছিল, সুকুমার উঠে গিয়ে প্লেটটা ধরল। ছায়া একটা সন্দেশ তুলে নিয়ে বলল, ‘সুগার তো নেই, প্লেটটা এবার খালি করে দিন।’
রবিন্দু তার হাতের প্লেট বাড়াল সীমন্তির দিকে। সে একটা কচুরি তুলে নিয়ে বলল, ‘সব খেতে হবে, কোনো ওজর শুনব না। না খেলে প্যাকেট করে বাড়িতে দিয়ে আসব।’
রবিন্দু একসঙ্গে দুটো সন্দেশ মুখে পুরে চিবোতে শুরু করে দিল। দেখে পূর্ণেন্দু কোনোক্রমে হাসি চাপলেন। বেচারা, মেয়েটার প্যাকেট দিতে যাওয়া বন্ধ করতে রবুকে এ বার পুরো প্লেটটাই শেষ করতে হবে।
ছেলে দেখার পর্ব শেষ করে ফিরে আসার সময় সুকুমার ও সীমন্তি তাদের সঙ্গে এল ফ্ল্যাটের দরজা পর্যন্ত। পাশে পাশে হাঁটছিল সুকুমার, মায়া তাকে বলেন, ‘ছায়ার পড়াটা যেন বন্ধ না হয় সেটা দেখো বাবা।’
ব্যস্ত হয়ে সুকুমার বলে, ‘না না পড়া বন্ধ হবে কেন, উনি পড়তে চাইলে নিশ্চয় পড়বেন, আর একটা কথা, যদি কিছু মনে না করেন তো বলি।’
‘বলো।’ মায়ার বুকের মধ্যে দুরু দুরু করে উঠল, কী বলতে চায়? ছায়ার সম্পর্কে কিছু কী? তাদের সামনে চলেছে রবিন্দু তার গা ঘেঁষে সীমন্তি। তাদেরও আগে পূর্ণেন্দু ও ছায়া।
‘আমাকে যতটুকু দেখলেন তাতে কী ধারণা হল আপনার?’
হাঁফ ছাড়লেন মায়া। চলা বন্ধ করে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বললেন, ‘ছায়ার জন্য যেমন ছেলে চাইছিলাম তুমি ঠিক তেমনটি।’
‘আপনারা আমাকে কিছু দেবেন না। দেখেছি তো বিয়েতে কত জিনিস মেয়ের বাড়ি থেকে ছেলেকে দেয়, আপনারা কিন্তু কিছু দেবেন না।’
‘মেয়েকে যদি দি তাহলে কি তুমি আপত্তি করবে?’
‘না, কিন্তু আমাকে নয়।’
রবিন্দুকে জিজ্ঞাসা করল সীমন্তি, ‘আপনি অত সকালে সল্ট লেকে ছেলে পড়াতে যান আবার বাড়ি ফিরে এসে তখুনি অফিস যান। কষ্ট হয় না?’
‘হয়।’
‘বাড়ির কাছে টিউশানি করেন না কেন?’
‘ভালো মাইনে দিলে করব।’
‘কত করে নেন আপনি?’
‘হপ্তায় দুদিন, আড়াই শো টাকা।’
‘আপনার কী খুব টাকার দরকার?’
‘কার না টাকার দরকার হয়।’
সীমন্তি কথা বাড়াল না। পূর্ণেন্দু আরা ছায়া তালা খুলে ফ্ল্যাটের ভিতর ঢুকে গেছে। দরজায় দাঁড়িয়ে সীমন্তি বলল, ‘সকালে অত দূরে গিয়ে না পড়িয়ে আমাকে পড়ান না।’
‘আগে মেয়েদের পড়িয়েছি এখন আর পড়াই না।’ রবিন্দু হালকা চালে কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল।
‘কেন?’
‘ঝামেলা তৈরি হয় সেটা আমার ভালো লাগে না।’ বলেই রবিন্দু বিদায় জানাতে মাথা একবার হেলিয়ে হেসে ভিতরে ঢুকে গেল।
সুকুমারের সঙ্গে মায়া এসে পৌঁছলেন।
‘সীমন্তি, মাঝে মাঝে এসো না, ছায়ার তো বাড়িতে কথা বলার লোকই নেই।’
শুকনো মুখে সীমন্তি বলল, ‘আমি এলে ঝামেলা হবে না তো?’
মায়া ওর গাল টিপে দিয়ে বললেন, ‘একদম হবে না।’
বসার ঘরে ছেলে বউয়ের সঙ্গে বসলেন পূর্ণেন্দু।
‘রবু কেমন লাগল সুকুমারকে, আমার তো ভালোই লাগল, বেশ ভালো লাগল।’ পূর্ণেন্দু ‘ভালো লাগল’—টা পুনরাবৃত্তি করে বুঝিয়ে দিলেন তিনি বিয়েতে মত দিচ্ছেন।
‘আমারও ভালো লেগেছে। কোয়ালিফায়েড, ভালো চাকরি পেয়েছে। দেখতে শুনতে কথাবার্তায় ভালো, নিজেদের ফ্ল্যাট—’
রবিন্দুর কথা শেষ করতে না দিয়ে মায়া ব্যগ্র হয়ে বলে উঠলেন, ‘তিন বেডরুমের ফ্ল্যাট, ছায়ার থাকতে কোনো অসুবিধে হবে না। তাছাড়া ভাইটাইও নেই। বিয়ে হলে বোন তো শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে, গোটা ফ্ল্যাট টাই হবে ছায়া—সুকুমারের। এদিক থেকে ছায়ার যে লাভটা হচ্ছে সেটা ভেবে দেখো!’
