‘ঠিক বলেছ বাবা,’ বাসন্তী উৎসাহে নড়েচড়ে বসলেন। ‘আমিও তাই বলি। পাশের ফ্ল্যাটের শুভেন্দুবাবু এক লাখ টাকা রেখেছে সঞ্চয়িতা নামে একটা কোম্পানিতে। ওকে বাড়ি বয়ে মাসে মাসে নাকি চার হাজার টাকা সুদ দিয়ে যায়, আমাদের নীচের অনুপবাবু রেলের ড্রাফটসম্যান উনি প্রভিডেন্ড ফান্ড থেকে তুলে লাগিয়েছেন ষাট হাজার। আর দেড় বছর পরই রিটায়ার করবেন, মাসে মাসে পান প্রায় আড়াই হাজার। এটা তো উপরি আয়। কী খাওয়া—দাওয়া, জিনিসপত্তর কেনার ঘটা। ওই দেখে উনিও নেচে উঠলেন, টাকা লাগাবেন। অনেক কষ্টে আটকে রেখেছি। বেশি লাভ ভালো নয়। শুনলে তো রবিন্দু কী বলল, সেফ হচ্ছে গরমেন্টের ঘরে টাকা রাখা!’ বাসন্তী হাত বাড়িয়ে সীমন্তির কাছে থেকে চিরুনিটা নিয়ে ছায়ার চুল আঁচড়াতে শুরু করলেন।
মায়া মৃদুস্বরে সুকুমারকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কোয়ার্টার কী ঠিক হয়েই আছে, নাকি চাকরিতে জয়েন করার পর ঠিক হবে।’
‘জয়েন করেই পাব। সেই রকমই তো লিখেছে।’
‘ফার্নিসড কথাটা বলতে কী বোঝায়, খাট পর্দা, বাসনকোশন, উনুন, চেয়ার—টেবিল এই সবই কী?’ মায়া বুঝে নিতে চাইলেন তার মেয়ে প্রথমেই কোনো অসুবিধাগুলোর সামনে পড়বে কিংবা পড়বে না।
‘আমি ঠিক বলতে পারব না।’ সুকুমার জানাল।
মায়া এবার মুখ নীচু করে চাপা স্বরে মোক্ষম প্রশ্নটা করলেন, ‘ছায়াকে তোমার পছন্দ হয়েছে?’
লাল হতে গেলে যতটা ফর্সা হতে হয় সুকুমার ততটা ফর্সা নয় বলে তার গালে শুধু বার্নিশের পোঁচ পড়ল। চোখ নামিয়ে সে বলল, ‘আমি তো ওকে অনেকবার দেখেছি। আমিই তো মাকে ওর কথা বলেছি।’
মায়া বুঝলেন ছেলের চাপে পড়েই এই বিবাহ প্রস্তাব। তার মন প্রসন্ন হয়ে উঠল এই ভেবে, ছায়া বাধ্য অনুগত একটি স্বামী পাবে। মেয়ে বিয়ের পরই আলাদা সংসার পাতবে, তিন কামরার ফ্ল্যাটের ছোটো গণ্ডিতে শ্বশুর শাশুড়ি ননদ নিয়ে ঘর করতে হবে না এটাকে তিনি ছায়ার সৌভাগ্যই বিবেচনা করেছেন। রবু হওয়ার আগে পর্যন্ত শ্বশুরবাড়ির যৌথ পরিবারে তাকে কাটাতে হয়েছে, তিনি জানেন নতুন বউয়ের সংকুচিত, গণ্ডিবদ্ধ আপন ইচ্ছাকে বিসর্জন দেওয়া জীবনটা কেমন হয়। নিজের পরিবারে নিজে কর্ত্রী হওয়ার সুখ ছায়া প্রথম থেকেই পাবে এমন ভাগ্য তাঁর নিজের হয়নি। এই বিয়েটা তাই মনেপ্রাণে তিনি চাইছেন।
‘তোমার সঙ্গে বিয়ের কথা পাড়তেই ছায়া একবাক্যে হ্যাঁ বলে দেয়।’
মায়া দেখলেন কথাটা শুনে সুকুমারের মুখ ভিজে উঠল তরল আবেগে। সে আবার ছায়ার দিকে তাকাল। ছায়া হেসে কথা বলছে বাসন্তীর সঙ্গে।
‘রান্না তো মা আমাকে করতেই দেয় না। অন্য কারুর হাতের রান্না বাবা মুখে দিতে পারেন না, কী করে আমি তাহলে শিখব?’
সীমন্তি প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বলল, ‘আমারও ঠিক তাই, মা তো রান্নাঘরে ঢুকতেই দেয় না, শ্বশুরবাড়িতে যে কী খোঁটা খেতে হবে তা ভেবে এখন থেকে আমার ভয় ধরে যাচ্ছে।’
‘আচ্ছা খুব হয়েছে।’ বাসন্তী মেয়েকে কপট ধমক দিলেন। ‘খোঁটা দেবে না এমন একজন ভালো শাশুড়ির ঘরে তোর বিয়ে দোব।’ এই বলে তিনি মায়ার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
সূর্যশেখর চেয়ার থেকে ঝুঁকে পড়লেন রবিন্দুর দিকে। ‘নগদে না চেকে দিতে হবে?’
‘চেকে দিলে মাসখানেক কী দেড়েক দেরি হবে সার্টিফিকেট পেতে, নগদে দিলে পরের দিনই পাবেন।’
‘হাজার কুড়ি টাকা, ব্যাঙ্ক থেকে তুলে রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে নিয়ে আসব।’
সূর্যশেখর চিন্তাগ্রস্ত কণ্ঠে বলতে লাগলেন, ‘যা দিনকাল! রোজই তো কাগজে দেখছি রাহাজানির খবর। এই তো কালই পড়লুম পেট্রল পাম্পের প্রায় লাখ টাকা ব্যাঙ্কে জমা দিতে যাচ্ছিল কর্মচারী, তাকে ভোজালি মেরে টাকার থলি ছিনিয়ে, ভিড় রাস্তার মধ্যে দিয়েই ছুটে পালাল দুটো লোক। ধরা পড়েনি।’ সূর্যশেখরের বিস্ফারিত দৃষ্টি রবিন্দুকে মজা পাওয়াল। অদ্ভুত গোলাকার চোখ। বোঝা যাচ্ছে বাপের কাছ থেকে সীমন্তি পেয়েছে।
রবিন্দু হেসে বলল, ‘চেকটা আমাকে দেবেন আমিই ভাঙিয়ে নিয়ে নগদ টাকা পোস্ট অফিসে জমা দিয়ে, সার্টিফিকেটটা আপনাকে এনে দেব। আপনার আর মাসিমার নামে জয়েন্টলি করবেন তো?’
‘না না না, সীমন্তির নামে করব। এটা হবে ওর বিয়ের যৌতুক। মানে সাড়ে পাঁচ বছর পর চল্লিশ হাজার টাকাটা তো ওর স্বামীই পাবে। সুকুর বিয়েটা চুকুক, তারপর চেকটা তোমায় দেব।’
পূর্ণেন্দু চুপ করে দেখে ও শুনে যাচ্ছেন। তার মনে হচ্ছে একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে এরা কথা বলছে। রবুকে কী ওরা সীমন্তির সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়? তাহলে এরা ভুল চিন্তা করছে। এই মেয়েকে পুত্রবধূ হিসেবে তিনি ভাবতে রাজি নন। তিনি নিশ্চিত রবুও রাজি হবে না। পাঞ্জাবির হাতা টেনে তুলে ঘড়ি দেখলেন। বাসন্তীর সেটা নজরে পড়ল।
‘একটু মিষ্টিমুখ এবার হোক।’
সূর্যশেখর স্ত্রীর হয়ে কথার খেই ধরে বললেন, ‘আজ প্রথম এলেন, একটু মিষ্টি মুখে না দিয়ে ছাড়ি কী করে। গেরস্তর অকল্যাণ হবে।’
‘অগত্যা’! এমন একটা ভাব দেখালেন পূর্ণেন্দু। কিছু যে এরা খেতে দেবেই সেটা তো জানা কথা। বাসন্তী আর সীমন্তি রান্নাঘরে গিয়ে চারটে প্লেট হাতে নিয়ে ফিরল।
‘সামান্য একটু, হাতে হাতেই দিচ্ছি।’ বাসন্তী এই বলে তার হাতের প্লেট দুটো পূর্ণেন্দু ও মায়ার হাতে তুলে দিলেন। সীমন্তি দিল বাকি দুজনের হাতে। আট দশটি নানান আকৃতির ও রঙের সন্দেশ, রাজভোগ ও খাস্তার কচুরি ভরা প্লেটের দিকে তাকিয়ে পূর্ণেন্দু বললেন, ‘আমি তো মিষ্টি খাই না, আর খেলেও এতগুলো অসম্ভব।’
