বাসন্তী ছেলেকে পূর্ণেন্দু ও মায়ার মাঝে সোফায় বসিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এই দেখুন ছেলেকে।’ তিনি গিয়ে বসলেন অন্য সোফাটিতে ছায়ার পাশে। পূর্ণেন্দু বিব্রত বোধ করলেন। কথা বলতে হবে, কিন্তু কী কথা বলবেন? বিজ্ঞানের কিছুই জানেন না, তিনি ইতিহাসের লোক। একে কী জিজ্ঞাসা করা যায় পলাশীর যুদ্ধে নবাবের ফৌজের হার কী কী কারণে হয়েছিল? ছায়া মুখ ঘুরিয়ে আলমারির দিকে তাকিয়ে রবীন্দ্র রচনাবলী দেখছে। রবু ফর্সা মুখটা লম্বা করে কাঠ হয়ে বসে কেননা সীমন্তি একদৃষ্টে তার মুখের দিকে তাকিয়ে। একঘর লোকের মাঝে একটি তরুণের মুখের দিকে পরিচয় না থাকা কোনো তরুণী এভাবে তাকিয়ে থাকলে, পূর্ণেন্দুর ধারণায় মেয়েটি বেহায়া অথবা বোধ বুদ্ধিহীনা।
তুমি কোন স্কুলে পড়েছ? অবশেষে পূর্ণেন্দু শুরু করতে পারলেন।
‘হিন্দু স্কুলে।’ সুকুমারের গলাটি মিহি, নম্র স্বর, প্রায় শোনাই গেল না।
‘কলেজ?’
‘প্রেসিডেন্সি।’
‘রবীন্দ্র রচনাবলী কি তুমি কিনেছ?’
‘না।’
পূর্ণেন্দু তাকালেন বাসন্তীর দিকে। ছায়ার একটা হাত কোলে নিয়ে বাসন্তী তখন অভিযোগের সুরে বলছেন, ‘সাজগোজের দিকে এত অমনোযোগী কেন, মুখে একটু কিছু তো লাগাবে, চুলটাও ঠিকমতো বাঁধোনি।’
ছায়া উত্তর না দিয়ে হাসল। মায়া বললেন, ‘ও ছোটোবেলা থেকেই অমন। নিজের সম্পর্কে একটুও হুঁশ নেই।’
বাসন্তী বললেন, ‘সুন্দর মেয়েরা ধরেই নেয় তাদের আর সাজগোজের দরকার কী, খোদার উপর খোদকারী না করলেও চলে। সাজলে—গুজলে রূপ যে আর একটু খোলে তাতে পাঁচটা লোকের যে চক্ষু সার্থক হয় এটা ওরা বোঝে না।’
পূর্ণেন্দু দেখলেন ছায়ার চোখে বিরক্তি ভেসে উঠেই মিলিয়ে গেল।
‘তুমি রবীন্দ্রনাথ পড়েছ?’ পূর্ণেন্দু সুকুমারকে নিয়ে পড়লেন।
‘সব নয়, কিছু কিছু।’
‘ওর কোনো রচনা তোমার ভালো লাগে, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ না নাটক?
‘কবিতা।’
পূর্ণেন্দু ইচ্ছে হল বলতে, একটি কবিতা আবৃত্তি করে শোনাবে? বললেন না।
‘রবীন্দ্রসংগীত?’
‘রোজ রাতে শুনি, ক্যাসেট।’
পূর্ণেন্দু ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার নম্বর দিলেন সুকুমারকে।
সূর্যশেখর একটা চেয়ারে বসেছিলেন। তিনি রবিন্দুকে নিঃসঙ্গ দেখে আলাপ শুরু করলেন।
‘তুমি কী কর?’
‘একটা অডিট ফার্মে কাজ করি, ল পড়ি আর হায়ার সেকেন্ডারির দুটো কমার্সের ছেলেকে পড়াই।’
‘তাহলে তো সারাদিনই ব্যস্ত থাকো, কাজের লোক!’ সূর্যশেখরের গলায় তারিফ ধরা পড়ল।
মায়ার কান ওদের কথার দিকে ছিল, বললেন, ‘কাজের লোক বললে তো কম বলা হবে। এর উপর রয়েছে ইউনিট ট্রাস্ট, এল আই সি, পোস্টাপিসের এজেন্সি!’
সূর্যশেখর মুগ্ধ চোখে রবিন্দুর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘অ্যাত্তোসব! ভাবতেই পারি না। মনে হয় নাওয়া—খাওয়ার সময় পাও না, ঠিক কিনা?’
সীমন্তি আঁকপাকু করছিল রবিন্দুর সঙ্গে কথা বলার জন্য। এবার সে সুযোগ নিল। ‘আপনি স্কুলের ছেলেদের পড়ান, কলেজের মেয়েদের পড়ান না?’
‘সময় কোথায়।’ রবিন্দুর স্বর আড়ষ্ট।
সীমন্তি আবদারে গলায় বলল, ‘করুন না একটু সময়, তা হলে আমি আপনার কাছে অ্যাকাউন্টেন্সিটা পড়তুম।’
ছায়া বাদে ঘরের সবাই রবিন্দুর মুখের দিকে তাকাল। দাশগুপ্তদের চোখে ফুটে রয়েছে সম্মতি পাবার প্রত্যাশা। গুপ্তদের চাহনিতে দ্বিধা, অস্বস্তি। পূর্ণেন্দুর মনে হল মেয়েটি গায়ে পড়া।
মায়া হিসেবি গলায় বললেন, ‘যদি সময় করে উঠতে পারে তাহলে পড়াবে না কেন, নিশ্চয় পড়াবে।’
সীমন্তি অধৈর্য বাচ্চচার মতো পা ঠুকে দু হাত ঝাঁকিয়ে বলল, ‘না মাসিমা না, সময় করতেই হবে। কোনো কথা শুনব না। অ্যাকাউন্টেন্সিতে আমি ঠিক ফেল করব।’
মায়া সান্ত্বনা দেবার ভঙ্গিতে বললেন, ‘যখন তোমার দরকার পড়বে যেও, রবু নিশ্চয় পড়া দেখিয়ে দেবে।’
পূর্ণেন্দুর মনে হল, ছায়ার এই সম্বন্ধটা জমাট করে তোলার জন্যই মায়া কথাটা বলল, নয়তো এককথায় নাকচ করে ওর আহ্লাদীপনা ঘুচিয়ে দিত।
‘ঠিক বলছেন তো? আমি কিন্তু তাহলে কালই যাব।’
রবিন্দুর করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে পূর্ণেন্দুর মনে হল ছেলেকে বাঁচানো দরকার। তিনি বললেন, ‘সূর্যবাবু যা বললেন, রবুর সত্যিই নাওয়া—খাওয়ার সময় নেই। ভয় হয় অসুখবিসুখে না পড়ে যায়। কিছুদিন আগেই জন্ডিস থেকে উঠল। এখন ওর রেস্ট দরকার। বিয়েটা চুকে যাক তারপর তুমি পড়তে এসো বা রবু এসে পড়িয়ে যাবে।’
জন্ডিস তো নয়ই গত এক বছরে রবিন্দুর সর্দি পর্যন্ত হয়নি। নিরীহ মিথ্যাটা বলে নিজের বুদ্ধির প্রমাণ দাখিল করতে পেরে পূর্ণেন্দু মায়ার প্রশংসিত চোখ দেখার জন্য মুখ ফেরাতেই দেখলেন সুকুমার ছায়ার দিকে জ্বলজ্বল চোখে তাকিয়ে এবং ছায়া সোফায় হেলান দিয়ে লক্ষ্মীসরার দিকে তাকিয়ে আনমনে কানের পাশের চুল টেনে যাচ্ছে। তাচ্ছিল্য স্পষ্ট ওর বসার ভঙ্গিতে।
বাসন্তী বললেন, ‘সীমু চিরুনিটা আনত ছায়ায় চুলটা আঁচড়ে দি। এত সুন্দর চুল অথচ যত্ন নেয় না।’
ছায়া প্রতিবাদ করে উঠতে যাচ্ছিল। মায়া কড়া চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে তাকে নিরস্ত করলেন।
সূর্যশেখর রবিন্দুর দিকে ঝুঁকে বললেন, ‘ভাবছি কিছু টাকা ইনভেস্ট করব, কিসে লাগান যায় বল তো? করলে অবশ্য তোমাকে দিয়েই করাব।’
‘ইউনিট ট্রাস্টে করতে পারেন, এল আই সি—রও কয়েকটা ভালো স্কিম আছে, পোস্ট অফিসে এন এস সি কিনতে পারেন সাড়ে পাঁচ বছরে টাকা ডবল হবে। বাজারে অনেক নন—র্যাঙ্কিং চিট ফান্ড কোম্পানি হয়েছে, প্রচুর সুদ দেয়, আমার মনে হয় সুদের লোভে ওসব জায়গায় টাকা রাখা ঠিক হবে না। সেফ হচ্ছে গভর্নমেন্টের ঘরে টাকা রাখা।’
