‘না।’ মায়া জবাব দিয়েই যোগ করলেন, ‘বাবার পছন্দ হয়েছে তারপর আর জিজ্ঞাসা করার কী থাকতে পারে!’
‘এখন অন্যরকম দিনকাল, ছায়ার মতটা জানা দরকার। তোমার আমার পছন্দ হলেই তো হবে না। মেয়েরও নিজস্ব পছন্দ আছে।’
‘মত জানতে তুমিই ওর সঙ্গে কথা বল।’ মায়া দায়টা স্বামীর ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেও তাকে নিশ্চিন্ত দেখাল না।
আধঘণ্টা পর ছায়া কলেজ থেকে ফিরল। তারও আধঘণ্টা পরে পূর্ণেন্দু ছায়াকে ডাকলেন।
‘আজ একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটেছে। বিকেলে কলিংবেল বাজতে দরজা খুলে দেখি এখনকার এক মহিলা দাঁড়িয়ে। তুই নিশ্চয় তাকে দেখেছিস, বি ব্লকের দোতলায় চার নম্বর ফ্ল্যাটে থাকে।’
ছায়া বলল, ‘দাসগুপ্ত?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ।’
‘ওদের মেয়ের সঙ্গে অনেকদিন আগে একবার পরিচয় হয়েছিল, ডাল, বেশিক্ষণ কথা বলা যায় না। খুব সিনেমা দেখে আর শুধু তারই গপ্পো। মহিলা মানে ওর মা এসেছিল, হঠাৎ?’
‘ওর একটি ছেলে আছে তারই জন্য বিয়ের সম্বন্ধ করতে।’ কথাটা বলে পূর্ণেন্দু মেয়ের মুখভাব লক্ষ করতে লাগলেন, ছায়ার কৌতূহলী মুখ পলকের জন্য গম্ভীর হয়ে স্বাভাবিক হল।
‘সম্বন্ধ কি আমার সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্য?’ সহজ স্বরে ছায়া জিজ্ঞাসা করল।
‘হ্যাঁ।’ পূর্ণেন্দু আটকে যাওয়া শ্বাসটা স্বস্তিতে বার করলেন। ‘ছেলেটি লেখাপড়া করেছে। এম. টেক.। বোম্বাইয়ে ভালো একটা চাকরি পেয়েছে। ওখানেই থাকবে। ছেলেটিকে নিশ্চয় দেখেছিস, সুকুমার নাম।’
স্বাভাবিক স্বরে ছায়া বলল, ‘হ্যাঁ দেখব না কেন। ভালো ছেলে। তুমি দেখেছ?’
‘হয়তো দেখেছি। এখানে তো কতই ছেলে রয়েছে। আমার পক্ষে ছেলেছোকরাদের সঙ্গে আলাপ করা তো সম্ভব নয়। রোববার ছেলেটিকে দেখতে যাব। কিন্তু তার আগে তোর মতামত আমাদের জানা দরকার। অমত থাকলে ওদের জানিয়ে দেব আর মত থাকলে দেখতে পাব।’ পূর্ণেন্দু অনুভব করছেন জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবার ছায়াকে নিতে হবে। যদি হ্যাঁ বলে তাহলে তো সমস্যার কিছু থাকবে না। যদি না বলে তাহলে সমস্যা তৈরি করবে ওর মা।
‘তুমি বললে বিয়ের পর বোম্বাইয়ে থাকবে, তাই তো?’ ছায়া যাচাই করার জন্য প্রশ্নটা করল।
‘হ্যাঁ তাই তো বললেন ভদ্রমহিলা।’
ছায়া দ্বিতীয়বার আর ভাবল না, বলল, ‘আমার আপত্তি নেই। তুমি রোববার গিয়ে ছেলে দেখে আসতে পার।’
‘তোকেও যেতে হবে। উনি চান তুইও সুকুমারের সঙ্গে আলাপ করিস। রবুকেও যেতে বলেছেন।’
ছায়া অসহায়ের মতো গলায় বলল, ‘আমি আবার কী আলাপ করব। বিয়ে যখন হবেই তখন এইরকম আলাপটা একেবারেই ফালতু ব্যাপার। ধরো আলাপ করে খুব খারাপ লাগল, তাহলে কি সম্বন্ধ ভেঙে যাবে?’
পূর্ণেন্দু জবাব দিলেন না। ছায়ার নিস্পৃহভাবে কথা বলার ধরনটা তাকে ভাবাল। বিয়ের কথায় যে স্বাভাবিক লজ্জা মেয়েদের চোখেমুখে আলতো একটা মেদুর প্রলেপ লাগায় ছায়ার মুখে বা কণ্ঠস্বরে তার ছিটেফোঁটাও তিনি পাচ্ছেন না। ও কি বাবা—মাকে খুশি করার জন্য অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজি হল!
‘তুই ভেবে চিন্তে মত দিচ্ছিস?’
‘হ্যাঁ দিচ্ছি। বিয়ে একদিন না একদিন তো করতেই হবে।’
‘রোববার আমরা তাহলে যাচ্ছি, তুইও।’
রবিবার বিকেলে সদরে তালা দিয়ে ওরা চারজন দাসগুপ্তের ফ্ল্যাটের উদ্দেশে রওনা হল। বেরোবার আগে মারা আলমারিতে রাখা শাড়ির তলা থেকে, পূর্ণেন্দু পাঁচ বছর আগে কলেজে যেতেন যে পাটকরা চাদরটি বাঁ কাঁধে ফেলে, সেটি বার করে হাতে দিয়ে বলেন, ‘এটা নাও।’ অনেকদিন পর চাদরটি ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে তিনি খুশি হলেন। রবিন্দু মন্তব্য করে, ‘বাবাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন ফর্মে আবার ফিরে এসেছে।’ ছায়াকে সিল্কের শাড়ি পরতে বলেছিলেন মায়া, সে পরেনি। বলেছিল, ‘আমি তো ছেলে দেখতে যাচ্ছি, দরকার কী আমার সাজগোজের।’ নবেন্দু প্রতি রবিবার সকালেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ফেরে রাত্রে। ফিরে বলে ‘সমরেশদার বাড়িতে খাইয়ে দিল।’
কলিং বেলের বোতাম টিপল রবিন্দু। তার পিছনে পূর্ণেন্দু সবার শেষে দাঁড়িয়ে ছায়া। দরজা খুলল সুকুমারের বোন সীমন্তি। মুখে হাসি ছড়িয়ে বলল, ‘আসুন।’
ঘোর কৃষ্ণবর্ণ গায়ের রঙ, ঘনজোড়া ভুরু, নীচের ঠোঁটটি উপরের তুলনায় পুরু তাতে গাঢ় লাল রঙ, লাল রিবন বাঁধা কোঁকড়া চুল পিঠে ছড়ান, কপালটি ছোটো। লম্বা দেহ, ছিপছিপে গড়ন। একে দেখে কেউ মেলাতে পারবে না বাসন্তীর সঙ্গে। সীমন্তি যার মুখশ্রী ও রঙ পেয়েছে তিনি পিছনেই দাঁড়িয়ে হাত জোড় করে অভ্যর্থনা জানালেন। ছ—ফিটের উপর লম্বা, শীর্ণ দেহ কোমর থেকে নোয়ানো, মাথার সামনের অর্ধেকটায় চুল নেই, সিল্কের পাঞ্জাবি চেক লুঙ্গি পরনে, দু—হাতের আঙুলে পাথর বসানো চারটি আংটি।
‘আসুন আসুন, আমি সুকুমারের বাবা সূর্যশেখর গুপ্ত।’ মাথা নোয়ালেন বিনয় দেখিয়ে। কথা বলার সময় সামনের বড়ো বড়ো দাঁতগুলো বেরিয়ে পড়ল।
চন্দনধূপের গন্ধে ঘর ম—ম করছে। ঘরটা বড়ো। দেওয়াল ঘেঁষে সমকোণে দুটি সোফা। দুটি চেয়ার, কাচের ছোটো সেন্টারটেবল। টেবলে ফুলদানিতে রজনিগন্ধার ছড়। বিপরীতে একটা কাচের পাল্লার আলমারিতে রবীন্দ্র রচনাবলীর সেট, কৃষ্ণনগরের মাটির পুতুল লক্ষ্মীসরা দেওয়ালে সাঁটা। একসঙ্গে বসা রামকৃষ্ণ—সারদামণির রঙিন ছবি ছাড়া আর কোনো ছবি নেই। ছবিতে বেলফুলের মালা জড়ানো, চন্দনের ছিটে লাগা। ঘর দেখে যেমন প্রীত হলেন পূর্ণেন্দু তেমনি সন্দিহানও। ছেলেও কী হবে নাকি বাবার মতো দেখতে? আস্বস্ত হলেন বাসন্তীর সঙ্গে সুকুমারকে ঢুকতে দেখে, মা হাত ধরে টেনে আনলেন নত মুখ লাজুক ছেলেকে। পূর্ণেন্দু হাঁফ ছাড়লেন, সুকুমার মায়ের মতোই দেখতে। সাধারণ উচ্চচতা, একটু মোটা গড়ন, পাজামা পাঞ্জাবি পরে থাকলেও পূর্ণেন্দুর মনে হল সামান্য ভুঁড়ি আছে। পাতাকাটা চুলের ডগা কপালের উপর এসে পড়েছে। বয়স তিরিশের নীচে মনে হয়, সুকুমারকে বোধহয় আবাসনেই দেখে থাকবেন, মুখটা চেনা লাগছে।
