‘নিশ্চয়’। অপ্রত্যাশিত আনন্দের ধাক্কায় মায়ার বুকের মধ্যে হাসফাঁস শুরু হল। তিনি কয়েকদিন ধরেই ভাবছিলেন অমিয়র প্রতি টানটা থেকে ছায়াকে বার করে আনতে হলে এখুনি ওকে একটা ভালো ছেলের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া দরকার। বিএ পাশ করার জন্য অপেক্ষা করে থাকার নেই। ওদের সম্পর্কটা কতটা গভীর তা তিনি জানেন না। বিয়ের ব্যবস্থা করলে ছায়া বেঁকে বসবে কিনা, সেটাই শুধু তাকে উদবিগ্ন করে তুলল।
‘সুকুর এখন মাইনে হবে তিন হাজার টাকা, ফার্নিশড কোয়ার্টার পাবে। ওর ইচ্ছে একেবারে বউ সঙ্গে নিয়েই কাজে জয়েন করবে।’ গুপ্ত দম্পতির মুখভাবে আপ্লুত ভাব লক্ষ করে বাসন্তীর কণ্ঠস্বরে ভারিক্কি চাল এসে গেল।
‘কিন্তু ছায়া তো এখন সেকেন্ড ইয়ারে। গ্র্যাজুয়েশনটা তাহলে হবে না এখন বিয়ে হলে।’ পূর্ণেন্দু দোটানা ভাব দেখালেন।
বাসন্তী বললেন, ‘বোম্বাইয়ে গিয়েও তো পড়াশুনো চালাতে পারবে।’
মায়ার কপালে ভাঁজ পড়ল। পূর্ণেন্দু আবার পড়াশুনোর ফ্যাকড়া তুলল কেন? যত তাড়াতাড়ি ছায়ার বিয়ে হয়ে যায় ততই ভালো। এমন ছেলে হাতছাড়া করলে আর কী এত ভালো পাত্র পাওয়া যাবে। দরকার কী ছায়ার বি.এ. পাশ করার, ওতো আর চাকরি করতে যাবে না। মায়া তাড়াতাড়ি বাসন্তীর কথার খেই ধরে জুড়ে দিলেন, ‘বোম্বাইয়ে অনেক ভালো ভালো কলেজ আছে শুনেছি, ছায়ার কোনো অসুবিধে হবে না।’
পূর্ণেন্দু মায়ার কথার ইঙ্গিতটা বুঝতে পারলেন। কুণ্ঠিতভাবে বললেন, ‘সুকুমারকে তো একবার দেখতে হয়, একটু আলাপ করতে পারলে ভালো হত।’
‘নিশ্চয় আলাপ করবেন। যাকে জামাই করবেন তাকে তো আগে যাচাই করে নেবেনই। আলাপ করে আপনি খুশিই হবেন। একটু লাজুক মুখচোরা, স্বভাবটা খুব শান্ত। গান ভালোবাসে, কোনোরকম নেশা নেই, সব সময় বই হাতে। আসুন না রবিবারে, উনি সিটি সিভিল কোর্টে চাকরি করেন। ছায়াকেও সঙ্গে করে আনবেন, সেও দেখুক তারও তো পছন্দের ব্যাপার আছে। আপনার বড়ো ছেলেটিও যদি আসে তাহলে খুবই ভালো হয়, ভারী সুন্দর দেখতে, সিনেমায় নামার মতো চেহারা।’
বাসন্তীর কথা থেকে দুজনেই বুঝল এই বিবাহ প্রস্তাবের পিছনের কারণ ছায়ার সৌন্দর্য। রবিন্দু এই আবাসনের সকলের চোখে পড়েছে। তার কান্তির জন্য।
‘বিয়েটা হলে, কবে দিতে চান?’ মায়া জানতে চাইলেন।
‘পয়লা ফেব্রুয়ারি আঠারোই মাঘ সুকুর জয়েনিং ডেট। চোদ্দোই মাঘ বিয়ের একটা তারিখ আছে সেদিনই হতে পারে।’ বাসন্তী জানালেন।
পূর্ণেন্দুর মনে হল বাসন্তী দাশগুপ্ত বিয়ের তারিখ পর্যন্ত ঠিক করে বলতে এসেছেন। উনি ধরেই নিয়েছেন এই বিবাহ প্রস্তাব গুপ্ত পরিবার খারিজ করতে পারবে না, করার মতো জোরালো অবস্থা নয়। দু ঘরের ফ্ল্যাটে যারা বাস করে তাদের পুঁজিপাটা কতটা থাকতে পারে সে সম্পর্কে এই মহিলা যেন স্বচ্ছ একটা ধারণা তৈরি করে রেখেছেন। পূর্ণেন্দুর ইচ্ছে করল বিয়েটায় রাজি না হয়ে ধারণাটা ভেঙে দিতে। চার—পাঁচ সেকেন্ড পরেই তিনি ইচ্ছেটা প্রত্যাহার করে নিয়ে হাঁফ ছাড়লেন। মনে মনে নিজেকে বললেন বয়স হয়েছে, এখন তুমি অবসরপ্রাপ্ত এখন যে কোনোরকম হঠকারিতা তোমার বা পরিবারের পক্ষে হিতকর হবে না। তুমি এখন আর কলেজের প্রিন্সিপ্যাল নও, এই মহিলাও তোমার ছাত্রী নন। এর ছেলেটি সোনার টুকরো তার সঙ্গে তোমার মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সুযোগটা নষ্ট কোর না।
মায়া চিন্তিত স্বরে বললেন, ‘মাঘ মাস তো এসে গেল আর তো মাত্র ক—টা দিন হাতে। এর মধ্যে সবকিছু জোগাড়যন্ত্র করা তো সম্ভব হয়ে উঠবে না।’
বরাভয় দেবার ভঙ্গিতে বাসন্তী ডান হাত তুলে বললেন, ‘আরে রাখুন তো জোগাড়যন্ত্র। শুধু শাঁখা সিঁদুর দিয়েই বউ নিয়ে যাব। ঠাকুরের কৃপায় আমার কোনো অভাব নেই।’ বাসন্তী উঠে দাঁড়ালেন। ‘ছায়া বোধহয় কলেজে, কোনোদিন কথা বলা হয়নি ওর সঙ্গে। রবিবার বিকেলে তাহলে আসছেন বড়ো ছেলে আর ছায়াকে নিয়ে।’
বাসন্তীকে বাড়ির বাইরে মাঠ পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন পূর্ণেন্দু ও মায়া। ফ্ল্যাটে ফিরে এসে পূর্ণেন্দু বললেন, ‘কথা থেকে মনে হল আমাদের সম্পর্কে ভালোই হোমওয়ার্ক করে তবে এসেছেন। নবুর নাম পর্যন্ত করল না। থানা পুলিশ কোর্ট জামিন করেছে বলেই বোধহয় ক্রিমিনাল তাই নবুকে যেতে বলল না। কিন্তু আমরা তো ওদের সম্পর্কে কিছুই জানি না। ওরা বদ্যির ছদ্মবেশে নমোশুদ্দুর কিনা, ছেলেটি আসলে এম. টেক. না হায়ার সেকেন্ডারি, বোম্বাইয়ের চাকরিটা বেয়ারার না প্ল্যানারের এ সবের খবরাখবর নেওয়া দরকার, কিন্তু কে নেবে? ছেলেটিকে শুধু চোখের দেখা দেখে আর দুটো কথা বলেই কী সব জানা বোঝা হয়ে যায়? শরীরে কোনো রোগ—টোগ আছে কিনা সেটাও তো জানা যাবে না। তবু ভালো কুষ্ঠি—ঠিকুজির কথা তোলেনি।’
.
‘হ্যাঁ এতেই সব জানা বোঝা হয়ে যায়।’ মায়া হালকা গলায় বললেন। এখন তার সারা দেহে বইছে স্বস্তির আর সুখের প্রবাহ। ছায়ার জন্য এমন একটা সুপাত্র বাড়ি বয়ে এসে ধরা দেবে, এমন ব্যাপার তো রূপকথার গল্পেই ঘটে। ‘আমার বাবা তো তোমাকে মিনিট দশেক দেখেই পছন্দ করেছিল, বাড়িতে এসে বলেছিল একটা ভালো ছেলে পেয়ে গেছি।’ মায়া অনেকদিন পর তার যৌবনকালের হাসি হাসলেন।
পূর্ণেন্দু বললেন, ‘ছায়ার মতামতটা আগে নেওয়া উচিত। আমরা রাজি হলেই তো হবে না যার বিয়ে তাকে আগে জিজ্ঞাসা করা দরকার। তোমাকে করেনি?’
