‘তুমি এখন যাও ছায়া।’
‘তাড়িয়ে দিচ্ছ।’
অমিয়র এতক্ষণের কাঠিন্য, কণ্ঠের কর্কশতা এবার ভেঙে পড়ল। তার মুখে বেদনার আভাস ফুটে উঠল। গাঢ়স্বরে প্রায় অস্ফুটে সে বলল, ‘ছায়া এই বুকের মধ্য থেকে জীবনে কখনো তোমার ছায়া সরবে না। আমার কষ্ট আমার যন্ত্রণা আমার ভালোবাসা আজীবন তোমার ছায়াকে ঘিরে থাকবে।’ অমিয়র গলা কেঁপে উঠল। সে আলতো করে হাত রাখল টেবিলে রাখা ছায়ার হাতের উপর।
‘ভালোবাসার থেকেও বড়ো হল তোমার জেদটা।’ ছায়ার গলার অভিযোগ আর অভিমান।
অমিয় হাসার চেষ্টা করলে তাইতে মুখটা বিকৃত হয়ে উঠল। ‘পুরুষ মানুষের অনেক রকম দোষ থাকে যেগুলো সে কাটিয়ে উঠতে পারে না বা চায় না তার একটা হল আত্মমর্যাদা বোধ। এটা নষ্ট হলে আমি আর আমি থাকব না।’
দোকানে ঢুকল এক প্রৌঢ় দম্পতি। তারা তিনটি ড্রেসিং টেবিলের একটির সামনে দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে দেখতে শুরু করল। একজন কর্মচারী গেল তাদের কাছে। ছায়া উঠে দাঁড়াল, ‘আমি যাই। তবে জেনে রেখো মর্যাদাবোধটা মেয়েদেরও আছে। আমি আর কখনো আসব না।’
অমিয় ছায়ার সঙ্গে দোকানের দরজা পর্যন্ত গেল। ছায়া আর একটি কথাও বলল না, অমিয়র চোখে লহমার জন্যও চোখ রাখল না। দোকান থেকে বেরিয়ে সে ক্লান্ত মন্থর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। যতক্ষণ ওকে দেখা যায় অমিয় দেখল।
এরই দিন কুড়ি পর বিকেলে কলিংবেল বাজতে পূর্ণেন্দু দরজা খুললেন। এখানকারই এক গৃহিণী দাঁড়িয়ে থাকে তিনি সন্ধ্যাবেলায় আবাসনের মধ্যে একাকী প্রায় পনেরো মিনিট ধরে জোরে হাঁটতে দেখেন। সম্ভবত সুগারটা বেশি। চোখে চশমা, ফর্সা গায়ের রঙ, মুখ সুশ্রী। বয়স পঞ্চাশ পঞ্চান্নর মধ্যে। থাকেন বোধহয় তিন ঘরের ‘বি’ ব্লকের দোতলায় শুভেন্দু হালদারের পাশের ফ্ল্যাটে। পূর্ণেন্দু অবাকই হলেন। তার পাশের ফ্ল্যাটের বউটি ছাড়া গত ছ—বছরে আর কাউকে বিশেষ আসতে দেখেননি।
ভদ্রমহিলা ঘোমটায় ছোটো একটা টান দিয়ে লাজুকভাবে হাসলেন, বাধ্য হয়ে পূর্ণেন্দুও হাসলেন এবং সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল তার গেঞ্জির বগলটা ছেঁড়া।
‘মিসেস গুপ্ত আছেন?’
‘আছেন, ভেতরে আসুন।’
মায়া চা করেছিলেন, রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
ভদ্রমহিলা বললেন, ‘এত দিন একসঙ্গে রয়েছি প্রায় রোজ তো আপনাদের দেখি অথচ আলাপ পরিচয় হয়নি।’
পূর্ণেন্দু প্রায় বলতে যাচ্ছিল, সেটা কী এতদিন পর মনে পড়ল। নিশ্চয় কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে ইনি এসেছেন।
মায়া হেসে বললেন, ‘আমিও তো আপনাকে রোজ দেখি সন্ধেবেলায় আমার বারান্দার সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। অবশ্য তখন আপনাকে দাঁড় করিয়ে আলাপ করা সম্ভব নয়। আসুন ঘরে আসুন।’
ভদ্রমহিলাকে নিয়ে মায়া বসার ঘরে ঢুকলেন। পূর্ণেন্দু শোবার ঘরে গেলেন পাঞ্জাবি পরে নিতে। ছায়া এখনও কলেজ থেকে ফেরেনি। অন্য ঘরে নবেন্দু এখনও ঘুমুচ্ছে।
‘চা করছি, খাবেন?’
‘আধ কাপ, চিনি ছাড়া।’
তখন পূর্ণেন্দু ঘরে ঢুকলেন। ‘আপনার কী সুগার বেশি?’
ভদ্রমহিলা স্মিত হেসে মাথা হেলালেন।
মায়া বললেন, ‘আপনার নাম কিন্তু এখনও জানা হয়নি। নাম না জেনে আলাপ করতে খুব অসুবিধে হয়। আমার নাম মায়া, ওনার নাম পূর্ণেন্দু আমাদের পদবি গুপ্ত।’
‘ওনার নামটা জানি আপনারটা জানতুম না। আমার নাম বাসন্তী দাসগুপ্ত। থাকি বি ব্লকে দোতলায় তিন নম্বরে। এই হাউজিংয়ে বদ্যি শুধু আমাদের এই দুটো পরিবার।’ বাসন্তী তাকালেন এমনভাবে যেন জঙ্গলে হারিয়ে গিয়ে ঘুরতে হঠাৎ লোকালয় দেখতে পেলেন। মায়া চা আনতে গেলেন।
‘এখানে আসার আগে আপনারা কোথায় থাকতেন?’ পূর্ণেন্দু আলাপটাকে সচল রাখার জন্য কথা পাড়লেন।
‘থাকতুম হাতিবাগানে। শ্বশুরদের শরিকি বাড়ি, খুব অসুবিধে হত।’
‘আপনার কথায় বাঙালে টান পাচ্ছি। দেশ কোথায় ছিল?’
‘বরিশালে, ঝালকাঠিতে। আপনাদের?’
‘গুপ্তিপাড়ায়।’
‘আমি এসেছি কিন্তু একটা বিশেষ প্রস্তাব নিয়ে।’ বাসন্তী ঘোমটায় চিমটি কেটে টান দিলেন। মুখে মৃদু হাসি ফোটালেন। পূর্ণেন্দু জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইলেন। একটা প্লাস্টিকের ট্রে—তে তিন কাপ চা নিয়ে ঢুকলেন মায়া। দুজনে একটি করে কাপ তুলে নিল, মায়া তৃতীয়টি হাতে নিয়ে বসলেন।
‘বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আমি এসেছি।’ কাপে চুমুক দিয়ে বাসন্তী শুরু করলেন। ‘আপনাদের মেয়েটিকে আমাদের খুব পছন্দ হয়েছে। আমাদের একমাত্র ছেলে সুকুমার এমটেক. পাশ করে বোম্বাইয়ে বিলিমোরিয়া অ্যান্ড ওয়াদওয়ানি নামে খুব বড়ো একটা কনস্ট্রাকশন ফার্মের প্ল্যানিং ডিভিশনে চাকরি পেয়েছে। আমাদের ইচ্ছে ও বোম্বে যাওয়ার আগেই ওর বিয়ে দিয়ে দি। আপনাদের মেয়ের নাম তো ছায়া, আপনারা বোধহয় সুকুকে দেখেছেন কিংবা দেখে থাকলেও হয়তো তেমন করে লক্ষ করেননি। সুকুরও পছন্দ হয়েছে ছায়াকে।’ টানা বলে গিয়ে বাসন্তী থামলেন। পূর্ণেন্দু মনে মনে তারিখ করল ওর গুছিয়ে বলার ভঙ্গি এবং উচ্চচারনকে, ইতিহাস বা অর্থনীতির ভালো ক্লাস নিতে পারবেন, এই মহিলা।
মায়া দ্বিতীয় চুমুক দিয়ে পূর্ণেন্দুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, তার চাহনিতে নির্দেশ, যা বলার তুমিই বল। নির্দেশটা আন্দাজে বুঝে পূর্ণেন্দু গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, ‘এতো আমাদের কাছে পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার। কী বল?’ তিনি অনুমোদনের জন্য মায়ার দিকে তাকালেন।
