‘হঠাৎ তোকে কেন অঙ্ক পড়াতে বলল?’
‘আমার হায়ার সেকেন্ডারির মার্কশিট উনি দেখেছেন তো তাইতে ওর ধারণা হয়েছে অঙ্কটা আমি ভালো জানি।’
‘তোর সম্পর্কে তাহলে ওনার ধারণা ভালো।’
পূর্ণেন্দু, মায়ার গলায় চাপা উচ্ছ্বাসের আভাস পেলেন।
‘মনে তো হয় ভালো।’
‘রোজ পড়াতে হবে?’
‘তেমন কিছু বলেনি। আমি বললুম হপ্তায় দুদিন এসে অঙ্ক দেখিয়ে দিয়ে যাব। আমাদের এখান থেকে বাসে তো মিনিট দশেক সল্টলেকের বি সি ব্লক। অফিস থেকে বেরিয়ে সল্টলেক হয়ে বাড়ি ফিরব।’
জুতো খুলে জামা প্যান্ট বদল করতে করতে রবিন্দু কথা বলে চলেছে। চাকুরিদাতাকে খুশি করতে পারার জন্য প্রচ্ছন্ন একটা গর্ব ওর গলার স্বরে। পূর্ণেন্দুর কানে সেটা ধরা পড়ল।
মায়া জানতে চাইলেন, ‘কিছু দেবে টেবে বলল?’
‘বলেনি।’
‘তুই কিছু যেন বলতে যাসনি। যদি নিজে থেকে কিছু বলে তো বলুক।’
‘এরকম টিউশনিতে কত টাকা মাস্টারকে দেয়?’
‘একশো টাকা তো বটেই।’
‘টাকার কথা তুললে বলবি নোব না। একশো টাকা অবশ্য বোস সাহেবের কাছে কোনো টাকাই নয় কিন্তু ছেলের পাশ—ফেল করাটা মানমর্যাদার ব্যাপার। ছেলেটা পাশ করলে অফিসে তোর ভালোই হবে।’
পূর্ণেন্দু বাথরুমের দরজা বন্ধ করার শব্দ পেলেন। রবু স্নান করতে গেল। এরপরই তিনি ছায়ার গলা পেলেন। মেয়েটা এতক্ষণ শোবার ঘরে বিছানায় মুখ গুঁজে শুয়েছিল।
‘অমিয়দাকে ওভাবে অপমান করাটা তোমার উচিত হয়নি মা।’ ছায়া একটা বোঝাপড়া করতে বেরিয়ে এসেছে ঘর থেকে। বি. এ. সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে, এখন তার ব্যক্তিত্ব কিছুটা কঠিন হয়েছে। ‘এত বছর আসা—যাওয়া করছে, বাবাবাছা করে ওকে দিয়ে কতরকমের কাজ করিয়ে নিয়েছো, ওর কাছ থেকে কত উপকার পেয়েছো, তখন তোমার মনে ছিল না ও বাইরের লোক?’
পূর্ণেন্দু ইচ্ছে হল দেখতে এখন মায়ার মুখটা কেমন দেখাচ্ছে। রাগে চোখ দুটো দিয়ে আগুন বেরোচ্ছে না জ্বরগ্রস্ত চোখের মতো স্তিমিত।
‘মনে ছিল না। কিন্তু সব রকম সম্পর্কেরই একটা সীমা আছে। কিন্তু ও সীমা ছাড়িয়ে কথা বলেছিল বলেই মনে পড়ল।’
‘কী কথা! সেই দশ হাজার টাকা নেওয়ার কথা তো? অমিয়দা আমাকে বলেছে কীভাবে ওই টাকা তুমি পেয়েছ। কীভাবে তুমি হরেন রায়চৌধুরীর কাছ থেকে টাকাটা আদায় করেছিলেন। আমার চোখের সামনে গুনে গুনে টাকা তুমি ব্যাগে ভরেছিলে।’
পূর্ণেন্দু কান খাড়া করলেন। তার মনে পড়ল অমিয় বলেছিল অমনি অমনি ঘর ছেড়ে দেবেন! কিছু টাকা বাড়িওয়ালার কাছ থেকে আদায় করে নিন, এভাবে সবাই নেয়, মায়া তখন অমিয়র কথাগুলোকে সমর্থন করেছিল। মায়া কী দশ হাজার টাকা আদায় করেছিল! আশ্চর্য, কিছুই আমি জানি না এতদিন ধরে।
‘যেভাবেই আমি টাকা আদায় করি না কেন, যেভাবেই আমি গুনে গুনে ব্যাগে ভরি না কেন তাতে তোর কী? গয়না আমি ঠিকই গড়িয়েছি আর সেটা তোরই জন্যে।’ মায়া প্রাণপণ চেষ্টা করছেন গলা চেপে কথাবলার জন্য। ছোটো ফ্ল্যাট একটু জোরে কথা বললে সব ঘর থেকে শোনা যাবে। এমনকী বন্ধ বাথরুমেও।
‘এতগুলো টাকা অমিয়দা না বলে দিলে তুমি পেতে না আর তাকেই বিনা বাইরের লোক বললে? ও যদি বাইরের লোক হয় তাহলে ভেতরের লোক কে?’
‘যেই হোক, জেলে কৈবত্তর ছেলেকে ভেতরের লোক করতে পারব না। তুই ওর হয়ে আমার সঙ্গে ঝগড়া করছিস কেন তা কী আমি বুঝি না? কিন্তু জেনে রাখিস এই বদ্যি বংশের একটা মর্যাদা আছে, আত্মীয়স্বজনের কাছে মাথা উঁচু করে আমরা থেকেছি, থাকবও। এ বংশের সঙ্গে অমিয়র সম্পর্ক গড়তে আমি দোব না। তুই আর তোর বাবা যতই আধুনিক হোস এখনও জাত—বর্ণ—গোত্তর বংশ কৌলিন্যের দাম সমাজে আছে। ছায়া, সংস্কার মেপে চলতে হয়। লেখাপড়া আমিও কিছুটা শিখেছি।’ এতগুলো কথা গলা চেপে বলতে গিয়ে মায়া হাঁফিয়ে উঠলেন। শেষ দিকে কণ্ঠস্বরে অধৈর্য ফুটে উঠল। পূর্ণেন্দু ভাবলেন এখন ঘর থেকে বেরোবেন কি না, তাকে দেখলে মায়া হয়তো চুপ করে যাবে। বেরোতে গিয়ে দেখলেন বাথরুমের দরজা খুলে রবু একদৃষ্টে মায়ের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মায়াও একদৃষ্টে ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে, পূর্ণেন্দু ঘর থেকে বেরোলেন না, টিভি খুলে বসে রইলেন।
অমিয় আর এই ফ্ল্যাটে আসেনি, ছায়া বউবাজারে অমিয়দের দোকানে গিয়ে ওর সঙ্গে দেখা করে। টেবিলে মুখোমুখি বসে অমিয় নম্র কিন্তু কঠিনভাবে তাকে বলে, ‘উঁচুজাতের মেয়েকে বিয়ে করার বিন্দুমাত্রও ইচ্ছে আমার নেই। তুমি জাত—গোত্র মিলিয়ে কোনো ছেলেকে বিয়ে করে নিও। দেখতে সুন্দরী, লেখাপড়া শিখেছে, পাত্রের অভাব হবে না।’
ছায়া বলে, ‘আমরা তো রেজিস্ট্রি বিয়ে করে নিতে পারি।’
অমিয় বলে, ‘তা পারি। কিন্তু লুকিয়ে এভাবে বিয়ে করলে তো একরকম মেনেই নেওয়া হবে এই উঁচু জাত—নীচু জাত সংস্কারটাকে। আমি টোপর পরে সানাই বাজিয়ে নিজের জাতকুলের পরিচয় জানিয়ে বিয়ে করতে চাই। তোমার মা কি তা মেনে নেবেন?’
ছায়া মাথা নাড়ে। ‘বাবা মেনে নেবে কিন্তু মা নয়।’
‘তাহলে!’ অমিয় দু—হাতে টেবিল চাপড়ায়। ‘ল্যাঠা চুকেই গেল, তোমার মা—র ইচ্ছার বিরুদ্ধে বাবা যেতে পারবেন না, আমি জানি।’
ছায়াও জানে। সে চুপ করে ছলছল চোখে শুধু তাকিয়ে রইল।
‘সংসারে অশান্তি গন্ডগোল পাকিয়ে লাভ কী ছায়া।’ অমিয় আড়চোখে দেখল দোকানের দু—জন কর্মচারীর একজন খাটে শিরিষ কাগজ ঘষছে, অন্যজন টেবিলে বার্ণিশ লাগাচ্ছে। ওরা তাদের দিকে বার বার তাকাচ্ছে। দোকানে খদ্দের নেই এখান থেকে কথাবার্তা ওদের কানে পৌঁছচ্ছে না বটে তবে ছায়ার চোখমুখের ভাব তো দেখতে পাচ্ছে। অমিয় অস্বস্তি বোধ করল।
