নবেন্দু চুপ করে মুখে হাসি লাগিয়ে শুনে যাচ্ছে। শুনতে তার ভালোই লাগছে। সে বলল, ‘বায়নার দশ হাজার এখনই পাব কোথায়?’
অমিয় নাটকীয়ভাবে চোখ সরু করে মায়ার দিকে তাকাল। মায়া অবাক হয়ে ভাবলেন, এ আবার কী!
‘মাসিমা ছায়ার বিয়ের গয়না কী গড়ে ফেলেছেন?’
‘কেন বলো তো?’ মায়ার জিজ্ঞাসু চোখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল। তিনি ধরতে পেরেছেন অমিয় কেন একথা বলল। বাড়িওয়ালার কাছ থেকে নেওয়া দশ হাজার টাকাকেই খোঁচাচ্ছিল। খোঁচাটা জ্বালা ধরাল।
‘না এমনি বললুম।’ অমিয় নির্লিপ্ত করে নিল মুখভাব।
‘এমনি এমনি বললে?’ মায়ার চোখে স্ফুলিঙ্গ ছিটকে উঠল। সেটা এড়াল না অমিয়র নজর। সে প্রমাদ গুনল, বলল, ‘বিশেষ কিছু ভেবে বলিনি মাসিমা।’
‘ভেবে বলোনি? দেখ অমিয় ছায়ার বিয়ের গয়না গড়িয়েছি কী গড়াইনি তাই নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর কোনো দরকার নেই। বাইরের লোক তুমি, আমাদের ঘরের ব্যাপার নিয়ে বেশি মাথাব্যথা করো না। তুমি রবুর বন্ধু, দরকারের সময় আমাদের অনেক সাহায্য করেছ, ঠিক আছে। তাই বলে এতটা গায়েপড়া ভালো নয়।’ মায়া কর্কশ স্বরে গলায় তিক্ততা ঢেলে কথাগুলো বললেন।
মায়ার এমনভাবে ফেটে পড়ায় নবেন্দু এবং ছায়া বিস্ময়ের চূড়া স্পর্শ করল। তারা জানে মা খুব পছন্দ করে অমিয়দাকে। তলায় তলায় এতটা যে অপছন্দ করে কোনো দিনই বুঝতে পারেনি। মা যে ওকে ‘বাইরের লোক’ বলবে এটা তাদের কাছে কল্পনার বাইরে ছিল।
‘আমি অন্যায় করেছি মাসিমা, আমাকে ক্ষমা করবেন।’ অমিয় দু—হাত জোড়া করে বলল, মুখ শুকিয়ে গেছে এবং অপমানে কালো। মাথা নীচু করে সে বসে রইল। অস্বস্তিকর পরিবেশটা হালকা করতে প্রসঙ্গ ঘোরাবার জন্য নবেন্দু বলে উঠল, ‘অমিয়দা তোমাদের দেশে যে নিয়ে যাবে বলেছিলে তার কী হল?’
অমিয় শুকনো হেসে বলল, ‘নিয়ে যাব। নতুন ব্যবসা এখন সারাক্ষণই লেগে পড়ে থাকতে হয়, দুটো দিনও বার করতে পারি না।’
নবেন্দু হালকা সুরে বলল, ‘বাড়ি করলে তোমাকে দিয়েই ইনটিরিয়র ডেকরেশনের কাজটা করাব।’
ছায়া থমথমে মুখে বসেছিল এবার সে দ্রুত ঘরে ঢুকে বালিশে মুখ ডুবিয়ে শুয়ে পড়ল। পূর্ণেন্দু ফ্ল্যাটের বাইরে ছিলেন এখন ফিরলেন হাতে তেলে ভাজার ঠোঙা।
‘একটা লোক ফুটপাথে বসে ভাজছে, আগে কখনো দেখিনি। অনেকদিন পলতার বড়া খাইনি দেখে লোভ লাগল।’ তিনি ঠোঙাটা মায়ার সামনে ধরলেন। মায়া মাথা নেড়ে নিতে অস্বীকার করে বললেন, ‘অম্বল হবে।’ পূর্ণেন্দু অমিয়র সামনে ধরলেন, সে একটা বড়া তুলে নিল। নবেন্দুও একটা তুলল। তিনি নিজেও একটা নিলেন, চেয়ারে বসে চিবোচ্ছেন তখন অমিয় হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি এখন যাই।’
‘অমিয়দা দু মিনিট, আমিও বেরোব।’ নবেন্দু দ্রুত ঘরে গেল জামা ও ট্রাউজার্স পরে নিতে।
‘আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি।’ অমিয় এই বলে ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বেরিয়ে গেল।
নবেন্দু ঘর থেকে বেরিয়ে এসে দরজার দিকে যেতে যেতে মায়াকে বলল, ‘অমিয়দাকে এভাবে তোমার বাইরের লোক বলাটা উচিত হয়নি।’
পূর্ণেন্দু বিস্মিত চোখে তাকালেন স্ত্রীর দিকে। ‘কী বলেছ অমিয়কে?’
‘যা বলেছি ঠিকই বলেছি, বাইরের লোক নয়তো কী?’ মায়া নিজের অন্যায় বুঝতে পেরেও জেদ ধরে নিজেকে সমর্থন করলেন। ‘এমন একটা কথা বলল যে মাথা গরম হয়ে গেল, ছায়ার বিয়ের জন্য গয়না গড়িয়েছি কিনা! ছায়ার বিয়ে নিয়ে ওর কেন মাথাব্যথা তা কি আর বুঝি না? এ বাড়িতে এত আসা—যাওয়া এত মাসিমা মাসিমা করা সেকি আমার জন্য না রবুর জন্য। আস্তে আস্তে হাত বাড়াচ্ছিল ছায়ার দিকে।’
‘তাতে কী হল?’ পূর্ণেন্দু শেষ বড়াটা তুলে নিয়ে ঠোঙাটাকে মুঠোয় তালগোল পাকালেন, ‘ছায়াকে বিয়ে করতে চায়, এই তো।’
‘তুমি জানো অমিয় জাতে জেলে।’ মায়া তীব্র স্বরে বললেন।
‘তাতে কী হল!’ পূর্ণেন্দু তীব্র চোখে তাকালেন, ‘এইসব জাতগোত্তোর নিয়ে এখন আর কেউ মাথা ঘামায় না, ঊনবিংশ শতাব্দীতে ঘামাতো। ছেলে হিসেবে অমিয় তো বেশ ভালোই। স্বাস্থ্যবান সুদর্শন, বাড়ির অবস্থা ভালো, নিজেও ব্যবসা শুরু করেছে, যথেষ্ট শিক্ষিত। তা হলে জাতের প্রশ্ন আসছে কেন?’
‘তুমি বলছ কী?’ মায়ার চোখ ফেটে বেরিয়ে এল আহত বিস্ময়। জেলের ঘরে মেয়ে দেবে? বামনু কায়েত হলেও নয় কথা ছিল। তোমার ভীমরতি ধরেছে আমার ধরেনি।’
মায়া ঝটকা দিয়ে চেয়ার সরিয়ে দাঁড়ালেন। রান্নাঘরে গিয়ে টিন খুলে আটা বার করে মাখতে শুরু করলেন। পূর্ণেন্দু বসার ঘরে এসে টিভি চালিয়ে দিয়ে পর্দার দিকে তাকিয়ে রইলেন। পর্দায় কী ভেসে উঠছে তা দেখতে পাচ্ছেন না। মাথার মধ্যে দপদপ করছে অন্ধ রাগ, তার মনের পর্দায় সায় দিয়ে ভেসে চলেছে মৃতদেহ, প্রত্যেকটাই মায়ার। কোনোটা মুণ্ডবিহীন ধড়। কোনোটার বুকে ছোরা বসান, কোনটা আগুনে পোড়া, কোনোটার শরীর পচে ফুলে উঠেছে। পূর্ণেন্দু টিভি বন্ধ করে সোফায় পা গুটিয়ে শুয়ে পড়লেন। শরীরটা কেমন করছে।
কলিংবেল বাজাল। মায়া দরজা খুললেন, রবিন্দু ফিরল। পূর্ণেন্দু শুনতে পেলেন মায়া জিজ্ঞাসা করছেন, ‘আজ যে তোর এত দেরি হল?’
‘বোস সাহেবের বাড়িতে গেছলুম। ওর ছোটো ছেলে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে, অঙ্কে কাঁচা। আমায় বললেন একটু দেখিয়ে দিতে। ওর সঙ্গেই গাড়িতে সল্টলেকে গেলুম। ছেলেটা সত্যিই কাঁচা। কী করে যে ক্লাস টেন পর্যন্ত উঠল কে জানে! আমি এখন আর কিছু খাব না, লুচি বেগুনভাজা খেতে দিয়েছিল, সন্দেশও।’
