মায়া দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন উৎকণ্ঠিত হয়ে। বললেন, ‘ওরা কী বলল?’
‘সবই তো আড়াল থেকে শুনেছ। ওই সমরেশ ছেলেটা খুব সুবিধের নয়, সঙ্গের লোকটাও। প্রথমে কীভাবে কথা শুরু করেছিল তারপর যেই আমি আপত্তি করলুম অমনি কথা ঘুরিয়ে নিপাট ভদ্দরলোক হয়ে গেল। বলে কিনা রেফারির বাচ্চচা ছেলেকে তুলে অন্য জায়গায় পৌঁছে দেবে তার মানে কিডন্যাপ করবে!’
‘মেরে তো ফেলবে না।’ মায়া কথার সুরে বোঝালেন কাজটায় তার অসম্মতি নেই। পূর্ণেন্দু তীব্র দৃষ্টিতে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
‘মেরে হয়তো ফেলবে না কিন্তু বাপ—মার ওপর কী ভয়ংকর মানসিক অত্যাচার হবে সেটা মনে করার চেষ্টা করো।’
‘মানসিক অত্যাচার কী আমাদের ওপরও হচ্ছে না? অবশ্য বলতে পার অত্যাচারটা করছে আমাদেরই ছেলে। এখানকার পাঁচজনের কাছে মুখ দেখাতে হলে নবুকে নির্দোষী প্রমাণ হবে হবে আর সেটা সম্ভব রেফারির রিপোর্ট কেমন হবে তার ওপর। আমি তো কথা শুনে তাই বুঝলুম।’
‘ঠিকই বুঝেছ। তোমার চিন্তা হল পাঁচজনের কাছে মুখ দেখানো। আর তা দেখানোর জন্য একটা বাচ্চচাকে যদি গুম করে ফেলতে হয় তো ফেলুক, কেমন, তুমি তাতে অন্যায় কিছু দেখছ না।’ পূর্ণেন্দুর চোখে চাপা আগুন, গলায় চাপা ক্রোধ। মায়া সরে গেলেন স্বামীর সামনে থেকে।
নবেন্দু সেদিন আর ফিরল না। মায়া ভীত গলায় বললেন, ‘কিছু করে টরে বসল না তো।’ শুনে পূর্ণেন্দু ঠোঁট বাঁকালেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত বারান্দায় চেয়ারে বসে রইলেন মায়া, পথ চেয়ে। ছায়া বা রবিন্দু এই প্রসঙ্গে সারাদিনে একটি কথাও বলেনি, রাতে একটি ছেলে এসে জানিয়ে গেছল ‘নবু সমরেশদার বাড়িতে আছে, ওখান থেকেই কাল সোজা কোর্টে যাবে।’
সোমবার খামে ভরা সীলকরা রেফারির রিপোর্ট জমা পড়ল আইএফএ অফিসে কিন্তু খাম খোলা হল না। শৃঙ্খলারক্ষাকারী কমিটির সভায় খোলা হবে বলে তুলে রাখা হল। সোমবারই ব্যাঙ্কশালকোর্টে নবেন্দু হাজির হয়ে এক মিনিটেই জামিনে পেয়ে যায়, কোর্টে সবুজ সংঘের ফুটবলার ও কর্মকর্তারা হাজির ছিল।
সোমবার খুব সকালেই অমিয় আনন্দে এসে হাজির হয়। রবিন্দুকে সঙ্গে নিয়ে সে কোর্টে যাবে। তার চেনা উকিল আছে তাকে দিয়ে সে জামিনের জন্য আবেদন করাবে।
‘তোমায় কিছু করতে হবে না অমিয়, নবুর জন্য যা করার তা ওর ক্লাবই করবে।’ নিস্পৃহ স্বরে বলেছিলেন পূর্ণেন্দু।
মায়া প্রতিবাদ জানান, ‘যাবে না কেন, বাড়ি থেকে কারওর যাওয়া উচিত। তুমি যাবে না জানি, নীতিবাগীশ তো রবি তুই তো আবার বাপের মতো, তোর যেতে লজ্জা করবে না তো? অপিস আছে বলে পাশ কাটাসনি, ভাইয়ের বিপদ, এখন দাদার কর্তব্য পাশে দাড়ানো, অমিয়র সঙ্গে তুইও যা।’
ওরা যখন কোর্টে পৌঁছল নবেন্দু তখন জামিনে ছাড়া পেয়ে গেছে। যখন সে বেরিয়ে আসছে তখন কোর্টের গেটে তার সঙ্গে দেখা হল অমিয় ও রবিন্দুর। নবেন্দুকে ঘিরে জনাপনেরো লোক।
তাদের মধ্যে সমরেশও রয়েছে। সে নবেন্দুকে বলল, ‘এখন কোথায় যাবি, বাড়িতে?’
‘হ্যাঁ, আমার দাদা এসেছে, ওই যে দাঁড়িয়ে।’ আঙুল তুলে সে রবিন্দুকে দেখাল। তিনজনকে ট্যাক্সিতে তুলে দিল সমরেশ। সারা পথে রবিন্দু শুধু একটাই প্রশ্ন করে, ‘সকাল থেকে কিছু খেয়েছিস?’
‘খিদে নেই।’
তিন
লাল কার্ড দেখার জন্য দুটি ম্যাচে বসে থাকা ছাড়া নবেন্দুর কোনো শান্তি হয়নি। কোর্ট তাকে বেকসুর খালাস দেয়, আই এফ এ—ও। রেফারির রিপোর্টে সেই কথাগুলিই ছিল সমরেশ যেমনটি বলেছিল পূর্ণেন্দুকে। খবরের কাগজে পড়ে তার সন্দেহ হয় নবেন্দুকে দিয়ে ক্ষমা চাওয়ানো হয়নি, সমরেশ ও বুদ্ধদেবরা নিশ্চয় ভয় দেখিয়ে রিপোর্টটা লিখিয়েছে। এই সন্দেহটা তিনি মনের মধ্যেই গোপন করে রেখে দেন।
নবেন্দুর ব্যাপারটা নিয়ে আনন্দ আবাসনের একটি লোকও কৌতূহল দেখায়নি। খবরের কাগজ নবেন্দুর পক্ষ নিয়ে যা যা লিখেছে তারা সবাই পড়ে জেনেছে নবেন্দু গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের শিকার। বরং সে আবাসনের সহানুভূতিই পেয়েছে। পরের বছর নবেন্দু ক্লাববদল করে প্রথম ডিভিশনের উয়াড়িতে এসে হঠাৎই বিখ্যাত হয়ে গেল মোহনবাগান ও ইস্টবেঙ্গলকে একটি করে গোল দিয়ে। অবশ্য ম্যাচ দুটি উয়াড়ি হেরে যায়।
ফুটবল মরশুম শেষ হতেই নবেন্দুর কাছে ওই দুটি ক্লাবের লোকেরা আসা—যাওয়া শুরু করে। পূর্ণেন্দু এরপর বিশ্বাস করতে শুরু করেন, লেখাপড়ার দিকে এগোতে গিয়ে সময় নষ্ট না করে তার ছোটো ছেলে ঠিক পথেই গেছে। মায়ার মাথায় নবেন্দু ‘যদি ফুটবল খেলে বছরে পঞ্চাশ—ষাট হাজার রোজগার করতে পারি’ বলে উচ্চচাশার যে ভিতটা তৈরি করে দিয়েছিল, সেটায় এবার তিনি দোতলা তুলে ফেললেন।
একদিন কথায় কথায় মায়া বললেন, ‘নবু একদিন বিয়েথা তো করবি, এ বাড়িতে বউ নিয়ে থাকবি কোথায়? আগে একটা বাড়ি করিস।’
ছায়া আর অমিয় সেখানে হাজির ছিল। ছায়া বলল, ‘না দাদা বাড়ি নয় ফ্ল্যাট, হাজার স্কোয়ার ফুটের।’
অমিয় বলল, ‘না না বাড়িই ভালো, মাসিমা ঠিকই বলেছেন, বাড়ি হল একটা নিজের ব্যাপার, নিজের রাজত্বে নিজে সম্রাট। ফ্ল্যাট বাড়ি তো পাঁচ ভূতের রাজত্ব। সিঁড়ির বালব ফেটে গেলে ছোটো সেক্রেটারির কাছে, দু দিন লাগবে বালব পালটাতে। গড়িয়ার দিকে এখনও জমি পাওয়া যাচ্ছে। আমরা দশ কাঠা কিনেছি অফিস ফার্নিচার বানাবার কারখানা করব বলে। এখন পাঁচ হাজার টাকা কাঠা, তিন কাঠা এখনই বায়না করে ধরে রাখো। লোকে এখন বাড়ি করার জন্য হন্যে হয়ে জমি খুঁজছে। জমির দামও হু হু করে বাড়ছে। নবু যা করার এখনই কর, হাজার দশেক টাকা দিয়ে বায়না করে ফেল। পরে ক্লাব থেকে অ্যাডভান্সের টাকা পেলে বাকি টাকাটা চুকিয়ে দিও।’
